প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

২৭শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১২ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
১৬ই রবিউস সানি, ১৪৪৮ হিজরি

ভারতের অস্ত্র সিন্ধুর পানি

editor
প্রকাশিত মে ১১, ২০২৫, ০৯:১৪ পূর্বাহ্ণ
ভারতের অস্ত্র সিন্ধুর পানি

Manual8 Ad Code

প্রজন্ম ডেস্ক:

 

পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পাদিত প্রায় ৬৫ বছরের পুরোনো সিন্ধু পানিচুক্তি স্থগিত করেছে ভারত। এতে পাকিস্তানের কৃষকরা এখন প্রায় ধ্বংসের মুখে। নদী পরিণত হয়েছে নতুন যুদ্ধক্ষেত্রে।

যুদ্ধের অস্ত্র সব সময় মিসাইল, বোমা বা ড্রোন নয়। কখনো কখনো পানিও হতে পারে অস্ত্র। এ যুদ্ধে ভারত দেখিয়েছে, এই অস্ত্র কতটা শক্তিশালী হতে পারে। ভারত যখন ঘোষণা দিয়ে সিন্ধু নদের পানিপ্রবাহ হ্রাস করেছে, তখনই পাকিস্তানের খাদ্যনিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।

সিন্ধু নদের এই পানি হচ্ছে পাকিস্তানের ‘লাইফ লাইনে’র মতো। সপ্তাহখানেক আগে, নয়াদিল্লি ভারত-শাসিত কাশ্মীরে পর্যটকদের ওপর জঙ্গি হামলার প্রতিক্রিয়ায় এই ব্যবস্থা নেয়। পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী প্রতিবেশীর সঙ্গে সে কয়েক দশকের পুরোনো জলবণ্টন চুক্তি স্থগিত করে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঘোষণা করেন, ‘তার দেশ আন্তর্জাতিক সীমানার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া পানির প্রবাহ বন্ধ করে দেবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ভারতের জল ভারতের সুবিধার জন্য প্রবাহিত হবে, ভারতের সুবিধার জন্য সংরক্ষণ করা হবে এবং ভারতের অগ্রগতির জন্য ব্যবহার করা হবে।’

এর এক দিন পর, দিল্লি পাকিস্তানি ভূখণ্ডে সশস্ত্র সিরিজ হামলা চালায়। দুই দেশ তখন থেকেই গোলাগুলি বিনিময় করছে। একে অপরের আকাশসীমায় ড্রোন পাঠিয়েছে আর ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। ইতোমধ্যে এই সহিংসতায় প্রায় অর্ধশত মানুষ মারা গেছেন।

পাকিস্তান ভাটি অঞ্চলের দেশ। দেশটির তিন-চতুর্থাংশেরও বেশি পানি বাইরের উৎসের ওপর নির্ভরশীল। পুনর্নবায়িত করে সে এই পানি ব্যবহার করে। গত কয়েক সপ্তাহে ভারত এই বার্তা দিতে চেয়েছে যে পানিই শক্তি এবং এই শক্তিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা যায়।

পানি সংরক্ষণ-সম্পর্কিত ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক থিংক ট্যাংক প্যাসিফিক ইনস্টিটিউটের মতে, এই ব্যবস্থা গ্রহণ করে যেসব দেশ পানিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে, ভারত তাদের দলভুক্ত হলো। একুশ শতকের শুরু থেকে পানিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার এই প্রবণতা বিশ্বজুড়ে বেড়ে গেছে। ২০১৭ সালের পর থেকে জল নিয়ে সফল ভাগাভাগি চুক্তির চেয়ে একে ভিন্নভাবে ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে।

নীল নদ থেকে ইউফ্রেতিস অথবা মেকং নদী পর্যন্ত সংঘাতের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। কারণ সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলো ক্রমেই ‘জল-অপ্রতুল বিশ্বে’ তাদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে চায়। বিশ্বজুড়ে পানির চাহিদা তীব্র হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্লেষকরা জীবন-ধারণকারী পানির সংস্থান নিয়ে বিরোধ বৃদ্ধির পূর্বাভাস দিচ্ছেন।

ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংক ট্যাংক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের পানি-নিরাপত্তাবিষয়ক সিনিয়র ফেলো ডেভিড মিশেল বলেন, ‘পানির চাহিদা এবং সরবরাহের মধ্যে ব্যবধান যত বেশি হবে, পানির সম্পদ নিয়ন্ত্রণে অবস্থানকারী দেশগুলোর ক্ষমতার দাপট তত বেশি দেখা যাবে। এ কারণেই ভারতের চাপ প্রয়োগের বিষয়টি পাকিস্তানের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ আর আশঙ্কাজনক হয়ে উঠবে।’

তিনি সতর্ক করে বলেছেন, উজানের দেশগুলো পানিকে কৌশলগত সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করছে। পানি শুধু জল-সম্পর্কিত বিরোধে সীমাবদ্ধ থাকবে না; অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিসরেও এর ব্যবহার দেখা যাবে।

খরাপ্রবণ আফগানিস্তানে হরিরুদ, হেলমান্দ, কাবুল ও কুনার নদীর ওপর বাঁধ এবং খাল নির্মাণের প্রচেষ্টা নিয়ে ইরান, পাকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তানের সঙ্গে আফগানিস্তানের উত্তেজনা বেড়েছে। প্রতিবেশী এই দেশগুলো ক্ষমতাসীন আফগান তালেবান শাসকদের বিরুদ্ধে পানির ভাগাভাগিকে দর-কষাকষিতে পরিণত করার অভিযোগ তুলেছে।

Manual8 Ad Code

একইভাবে, আমু দরিয়া নদীর সেচ প্রকল্পগুলো নিয়ে আফগানিস্তান এবং ভাটির দেশ উজবেকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তানের মধ্যকার সম্পর্ক উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। নদীর পানির হিস্যা নিয়ে তাজিকিস্তান ও কিরগিজস্তানের মধ্যে বারবার সীমান্ত সংঘর্ষ হচ্ছে।

ভারতও একইভাবে প্রতিবেশী চীনের ভূমিকার কারণে উদ্বিগ্ন। তিব্বতের ইয়ারলুং সাংপো নদীর ওপর চীন একটা সুপারড্যাম তৈরি করায় ভাটির দেশ হিসেবে ব্রহ্মপুত্র নদে পর্যাপ্ত পানির সংকটে ভুগছে ভারত। ভারত ও বাংলাদেশের অংশে ইয়ারলুং সাংপো নদী ব্রহ্মপুত্র নামে প্রবাহিত। এদিকে গঙ্গার ওপর নির্মিত ভারতের ফারাক্কা বাঁধের কারণে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরে বেশ তিক্ত হয়ে আছে। বাংলাদেশ পানির পর্যাপ্ত হিস্যার সংকটে আছে।

বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় সম্পাদিত সিন্ধু জলচুক্তির মতো শক্তিশালী চুক্তির অভাবে, যে চুক্তি ভারত গত মাসে স্থগিত করেছে, এশিয়াজুড়ে উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলেছে। মেকং নদীর উজানে চীনের পানি-আধিপত্যের কারণে ভাটির দেশ ক্যাম্বোডিয়া, লাওস, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের মধ্যেও বিরোধ দেখা দিয়েছে। আরও পশ্চিমে, ইউফ্রেতিস ও তাইগ্রিসের ওপর তুরস্কের নির্মিত বাঁধগুলো ইরাক ও সিরিয়ায় পানির প্রবাহ হ্রাস করেছে; এই দেশগুলোর মধ্যেও পানি নিয়ে দেখা দিয়েছে বিরোধ। এদিকে আফ্রিকায়, ইথিওপিয়ার বিশাল ‘নাইল বাঁধ প্রকল্প’ মিসর ও সুদানের সঙ্গে দেশটির শত্রুতা তীব্রতর করেছে।

 

সংঘাতের চালক

Manual1 Ad Code

পানি দীর্ঘকাল ধরেই সভ্যতা এবং সংঘাতের চালক। নীল নদ, ইউফ্রেতিস-তাইগ্রিস এবং সিন্ধু নদ বিশ্বের প্রথম কিছু সভ্যতার জন্ম দিয়েছে। কিন্তু তাদের জলপ্রবাহ দিন দিন ক্ষীণ হয়ে আসছে। কোনো কোনো পণ্ডিতের মতে, সিন্ধু নদের গতিপথ প্রাকৃতিকভাবে পরিবর্তিত হওয়ায় ১৩০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের ব্রোঞ্জ যুগের হরপ্পা সভ্যতা ধ্বংস হয়ে গেছে।

এখন হিমালয়ের হিমবাহ, যা দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার লাখ লাখ মানুষের পানির উৎস, আশঙ্কাজনক হারে গলে যাচ্ছে। কিছু গবেষণা বলছে, এই হিমবাহগুলো এই শতাব্দীর শেষ দিকে তাদের বিস্তার বা প্রবহমানতা ৮০ শতাংশ হারাতে পারে। এই বিশাল প্রাকৃতিক জলাধারের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোর জন্য তা চরম বিপর্যয় ডেকে আনবে।

মিশেলের মতে, পানির স্বল্পতার কারণে আধুনিক সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা নেই। কিন্তু পানির নিরাপত্তাহীনতা ‘জীবন ও জীবিকার ওপর ভয়ংকর ক্ষতির ঝুঁকি’ তৈরি করবে। এই বিশ্লেষণ বিশ্বব্যাংকের। প্রতিষ্ঠানটির মতে, যথাযথ নীতির অভাবে পানির ঘাটতি মধ্য আফ্রিকা, সাহেল, পূর্ব ও মধ্য এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতিকে ২০৫০ সালের মধ্যে ১৪ শতাংশ পর্যন্ত সংকুচিত করতে পারে। পানি তাই ক্রমেই সংঘাতের চালক হয়ে উঠছে। কথাটা বলেছেন দ্য হেগ সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের জলবায়ু, পানি ও খাদ্যনিরাপত্তা কর্মসূচির পরিচালক লরা বার্কম্যান। পাকিস্তানেও এর প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী।

জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও পানির অভাবে পাকিস্তানের সিন্ধু অঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্য, জীবিকা, খাদ্য ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। পাকিস্তানের অভ্যন্তরেই উত্তেজনা ও সহিংসতা বৃদ্ধি পাবে। বিশেষ করে সিন্ধু প্রদেশের মানুষের জীবনের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যাবে।

Manual1 Ad Code

বিশ্লেষকরা বলছেন, পাকিস্তান এখন এই হুমকির মধ্যে রয়েছে। কৃষকদের খাদ্য উৎপাদনের সেকেলে ব্যবস্থার জন্য পানির প্রবাহ থাকা জরুরি। অন্যদিকে পানি ছেড়ে দিলে তা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। ২০২২ সালের দক্ষিণ সিন্ধুর ‘মহাবন্যা’ এখনো সিন্ধুবাসীদের ভোগাচ্ছে। ওই বন্যায় পাকিস্তানের এক-তৃতীয়াংশ জায়গা জলমগ্ন হয়েছে, ফসল ও গবাদি পশু ধ্বংস হয়ে গেছে।

Manual2 Ad Code

ওই বন্যার পর সেখানকার অধিকাংশ কৃষক প্রতিটি ফসল উৎপাদনে ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছেন। ২০১০ সালেও আরেকটা বন্যা হয়েছিল, যে বন্যায় চালের উৎপাদন ৩০ শতাংশ কমে যায়। ভারতের সঙ্গে পানিচুক্তি না থাকলে অতিবন্যা অথবা পানির অভাব, দুই-ই ঘটতে পারে।

 

সিন্ধু প্রদেশেই পাকিস্তানের দ্বিতীয় বৃহত্তম কৃষিপণ্য উৎপাদিত হয়। ভারতের সঙ্গে পানিচুক্তি থাকার সময়ও এই উৎপাদন পাঞ্জাব প্রদেশের তুলনায় সিন্ধুতে ২০-৪০ শতাংশ কম হতো। ১৯৬০ সালের পানিচুক্তি অনুসারে পাকিস্তান সিন্ধু নদের পানি পাওয়ার অধিকার পেয়েছে। এতে ঝিলাম ও চেনাব নদীতে পানিপ্রবাহের নিশ্চয়তা রয়েছে। লরা বার্কম্যান বলছেন, এখন ভারত চুক্তিটি স্থগিত করায় পানির অভাবে ফসল উৎপাদনের বিষয়টি ‘ভয়াবহ’ হয়ে উঠবে। চাষিরা বলছেন, পানির জন্য প্রযুক্তির ব্যবহার এবং অন্যান্য কারণে আগের তুলনায় তাদের বেশি অর্থ ব্যয় হবে। তীব্র অর্থসংকটে পড়বেন তারা। ঐতিহ্যবাহী জীবনযাপনে সংকট দেখা দেবে। ব্যাপক হারে ঘটবে স্থানান্তর বা অভিবাসন। ঐতিহ্যবাহী বাসস্থান ছেড়ে শিকড়চ্যুত হয়ে চলে যেতে হবে জনবহুল শহরে। মারাত্মভাবে খাদ্যনিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে। মূল সমস্যা হবে এটাই।

পাকিস্তান ও বিশ্বের পানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিন্ধু নদের পানির অভাবে পাঞ্জাবের দক্ষিণাংশ এবং সিন্ধুর উত্তরাংশ যে ক্ষতির সম্মুখীন হবে, পাকিস্তানকে সে জন্য তার খাদ্যনিরাপত্তার বিষয়টি এখনই নতুন করে পুনর্বিন্যস্ত করতে হবে। ভারত চেনাব ও ঝিলাম নদীর ওপর বাঁধ নির্মাণ করেছে। চুক্তিটি স্থগিত করায় এই বাঁধের মাধ্যমে ভারত ২০ শতাংশ পানি নিয়ে নিচ্ছে। এতে পুরো ইকোসিস্টেমই ভেঙে পড়বে। স্বাভাবিকভাবেই পাকিস্তানের পুরো পানি ব্যবস্থাপনাকে এখন ঢেলে সাজাতে হবে। সেচ ও চাষের ব্যবস্থাকে আধুনিক করাসহ পদ্ধতিগত পুনর্বিন্যাসেরও প্রয়োজন পড়বে।

বার্কম্যান বলছেন, এটা একটা মানবিক সমস্যা। যদি এর সমাধান না করা যায়, তাহলে আঞ্চলিক সম্পর্কে অবধারিতভাবে অস্থিরতা দেখা দেবে। ২০৫০ সালের মধ্যে, বিশ্বব্যাংকের গবেষণায় বলা হচ্ছে, দক্ষিণ এশিয়ায় চার কোটি মানুষ আবহাওয়া পরিবর্তনজনিত কারণে স্থানান্তরের শিকার হবে। সীমান্তেও এই উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। অবশ্য সমস্যাটি শুধু পাকিস্তান বা দক্ষিণ এশিয়ার নয়; ইউরোপ, আফ্রিকা, যুক্তরাষ্ট্র পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়বে। ‘সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলো সম্মিলিতভাবে যদি এই সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে কাজ করে, তাহলেই কেবল এই সমস্যার সমাধান হবে’, বলেছেন বার্কম্যান।

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 ১২৩৪৫
৭৮৯১০১১১১৩
৪১৫১৬১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৯৩০  

Manual1 Ad Code
Manual2 Ad Code