তথ্য গোপনের অভিযোগে এক আইনজীবীকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করাকে কেন্দ্র করে শুনানিতে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী ও সুপ্রিম কোর্ট বার সভাপতি ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকনের মধ্যে বাগবিতণ্ডার ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে প্রধান বিচারপতিসহ পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ এজলাস ছেড়ে গেছেন।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগে একটি মামলার শুনানির সময় এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার পর আর আদালত বসেননি বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চে এ সময় ছিলেন বিচারপতি মো. রেজাউল হক, বিচারপতি এস এম এমদাদুল হক, বিচারপতি ফারাহ মাহবুব এবং বিচারপতি মো. হাবিবুল গণি।
ঘটনার পর সাংবাদিকদের সামনে ঘটনার বর্ণনা দেন ব্যারিস্টার খোকন, অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল এবং অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক।
এ বিষয়ে ব্যারিস্টার খোকন সাংবাদিকদের বলেন, এক আইনজীবীকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। আমি প্রধান বিচারপতির উদ্দেশ্যে বিনয়ের সঙ্গে বললাম… যে আপনি প্রধান বিচারপতি হওয়ার পর আসলে মামলা শুনানি করা যাচ্ছে না আগের মতো। এ কারণে লইয়ারদের ইনকাম কমে গেছে। একজন জুনিয়র লইয়ারকে ৫ লাখ টাকা কস্ট দেওয়াটা… অনেক বেশি হয়ে গেছে। উনাকে মাফ করেন।
অ্যাটর্নি জেনারেল কাজল বলেন, জরিমানা মওকুফের অনুরোধের পর প্রধান বিচারপতি জানান, আদালতের সঙ্গে ‘প্রতারণা এবং গুরুতর জালিয়াতির’ বিষয়টি বিবেচনা করেই আদেশ দেওয়া হয়েছে এবং আদালত সেই আদেশ পরিবর্তন করবে না।
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, এরপর আইনজীবীদের আয় কমে যাওয়ার প্রসঙ্গে প্রধান বিচারপতি আইনজীবী খোকনের কাছে জানতে চান, তিনি কি বলতে চাচ্ছেন যে উনি প্রধান বিচারপতি হওয়ার পরই আইনজীবীদের আয় কমে গেছে?
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ব্যারিস্টার খোকন একই বক্তব্য আবার বলার চেষ্টা করলে প্রধান বিচারপতি তাকে বলেন, তার ওই বক্তব্য ‘অ্যাবসোলিউটলি আদালত অবমাননার শামিল।’
Manual7 Ad Code
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, এরপর প্রধান বিচারপতি জানান, তিনি আর আদালতে দিনের কার্যক্রমে অংশ নেবেন না। প্রধান বিচারপতি এরপর এজলাস থেকে উঠে যান।
Manual8 Ad Code
যে মামলা ঘিরে ঘটনা
মঙ্গলবার সকাল সোয়া ৯টার দিকে আপিল বিভাগ একটি মামলায় আদেশ দেন। একই বিষয়ে একাধিক রিট আবেদন এবং আগের মামলার তথ্য গোপনের অভিযোগে রিট আবেদনকারী মো. নূর আলম ও তার আইনজীবী সুফিয়া আহামেদকে পাঁচ লাখ টাকা করে মোট ১০ লাখ টাকা জরিমানা (কস্ট) করা হয়। জরিমানার টাকা ৩০ দিনের মধ্যে ঢাকা শিশু হাসপাতালে জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়।
Manual7 Ad Code
অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক জানান, ২০১৩ সালে অস্থায়ী কাজী নিয়োগকে কেন্দ্র করে এ মামলার সূত্রপাত।
যাত্রাবাড়ী থানার ৬৫ নম্বর ওয়ার্ডের নিকাহ রেজিস্ট্রার মিজানুর রহমান মুরাদের নিয়োগের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে মো. নূর আলম ২০১৬ সালে রিট আবেদন করেন, রিট পিটিশন নম্বর ১৪৮২১। সেখানে অস্থায়ী নিয়োগ স্থায়ী করার আবেদন করা হয় এবং স্থায়ী নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তির নিয়োগ বাতিল চাওয়া হয়।
ওই মামলায় নূর আলম হাইকোর্টে হেরে যাওয়ার পর বিষয়টি আপিল বিভাগে যায়। আপিল বিভাগ অস্থায়ী নিয়োগ বাতিল করে স্থায়ী নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের বহাল রাখার আদেশ দেন।
অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক বলেন, এরপর ২০১৮ সালে ১৬০৮৮ নম্বর রিট আবেদন করা হয়। আগের মামলাগুলোর তথ্য গোপন করে ২০২১ সালে ১১৪৪৬ নম্বর এবং সর্বশেষ ২০২৬ সালে ৯৬৩১ নম্বর রিট আবেদন করা হয়। এসব মামলার কোনোটিতেই আগের মামলার আদেশ এবং আপিল বিভাগের আদেশের বিষয়ে বলা হয়নি। এর মধ্যে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিবের বিরুদ্ধেও আদালত অবমাননার আবেদন আনা হয়।
তিনি বলেন, বিষয়টি একদিনে নিষ্পত্তি হয়নি। টানা তিন দিন শুনানি হয়েছে। শুনানির সময় আপিল বিভাগের রেকর্ড ও পুরনো ফাইল তলব করে দেখা হয়, একই বাদী ও একই আইনজীবী পরপর একাধিক রিট আবেদন করেছেন এবং আগের মামলাগুলোর তথ্য গোপন করেছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে আদালত রিট আবেদনকারী এবং তার আইনজীবীকে পাঁচ লাখ টাকা করে জরিমানা করেন।
Manual4 Ad Code
তিনি বলেন, জরিমানা করার সময় সংশ্লিষ্ট নারী আইনজীবী আদালতে উপস্থিত ছিলেন এবং তিনি কোনো উচ্চবাচ্য না করে আদালতের আদেশ মেনে নেন। প্রায় তিন ঘণ্টা পর ব্যারিস্টার খোকন বিষয়টি নিয়ে আদালতে কথা বলেন। তখন ওই নারী আইনজীবী সেখানে উপস্থিত ছিলেন না।
অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক বলেন, আমার মনে হয় না যে এখানে ওই নারী আইনজীবী কোনো কিছু করেছেন। মাহবুব উদ্দিন খোকন সাহেব সম্পূর্ণ নিজের উদ্যোগে এই কাজটি করেছেন। ব্যারিস্টার খোকন এসব মামলায় ফাইলিং আইনজীবীর সিনিয়র হিসেবে যুক্ত ছিলেন বলেও জানান অনীক।