তৃণমুল থেকে সংসদে: বিয়ানীবাজারের ‘ব্যাধি’ সারাতে পারবেন এমরান চৌধুরী !
তৃণমুল থেকে সংসদে: বিয়ানীবাজারের ‘ব্যাধি’ সারাতে পারবেন এমরান চৌধুরী !
editor
প্রকাশিত ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০২৬, ১০:৪৮ পূর্বাহ্ণ
Manual3 Ad Code
মিলাদ জয়নুল:
সচেতন মানুষের উর্বর ভূমি সীমান্ত ঘেঁষা আর নানকার আন্দোলনের স্মৃতিধন্য জনপদ সিলেট-৬ আসনের দুই উপজেলার একটি হচ্ছে বিয়ানীবাজার। যেখানকার মাটি ও পানির নীচে আছে প্রচুর খনিজসম্পদ। প্রবাসীদের রেমিট্যান্সে চলছে মানুষের আয়েশী জীবন। ব্যাংক, বীমায় পড়ে আছে বিপুল অলস টাকা। বিয়ানীবাজারের মাটির নীচে ঘুমিয়ে আছেন অসংখ্য হযরত গোলাবশাহ (র) সহ অলি-আউলিয়া, প্রমথ নাথ দাস। জন্ম নিয়েছেন ড. জিসি দেব, পন্ডিত রঘুনাথ শিরোমনি, ছয় দফার প্রথম শহীদ মনু মিয়াসহ বেশ কয়েকজন বরেণ্য ব্যক্তিত্ব।
Manual6 Ad Code
দীর্ঘ কয়েক বছর থেকে এই জনপদ ছিল বর্তমানে নিষিদ্ধ আওয়ামীলীগের ‘দুর্গ’। তবে এবারের নির্বাচনে বদলে গিয়েছে চেনা সমীকরণ। আওয়ামীলীগ বিহীন ময়দানে জয় ছিনিয়ে নিয়েছেন একদম তৃণমুল থেকে ওঠে আসা এমরান আহমদ চৌধুরী। তিনি পেশায় একজন আইনজীবি। নিজ নির্বাচনী এলাকার গোলাপগঞ্জে জন্ম-বেড়ে ওঠা তাঁর। চেনেন দুই উপজেলার মাঠ-ঘাট, পথ-প্রান্তর। প্রতিবেশী উপজেলায় বাড়ি হলেও বিয়ানীবাজার থেকে আশাতীত ভোট লাভ করেছেন তিনি। ৫টি ইউনিয়নে জয়লাভ করে বিস্ময় সৃষ্টি করেছেন।
Manual4 Ad Code
ছাত্রদলের রাজনীতি থেকে সংসদের জনপ্রতিনিধি হওয়া এই নতুন ‘এমপি সাহেব’ কি পারবেন রাজনীতির উর্বর ভূমি বিয়ানীবাজারের দীর্ঘদিনের ‘ব্যাধি’ সারাতে-প্রশ্ন এখন সাধারণ মানুষের হৃদয়ে।
সিলেট-৬ আসনের ভোটের ফল বলছে, লড়াই ছিল সমানে-সমান। ধানের শীষ প্রতীকে এডভোকেট এমরান আহমদ চৌধুরী পেয়েছেন এক লাখ ৯ হাজার ৯শ’ ১৭ ভোট। তার ঘাড়ের কাছে নিঃশ্বাস ফেলেছেন জামায়াতে ইসলামীর মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন। মাত্র কয়েক হাজার ভোটের ব্যবধানে পিছিয়ে পড়া সেলিমের হার মেনে নিতে পারছেন না অনেক বিশ্লেষকই।
Manual5 Ad Code
রাজনৈতিক মহলের মতে, এই জয়ের পর এডভোকেট এমরানের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো জনমতের এই বিভাজন ঘুচিয়ে উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করা।
বিয়ানীবাজারের ভৌগোলিক অবস্থানই এর প্রধান সমস্যা। উপজেলার বিস্তীর্ণ সীমান্ত পথ এখন চোরাচালানের ‘করিডোর’ হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে।
বিস্ময়কর হলেও সত্যি, বিয়ানীবাজারের স্বাস্থ্য সেবা অত্যন্ত নড়বড়ে। বিয়ানীবাজার বা গোলাপগঞ্জের উপজেলা হাসপাতালে উন্নত চিকিৎসার বালাই নেই। সামান্য জটিলতাতেই ছুটতে হয় জেলা সদর বা বেসরকারি হাসপাতালে।
উপজেলার সিপিবি সভাপতি এডভোকেট আবুল কাশেমের আক্ষেপ, বিয়ানীবাজারে রাষ্ট্রের নজর পড়েনি।
Manual7 Ad Code
এই আসনের মেরুদণ্ড হলো প্রবাসী রেমিট্যান্স। কিন্তু প্রবাসীরা নানাভাবে হয়রানির শিকার। ব্যাংকে পড়ে আছে অলস টাকা, বিনিয়োগ নেই। প্রবাসীদের জমিজমাও দখল হয়।
এছাড়া বিয়ানীবাজারের শেওলা স্থলবন্দরটি দীর্ঘকাল ধরে পর্যাপ্ত রাজস্ব আহরন করতে পারছেনা। বন্দরটি আধুনিক হলেও আমদানি-রফতানি নিয়মিত কমছে। বন্দরের জমিজমা দখল হয়ে গেছে। পৌরশহর থেকে শুরু করে উপজেলার সর্বত্র সরকারি জমি বেদখল হয়েছে। উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালিত হয়নি অন্তত: দেড় যুগ থেকে।
এই জনপদে থাবা বসিয়েছে নানা সামাজিক ব্যাধি। কর্মসংস্থান নেই, প্রবাসী উৎস ছাড়া আয়ের দ্বার সংকুচিত। ব্যবসা-বাণিজ্যে ভাটা। উপজেলাজুড়ে আছে এনজিওর দাপট, অনুমোদনহীন সুদের ব্যবসা জমজমাট। রীতিমত কার্যালয় খুলে চলছে সুদ দেয়া নেয়া। বাড়ছে আত্মহত্যার প্রবণতা।
মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত বিয়ানীবাজারের মানুষ। রাস্তাঘাটের জীর্ণ দশা, বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা নড়বড়ে, গ্যাস নেই, হাসপাতালে চিকিৎসক নেই। উপজেলা প্রশাসনে জনবল সংকট। পৌরসভায় পর্যাপ্ত লোকবল নেই। দূর্নীতি আর অনিয়মের আখড়ায় পরিণত হয়েছে পৌর কার্যালয়। একটি বিশেষ সিন্ডিকেটে পরিচালিত হচ্ছে প্রকৌশল বিভাগ। শিক্ষক সংকট বহু পুরনো। ঘরে ঘরে গ্যাস পৌঁছানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সব মৌলিক অধিকার পূরণ করার কথা বলেছেন নতুন এমপি। থানা পুলিশের পরিবহণ সংকট। একাধিক এলাকায় সেতুর জন্য মানুষের হাহাকার-অসহায়ত্ব চলছে। নদী ভাঙ্গন রোধ করা বিশাল চ্যালেঞ্জ।
এডভোকেট এমরান আহমদ চৌধুরী। গ্রাম থেকে বড় হয়ে শহুরে বসতি গড়েছেন। কিন্তু মানুষের দাবীর এই দীর্ঘ তালিকা সামলাতে কতটুকু সফল হবেন?
আপাতত বিয়ানীবাজারের মানুষ আশায় বুক বাঁধছেন—হয়তো এবার তাদের কথা পৌঁছাবে জাতীয় সংসদে, হয়তো ঘুচবে দীর্ঘদিনের বঞ্চনা।