প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

২রা অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৭ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২১শে রবিউস সানি, ১৪৪৮ হিজরি

গলাকাটা মুরগির মতো ছটফট করছিল বাচ্চাগুলো!

editor
প্রকাশিত জুন ৪, ২০২৬, ০৬:১৬ পূর্বাহ্ণ
গলাকাটা মুরগির মতো ছটফট করছিল বাচ্চাগুলো!

Manual2 Ad Code

স্টাফ রিপোর্টার:
রাজধানীর আদ্-দ্বীন হাসপাতালে সম্প্রতি এক ওয়ার্ডে মারা যাওয়া ছয় নবজাতকের মধ্যে একই মায়ের ছিল যমজ সন্তান। সেদিন ওই ওয়ার্ডে আসলে কী হয়েছিল এবং সন্তান দুটি মারা যাওয়ার আগে কী ঘটেছিল, সেই নির্মম ও রোমহর্ষক ঘটনার বিবরণ ঢাকা পোস্টের সঙ্গে শেয়ার করেছেন হতভাগ্য মা নাজমা বেগম।

দীর্ঘ আলাপচারিতায় নাজমা বেগম বলেন, ‘গত শনিবার বিকেলে বাসা থেকে হাসপাতালের উদ্দেশে রওনা দিই। রোববার অস্ত্রোপচারের (সিজার) মাধ্যমে আল্লাহ আমাকে যমজ পুত্র সন্তান দান করেন। জন্মের পর বাচ্চারা পুরোপুরি সুস্থ থাকায় হাসপাতালের নার্স, ডাক্তারসহ পরিচিত আত্মীয়স্বজন সবাই অনেক আনন্দে ছিলেন। ঈদের আগের দিন বাচ্চাদের নিয়ে আমাদের বাসায় আসার কথা ছিল। আত্মীয়স্বজন সবাইকে ওদের আকিকার দাওয়াতও দেওয়া হয়েছিল।’

তিনি বলেন, ঠিক বাসায় আসার কয়েক ঘণ্টা আগেই, বুধবার রাত ২টার সময় আমার একটি বাচ্চা বমি করে চিৎকার শুরু করে। এর ঘণ্টা দেড়েক আগে আমি ওদের দুজনকেই বুকের দুধ খাইয়েছিলাম। পরে আমি ওকে পরিষ্কার করে শোয়ানোমাত্রই অপর বাচ্চাও বমি করার চেষ্টা করতে থাকে। তখন ফ্লোরে ঘুমিয়ে থাকা আমার ননদকে ডাক দিলে সে উঠে ওদের পরিষ্কার করে। ঠিক এই সময় পাশেই আরেকটি বাচ্চাকে খুব অসুস্থ হয়ে পড়তে দেখি। তার সঙ্গে থাকা অভিভাবকেরা ওয়ার্ডের মধ্যেই চিৎকার শুরু করেন। তখন ওই ওয়ার্ডে কোনো ডিউটি নার্স ছিল না। একজন আয়া ছিল, সে ওই বাচ্চাকে দেখে অভিভাবকদের বলে— ‘কিছু হয়নি, ঠিক হয়ে গেছে’। পরে ওই বাচ্চাটাই সেখানে মারা যায়।

নাজমা বেগম চোখের পানি মুছে বলেন, ‘পরে আমি আমার বাচ্চা নিয়ে বসে আছি আর ভাবছি কী হলো! ওরা তো কিছুক্ষণ আগেও সুস্থ ছিল। রাতটুকু পার হলেই সকালে ডাক্তার দেখিয়ে আমাদের বাসায় আসার কথা। এর মধ্যে দেখি আমার বাচ্চা দুটো আরও অসুস্থ হয়ে গেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ওয়ার্ডে থাকা প্রত্যেকটি বাচ্চা এক এক করে— যেমন গলাকাটা মুরগির বাচ্চা ছটফট করে, ঠিক তেমনি করে তাদের মায়ের কোলে ছটফট করতে লাগল।’

তার ভাষ্য অনুযায়ী, তখন রাত আনুমানিক ৩টা থেকে সাড়ে ৩টা। বাচ্চাদের এই করুণ অবস্থা দেখে সঙ্গে থাকা নানী-দাদীরা অস্থির হয়ে ওয়ার্ডের মধ্যে চিৎকার শুরু করেন। তখনও কোনো নার্স বা ডাক্তার আসেননি। একটি বাচ্চাকে ওখান থেকে নিয়ে বাইরে অক্সিজেন বা গ্যাস দেওয়ার পর কিছুটা সুস্থ হলে আবার যখন ওয়ার্ডে নিয়ে আসা হয়, তখন সে আবারও অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং কিছুক্ষণের মধ্যে মারা যায়।

Manual3 Ad Code

ওয়ার্ডের ভেতরের পরিবেশ কেমন ছিল— এমন প্রশ্নের জবাবে নাজমা বেগম বলেন, ‘আমরা দীর্ঘক্ষণ ওয়ার্ডে থাকায় গন্ধটা প্রথম দিকে বেশি অনুভব করতে পারিনি। তবে, যারা বাইরে থেকে ওয়ার্ডে প্রবেশ করত, তারা বলত ভেতরে বিশ্রী গন্ধ। এমনিতেও সবসময় ওয়ার্ডে প্রচণ্ড গরম ভাপ ছিল। আমরা বয়স্করাই সেই গরম সহ্য করতে পারতাম না। আর ওয়ার্ডের মধ্যে তেলাপোকা ও ছারপোকার উপদ্রব ছিল ভয়াবহ। কোনো খাবার রাখলে তেলাপোকা এমনভাবে পড়ত যে খাবার একদম কালো হয়ে যেত। ওয়ার্ডে যখন আমাকে প্রথম নিয়ে যাওয়া হয়, তখনই পরিবেশ আমার পছন্দ হয়নি।’

ওয়ার্ডে ফ্যান বা এসি বন্ধের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘রোগীদের সঙ্গে আসা নানী-দাদীরা, যারা একটু বয়স্ক, তারা বাচ্চাদের ঠান্ডার ভয়ে বারবার ফ্যান ও এসি বন্ধ করে দিচ্ছিলেন। তবে, সর্বশেষ কে বন্ধ করতে বলেছে, এটা আমি নিশ্চিত করে বলতে পারব না।’

এত স্বল্প সময়ের মধ্যে এতগুলো বাচ্চা একসঙ্গে অসুস্থ হওয়ার পরও ওয়ার্ডে কোনো ডাক্তার কিংবা নার্স দেখতে পাননি বলে অভিযোগ করেন নাজমা বেগম। তিনি বলেন, এমনিতে সকালে ও দুপুরে নার্সরা এসে আমাদের ওষুধ ও খাবার দিয়ে যেত। এর বাইরে রাতে তাদের আর দেখা পাওয়া যেত না।’

নাজমা বেগম আরও বলেন, ‘রাত ২টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত ওই ভাপসা ওয়ার্ডে থাকার কারণে আমার বাচ্চা দুটো অনেক বেশি দুর্বল হয়ে পড়ে। তখন আমরা এনআইসিইউর (NICU) সামনে বাচ্চা দুটোকে নিয়ে যাই। তখন সেখানকার নার্সরা আমাদের বলে— ‘আপনারা একটু অপেক্ষা করেন, ভেতরে কয়েকটি বাচ্চাকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে, তাদের শেষ হলে আপনাদের বাচ্চাদের নেওয়া হবে’।

তিনি বলেন, এভাবে অনেকক্ষণ এনআইসিইউর সামনে অপেক্ষা করার পর বাচ্চাদের অবস্থা আরও সংকটাপন্ন হলে সকাল সাড়ে ৮টার দিকে আমরা জোর করেই তাদের হাতে আমাদের বাচ্চা দুটোকে তুলে দিই। এনআইসিইউতে নেওয়ার মাত্র পাঁচ মিনিটের মাথায় আমাকে ডেকে বলা হয়— ‘আপনার বাচ্চাদের হার্টবিট আমরা পাচ্ছি না। সর্বোচ্চ আর ১০ মিনিটের মতো আমরা চেষ্টা চালাতে পারি’। তখন আমাদের দিয়ে জরুরি ভিত্তিতে ১০ হাজার টাকার ওষুধ কেনানো হয়। কিন্তু ওষুধ দেওয়ার ১০ মিনিটের মাথায় আমাদের জানানো হয়, আমার দুটি বাচ্চাই মারা গেছে।

Manual1 Ad Code

নাজমা বেগমের সঙ্গে হাসপাতালে থাকা তার ননদ রাবেয়া বেগম বলেন, ‘রাত ২টার সময় ভাবি যখন আমাকে ডাক দেয়, তখন আমি উঠে দেখি দুটো বাচ্চাই বমি করছে। তখন আমরা দুজনে দুটি বাচ্চাকে কোলে নিয়ে তাদের পরিষ্কার করে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে রাখি। ঠিক এই সময়েই ওয়ার্ডে থাকা অন্য বাচ্চাগুলোও অল্প সময়ের মধ্যে একে একে অসুস্থ হয়ে পড়ে। কিন্তু তখনও কোনো ডাক্তার বা নার্স আসেনি।’

‘এর মধ্যে আমার সঙ্গে থাকা নিজের দুই বছরের ছেলেটাও অসুস্থ হয়ে পড়ে। পুরো শরীর ঘেমে যায় এবং তার শ্বাস ঘন হয়ে আসে। পুরো ওয়ার্ডের মধ্যে একটা ভাপসা গন্ধ ও প্রচণ্ড গরম অনুভূত হতে থাকে। এভাবে কোনোমতে আমাদের আতঙ্কের রাত কাটে। এর মধ্যে আমাদের চোখের সামনেই তিনটি নিষ্পাপ বাচ্চা মারা যায়।’

রাবেয়া বেগম বলেন, পরে সকালে এনআইসিইউর সামনে দীর্ঘক্ষণ আমাদের বাচ্চা দুটো নিয়ে অপেক্ষার পর যখন ভেতরে নেওয়া হলো, তার কিছুক্ষণের মধ্যেই জানানো হয় তারা মারা গেছে। এদিকে, আমার নিজের বাচ্চাটাও অনেক বেশি অসুস্থ হয়ে যাওয়ায় লাশ দুটি নিয়ে হাসপাতাল থেকে কোনোমতে বের হওয়ার চেষ্টা করি। পরে আমার ভাইয়েরা আসলে হাসপাতাল থেকে লাশ নিয়ে আসি।

যমজ পুত্র সন্তান হারিয়ে স্তব্ধ বাবা মো. হাসান সরদার বলেন, ‘খুব খুশি হয়েছিলাম, আল্লাহ আমাকে যমজ পুত্র সন্তান দান করেছিলেন। কিন্তু চোখের সামনে আমার সুস্থ বাচ্চা দুটো এভাবে মারা যাবে, সেটা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না। মারা যাওয়ার এক দিন আগেও আমি দুটো বাচ্চাকে কোলে নিয়েছি। তখনও ওরা পুরোপুরি সুস্থ ছিল।’

তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, হাসপাতাল থেকে রিলিজ নিয়ে বাসায় আসার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে এমন কী হলো যে আমার দুটি বাচ্চাই মারা গেল? আমি সরকারের প্রতি জোর অনুরোধ জানাই, এই ঘটনার একটি সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রকৃত দোষীদের যেন দৃষ্টান্তমূলক বিচারের মুখোমুখি করা হয়, যাতে আর কোনো বাবা-মাকে এভাবে সন্তান হারাতে না হয়। মূলত ডাক্তার-নার্সদের চরম গাফিলতির কারণেই আমি আমার সন্তানদের হারিয়েছি। আমি এর বিচার চাই।

Manual5 Ad Code

এদিকে, উক্ত ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আদ্-দ্বীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের গঠিত তদন্ত কমিটি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের কাছে এই প্রতিবেদন হস্তান্তর করা হয়।

অন্যদিকে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কর্তৃক গঠিত উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি আজ (বৃহস্পতিবার) তাদের চূড়ান্ত রিপোর্ট জমা দেবে। বিকেল ৪টায় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী স্বয়ং গণমাধ্যমের সঙ্গে এই বিষয়ে কথা বলবেন এবং মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত জানাবেন।

Manual8 Ad Code

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 ১২৩৪
৫৭৮৯১০১১
১১৩৪১৫১৬১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৯৩০৩১  

Manual1 Ad Code
Manual4 Ad Code