আজ ১৭ ফেব্রুয়ারি, বাংলাদেশের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ দিন—দেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। গত ১২ ফেব্রুয়ারি গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের লক্ষ্যে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে তার নেতৃত্বাধীন বিএনপি জোট।
এদিন সকালে জাতীয় সংসদ ভবনে বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্যরা শপথ গ্রহণের পর দলীয় সংসদীয় কমিটির বৈঠকে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচন করেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ১৮ মাসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অবসান ঘটে।
শুরু হয় তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের নতুন অধ্যায়।
Manual1 Ad Code
২০০২ সালে দলীয় জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব
দলীয় কোনো পদে না থাকলেও ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে মা খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের নির্বাচনী প্রচারণায় সরাসরি অংশ নেন তারেক রহমান। নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর সরকার গঠন করে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট। পরবর্তী সময়ে, ২০০২ সালে দলের স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তিনি বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত হন।
এরপর ২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর বিএনপির পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে তিনি সংগঠনের জ্যেষ্ঠ ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। গত ৩০ ডিসেম্বর বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যু হলে ১০ দিনের মাথায়, ৯ জানুয়ারি দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে তারেক রহমানকে দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়।
এর আগে, লন্ডনে অবস্থানকালে ২০১৮ সালে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় বেগম খালেদা জিয়া কারাবন্দী হলে তারেক রহমানকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
Manual8 Ad Code
উল্লেখ্য, ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় এলে দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে।
ওই বছরের ৭ মার্চ তারেক রহমান গ্রেপ্তার হন। আঠারো মাস কারাবন্দী থাকার পর ২০০৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর অসুস্থ অবস্থায় বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রিজন সেলে ভর্তি থাকা অবস্থায় তিনি সব মামলায় জামিন লাভ করেন।
Manual7 Ad Code
একই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর বিশেষ কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি অসুস্থ পুত্র তারেককে দেখতে যান। সেদিন রাতেই উন্নত চিকিৎসার জন্য তারেক রহমান যুক্তরাজ্যের উদ্দেশে রওনা দেন।
২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করলে ২০০৯ সালে সরকার গঠন করে।
২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ১৫ বছর ৮ মাস দেশ শাসন করে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার। এ সময়কালে দেশের ইতিহাসে বিতর্কিত তিনটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়—২০১৪ সালের বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন (বিএনপি বর্জন করে), ২০১৮ সালের ‘রাতের ভোট’ এবং ২০২৪ সালের তথাকথিত ‘আমি-ডামি’ নির্বাচন।
Manual3 Ad Code
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার বিক্ষোভের মুখে শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করেন। এর মাধ্যমে দীর্ঘ ১৫ বছরের আওয়ামী লীগ স্বৈরতন্ত্রী সরকারের অবসান ঘটে। তিন দিন পর দেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর সংবিধানসহ বেশ কিছু আইনগত সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি জুলাইয়ের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারপ্রক্রিয়া শুরু করে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার। এ সময় দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি দ্রুত নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসলেও নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট সময়সূচি নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট ঘোষণা আসেনি।
তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের নতুন অধ্যায় শুরু হয় গত বছরের ১৩ জুন। ওই দিন যুক্তরাজ্যের লন্ডনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। বৈঠক শেষে বিএনপি ও সরকারের পক্ষ থেকে পৃথক বিবৃতিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঘোষণা আসে। বিএনপি রমজানের আগে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি জানিয়ে আসছিল। সে অনুযায়ী ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে লন্ডন বৈঠকে সমঝোতা হয়েছিল বলে পরোক্ষভাবে দাবি করে দলটি।
পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর জাতির উদ্দেশে ভাষণে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণের দিন নির্ধারণ করে তফসিল ঘোষণা করেন।
তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন
জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার ১৪ দিন পর, ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান ও কন্যা জাইমা রহমানকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন বিএনপির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এর আগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া অসুস্থ হয়ে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হলে পুত্রবধূ ডা. জুবাইদা রহমান দেশে ফিরে আসেন এবং চিকিৎসক প্যানেলের সঙ্গে সমন্বয় করে শাশুড়ির চিকিৎসা তদারকি করেন।
২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরা এবং ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ—সময় ব্যবধানে এটি স্বল্প মনে হলেও ব্যক্তিগত জীবনে সময়টি ছিল তারেক রহমানের জন্য গভীর শোকের। দেশে ফেরার মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় তিনি হারান তার মমতাময়ী মা ও দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে। দীর্ঘ প্রবাসজীবনের অবসান ঘটিয়ে দেশে ফেরার অল্প সময়ের মধ্যেই মাকে হারানোর শোক ও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে তার প্রধানমন্ত্রিত্বের সূচনা ঘটল।