প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

১৪ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৩১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২৮শে জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি

কত হাজার কোটি টাকার বিদ্যুৎ নষ্ট হচ্ছে রাস্তায়

editor
প্রকাশিত এপ্রিল ২৯, ২০২৬, ১১:০৬ পূর্বাহ্ণ
কত হাজার কোটি টাকার বিদ্যুৎ নষ্ট হচ্ছে রাস্তায়

Manual7 Ad Code

 

আগামী প্রজন্ম ডেস্ক:

Manual5 Ad Code

দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়লেও সরবরাহ, ব্যবস্থাপনা ও দক্ষ ব্যবহারের সীমাবদ্ধতা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। ঘন ঘন লোডশেডিং, শিল্প খাতে বিদ্যুৎ সংকট এবং ভর্তুকির চাপ— সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ খাত একটি নাজুক ভারসাম্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এই প্রেক্ষাপটে আলোচনার আড়ালে থেকে যাওয়া, কিন্তু দ্রুত বিস্তৃত একটি খাত হলো ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ভ্যান।

শহর থেকে গ্রাম— সব জায়গাতেই এই বাহনের বিস্তার ঘটেছে দ্রুতগতিতে। একদিকে এটি মানুষের চলাচল সহজ করছে, অপর দিকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহার করে জাতীয় গ্রিড, অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। এর বড় অংশই অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, অদক্ষ প্রযুক্তি এবং অবৈধ সংযোগের কারণে কার্যত অপচয়ে পরিণত হচ্ছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ভ্যান এখন বাংলাদেশের পরিবহন বাস্তবতার অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু পরিকল্পনাহীন বিস্তার, অদক্ষ প্রযুক্তি এবং অবৈধ বিদ্যুৎ ব্যবহারের কারণে এটি ধীরে ধীরে বিদ্যুৎ খাতের জন্য বড় বোঝা হয়ে উঠছে।

 

কত বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে এই খাতে?

বাংলাদেশে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ভ্যানের নির্ভরযোগ্য সরকারি পরিসংখ্যান নেই। তবে বিভিন্ন গবেষণা ও সংশ্লিষ্ট খাতের ধারণা অনুযায়ী, দেশে প্রায় এক কোটির বেশি এমন যান চলাচল করছে, যার বড় অংশই অনিবন্ধিত।

প্রতিটি যান গড়ে দৈনিক ৪ থেকে ৬ ইউনিট (কিলোওয়াট-ঘণ্টা) বিদ্যুৎ ব্যবহার করে। সে হিসাবে অন্তত ৮০ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা বা ভ্যান হলে এর পেছনে প্রায় ৪ কোটি ইউনিটের কাছাকাছি বিদ্যুৎ ব্যয় হচ্ছে।

অর্থাৎ, একটি বড় আকারের একাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সমপরিমাণ বিদ্যুৎ প্রতিদিন ব্যয় হচ্ছে শুধু এই খাতে। তবে এর বড় অংশই আনুষ্ঠানিক হিসাবের বাইরে থেকে যাচ্ছে।

‘অদৃশ্য’ বিদ্যুৎ ব্যবহার কেন?

বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলোর মতে, ব্যাটারিচালিত রিকশার বিদ্যুৎ ব্যবহার সঠিকভাবে ধরা পড়ে না কয়েকটি কারণে—চার্জিং হয় বাসা বা ছোট গ্যারেজে, অনেক ক্ষেত্রে অবৈধ সংযোগ ব্যবহৃত হয়, আলাদা মিটারিং বা নির্দিষ্ট ট্যারিফ নেই।

বাণিজ্যিক ব্যবহার হলেও গৃহস্থালি সংযোগে চার্জ দেওয়া হয়। ফলে এই খাতের প্রকৃত বিদ্যুৎ ব্যবহার ও আর্থিক প্রভাব নিরূপণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

বিদ্যুতের বিশাল চাহিদা: কোটি টাকার হিসাব

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় এক কোটি বৈদ্যুতিক তিন চাকার যান চলাচল করছে। এসব যান চালাতে প্রতিদিন প্রায় ৩২ গিগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়। বছরে এর পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১১.৭ টেরাওয়াট-ঘণ্টা। এই বিদ্যুতের আর্থিক মূল্যও বিশাল। প্রতিদিন এই খাতে ব্যয় হচ্ছে আনুমানিক ২৮ থেকে ৩০ কোটি টাকা, যা বছরে গিয়ে দাঁড়ায় ১০ হাজার কোটি টাকারও বেশি।

তবে বাস্তবতা আরও জটিল। কারণ সংশ্লিষ্টদের মতে, এই বিদ্যুতের একটি বড় অংশই অপচয় বা চুরি হিসেবে হারিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন গবেষণা ও মাঠপর্যায়ের তথ্য বলছে— শুধু রাজধানীতেই বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার বিদ্যুৎ চুরি হচ্ছে। আর দেশজুড়ে এই অদৃশ্য অপচয়ের পরিমাণ আরও কয়েকগুণ বেশি হতে পারে। অর্থাৎ, সরাসরি খরচের পাশাপাশি অদক্ষতা ও অবৈধ ব্যবহারের কারণে হাজার হাজার কোটি টাকার বিদ্যুৎ কার্যত ‘নষ্ট’ হচ্ছে রাস্তায়।

 

রাজধানীতে ‘বাংলা টেসলা’র দৌরাত্ম্য

Manual6 Ad Code

রাজধানীতে অনিয়ন্ত্রিতভাবে ছড়িয়ে পড়া ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা—স্থানীয়ভাবে যেগুলোকে অনেকে ‘বাংলা টেসলা’ বলে উল্লেখ করছেন। এই অটোরিকশা এখন বড় ধরনের বিদ্যুৎ চুরি ও নগর ব্যবস্থাপনার সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব যানবাহনের ব্যাটারি চার্জিংকে কেন্দ্র করে বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন হচ্ছে, যার বড় অংশই বিদ্যুৎ চুরির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।

কার্যকর গণপরিবহনের ঘাটতিতে রাজধানীতে ব্যাটারিচালিত রিকশা দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠলেও এর নিয়ন্ত্রণহীন বিস্তার উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বর্তমানে ঢাকার রাস্তায় আনুমানিক ১০ লাখের বেশি এ ধরনের যান চলাচল করছে। তবে এসব রিকশার কোনও নিবন্ধন ব্যবস্থা না থাকায় এগুলো কার্যত অননুমোদিতভাবেই পরিচালিত হচ্ছে।

অপরদিকে, বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় ব্যাটারি চার্জিং স্টেশনের অনুমোদন দিলেও বাস্তবে এই খাতটি বড় অংশেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে। রাজধানীতে প্রায় ৩ হাজার ৩০০ বৈধ চার্জিং স্টেশনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ডিপিডিসির আওতায় রয়েছে প্রায় ২ হাজার ১০০টি। কিন্তু এর বাইরে বিস্তৃত হয়েছে বিশাল অবৈধ নেটওয়ার্ক।

ঢাকা মহানগর পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর আটটি বিভাগে বৈধ স্টেশনের পাশাপাশি রয়েছে ৪৮ হাজারের বেশি অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট এবং প্রায় এক হাজার গ্যারেজ, যেখানে নিয়মিত ব্যাটারি চার্জিং কার্যক্রম চলছে। এসব গ্যারেজের অনেকগুলোতেই বৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ থাকলেও তার আড়ালে অবৈধ সংযোগ ব্যবহার করা হচ্ছে।

সরেজমিন দেখা গেছে, মিরপুর, রূপনগর, পল্লবী, তেজগাঁও, মালিবাগ, রামপুরা, খিলগাঁও ও লালবাগসহ বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে অসংখ্য অননুমোদিত চার্জিং কেন্দ্র। অনেক ক্ষেত্রে স্ট্রিটলাইটের খুঁটি কিংবা মূল বিদ্যুৎ লাইনে সরাসরি সংযোগ নিয়ে রাতভর চার্জ দেওয়া হচ্ছে।

গ্যারেজ মালিক ও শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একটি রিকশা চার্জ দিতে খরচ হয় ৭০ থেকে ১০০ টাকা, কিন্তু নেওয়া হয় ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। দৈনিক কয়েক হাজার টাকার বিদ্যুৎ ব্যবহার দেখানো হলেও বাস্তবে এর চেয়ে অনেক বেশি রিকশা চার্জ দেওয়া হচ্ছে, যা অবৈধ বিদ্যুৎ ব্যবহারের ইঙ্গিত দেয়।

এই চার্জিং ব্যবসা এখন একটি লাভজনক খাতে পরিণত হয়েছে। অনেক বাড়ির মালিক আবাসিক ভবনের নিচতলা গ্যারেজ হিসেবে ভাড়া দিয়ে বেশি আয় করছেন। ফলে শহরের আবাসিক এলাকাগুলোও ধীরে ধীরে চার্জিং হাবে রূপ নিচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, স্পষ্ট নীতিমালার অভাবই এই সংকটের মূল কারণ। অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারিচালিত যানবাহন যেমন সড়কে যানজট ও দুর্ঘটনা বাড়াচ্ছে, তেমনই বিদ্যুৎ খাতেও সৃষ্টি করছে বড় ধরনের চাপ ও ক্ষতি। বাঘ ইকো মোটরস লিমিটেডের প্রেসিডেন্ট কাজী জসিমুল ইসলাম বাপ্পি বলেছেন, অবৈধ ইজিবাইক রাজধানীসহ সারা দেশে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চলাচল করছে, যা জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

তিনি জানান, শুধু ঢাকা শহরেই বর্তমানে প্রায় ৮৬ হাজার তিন চাকার রিকশা বিদ্যুতে চলছে। এসব রিকশায় দৈনিক গড়ে দুইবার চার্জ দিতে হয় এবং প্রতিবার চার্জ বাবদ ব্যয় হয় প্রায় ৮০ টাকা। সে হিসাবে একটি রিকশার দৈনিক বিদ্যুৎ খরচ দাঁড়ায় ১৬০ টাকা। ফলে কেবল ঢাকাতেই রিকশাগুলোর পেছনে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৩৭ লাখ ৬০ হাজার টাকা বিদ্যুৎ ব্যয় হচ্ছে।

জাতীয় পর্যায়ে এ চিত্র আরও বড় আকার ধারণ করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সারা দেশে প্রায় ১ কোটি ৩ লাখ রিকশা ও ভ্যান বর্তমানে বিদ্যুৎচালিত। একই হারে হিসাব করলে, এসব যানবাহনের দৈনিক বিদ্যুৎ ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ১ হাজার ৬৪৮ কোটি টাকা।

বিশ্লেষকদের মতে, দেশে উৎপাদিত বিদ্যুতের বড় একটি অংশই তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে আসে। ফলে তেল ব্যবহার করে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সড়কে ব্যবহারের মাধ্যমে এক ধরনের পরোক্ষ জ্বালানি অপচয় হচ্ছে, যা জ্বালানি দক্ষতা ও সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।

এ প্রেক্ষাপটে সংশ্লিষ্টরা ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত যানবাহন নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন, চার্জিং ব্যবস্থার শৃঙ্খলা এবং বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করছেন।

অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার: পরিসংখ্যানের বাইরে বড় বাস্তবতা

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) হিসাবে নিবন্ধিত তিন চাকার যানবাহনের সংখ্যা মাত্র ৩ থেকে সাড়ে ৩ লাখ। অথচ বাস্তবে বিভিন্ন গবেষণা বলছে—দেশে ৬০ থেকে ৭০ লাখ অনিবন্ধিত যান রয়েছে। মোট সংখ্যা ১ কোটিরও বেশি।

এই বিশাল অংশটি কোনও নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর মধ্যে নেই। ফলে বিদ্যুতের ব্যবহার এখন অনিয়ন্ত্রিত। এর ফলে সরকারের কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আদায় হচ্ছে না। এছাড়া নীতিগত নজরদারি কার্যত অনুপস্থিত।

অনিবন্ধিত তিন চাকার এসব যানবাহন দেশের গ্রামীণ ও উপশহর এলাকায় ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এগুলো আইনি কাঠামোর বাইরে পরিচালিত হচ্ছে। ফলে একদিকে বিদ্যুতের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার বাড়ছে, অপরদিকে রাজস্ব ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার বাইরে থেকে যাচ্ছে একটি বড় পরিবহন খাত।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই খাতকে ধীরে ধীরে একটি সুসংগঠিত নীতিমালার আওতায় আনতে না পারলে বিদ্যুৎ খাতে চাপ, অবৈধ সংযোগ এবং আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. তৌফিকুল ইসলাম খান বলেছেন, বিদ্যুৎচালিত যানবাহনের ব্যবহার বর্তমানে বিশ্বের অনেক দেশেই বাড়ছে। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—এসব যানবাহনে ব্যবহৃত বিদ্যুতের একটি বড় অংশই অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে নেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, অবৈধ লাইনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ ব্যবহার বাড়ায় সিস্টেম লস বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং এতে সরকারের ভর্তুকির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে। যত্রতত্র অবৈধ সংযোগের প্রবণতা বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

ড. তৌফিকুল ইসলাম খান আরও বলেন, দেশে চলাচলরত বেশিরভাগ বৈদ্যুতিক যানবাহনেরই কোনও বৈধ লাইসেন্স, রোড পারমিট বা নিয়ন্ত্রণ কাঠামো নেই। প্রশিক্ষণ ছাড়াই এসব যানবাহন সড়কে চলাচল করছে, যার ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে। তিনি উল্লেখ করেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনে তেলনির্ভরতা কমিয়ে টেকসই ও বিকল্প জ্বালানির দিকে দ্রুত অগ্রসর হওয়া জরুরি। এতে বিদ্যুৎ খাতের ওপর চাপ কমবে এবং পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবস্থায় রূপান্তর সহজ হবে।

ঢাকায় প্রতিদিন কোটি টাকার বিদ্যুৎ ব্যয়

শুধু রাজধানী ঢাকাতেই প্রায় ৮৬ হাজার বৈদ্যুতিক রিকশা চলাচল করছে। প্রতিটি রিকশায় দৈনিক গড়ে ১৬০ টাকার বিদ্যুৎ খরচ ধরলে প্রতিদিন খরচ হচ্ছে প্রায় ১.৩৭ কোটি টাকা। অপরদিকে, সারা দেশে যদি প্রায় ১ কোটি যান ধরা হয়, তাহলে দৈনিক ব্যয়ের পরিমাণ কয়েকশ’ কোটি টাকায় পৌঁছে যায়—যা বিদ্যুৎ খাতের ওপর বিশাল চাপ সৃষ্টি করছে।

Manual5 Ad Code

‘অদৃশ্য’ বিদ্যুৎ ব্যবহার ও চুরি

Manual4 Ad Code

এই খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—বিদ্যুৎ ব্যবহারের বড় অংশই হিসাবের বাইরে। কারণ অধিকাংশ চার্জিং হয় বাসা বা ছোট গ্যারেজে, অবৈধ সংযোগের ব্যবহার ব্যাপক, আলাদা কোনও ট্যারিফ বা মিটারিং নেই, গৃহস্থালি সংযোগ দিয়ে বাণিজ্যিক কাজ চলছে। ফলে প্রকৃত ব্যবহার ও ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। রাজধানীতে প্রায় ৪৮ হাজারের বেশি অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি বিদ্যুৎ লাইনে হুকিং করে রাতভর চার্জ দেওয়া হচ্ছে।

 

রাতের ‘গোপন লোড’, নতুন ঝুঁকি

বেশিরভাগ রিকশা রাতে চার্জ দেওয়া হয়। এতে স্থানীয় ট্রান্সফরমারে অতিরিক্ত চাপ পড়ে, ভোল্টেজ কমে যায় এবং অনাকাঙ্ক্ষিত লোডশেডিং বাড়ে। বিদ্যুৎ প্রকৌশলীরা বলছেন, এই ‘অদৃশ্য লোড’ এখন গ্রিড ব্যবস্থাপনার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

অপচয়ের মূল কারণ প্রযুক্তিগত অদক্ষতা

বর্তমানে বেশিরভাগ যানবাহনে ব্যবহৃত হচ্ছে লিড-অ্যাসিড ব্যাটারি। নিম্নমানের চার্জার ও কম দক্ষ মোটর। ফলে বিদ্যুতের বড় অংশ তাপে অপচয় হয়। ব্যাটারির আয়ু কমে যায়। একই দূরত্বে বেশি বিদ্যুৎ লাগে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করলে ৩০-৪০ শতাংশ বিদ্যুৎ সাশ্রয় সম্ভব।

বিদ্যুৎ থেকে জ্বালানি, দ্বিগুণ চাপ

বাংলাদেশে উৎপাদিত বিদ্যুতের একটি বড় অংশই তেলনির্ভর কেন্দ্র থেকে আসে। ফলে তেল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন, সেই বিদ্যুৎ দিয়ে যান চালানো। এই দ্বৈত প্রক্রিয়ায় জ্বালানি দক্ষতা কমে যাচ্ছে এবং অর্থনীতিতে বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।

 

স্বাস্থ্য ঝুঁকি: সিসা দূষণের হুমকি

ব্যাটারি পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের সঙ্গে যুক্ত সিসা দূষণ জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে উঠছে। শিশুদের রক্তে সিসার উপস্থিতি বাড়ছে। শিল্পাঞ্চল সংলগ্ন এলাকায় ঝুঁকি বেশি। দীর্ঘমেয়াদে মস্তিষ্কের বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে।

 

ভর্তুকির চাপ ও অর্থনৈতিক প্রভাব

বাংলাদেশে বিদ্যুৎ খাতে এখনও ভর্তুকি রয়েছে। ফলে এই বিপুল বিদ্যুৎ ব্যবহার পরোক্ষভাবে রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। এর প্রভাবে ভর্তুকির পরিমাণ বাড়ছে। শিল্প খাতে বিদ্যুৎ সরবরাহে চাপ তৈরি হচ্ছে। উৎপাদনশীল খাত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কম উৎপাদনশীল খাতে বিদ্যুতের এই ব্যবহার সামগ্রিক অর্থনীতির দক্ষতা কমিয়ে দিচ্ছে।

 

বিদ্যুৎ সংকটের প্রেক্ষাপট

বর্তমানে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ১৫-১৬ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছেছে। কিন্তু জ্বালানি ঘাটতির কারণে প্রায়ই ২৫০০-৩০০০ মেগাওয়াট ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। এই সংকটের মধ্যেই ব্যাটারিচালিত যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত বিদ্যুৎ ব্যবহার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

 

ইতিবাচক দিকও রয়েছে

সব কিছুর পরও এই খাতের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক দিক রয়েছে— স্বল্প আয়ের মানুষের কর্মসংস্থান। গ্রাম ও শহরে লাস্ট-মাইল সংযোগ। জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরতা কমানো। তাই এটি নিষিদ্ধ করার পরিবর্তে সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনায় আনা জরুরি।

 

নীতিগত শূন্যতা: সংকটের মূল

এই খাতের বড় সমস্যা হলো পরিবহন আইনে স্পষ্ট অবস্থান নেই। বিদ্যুৎ ব্যবহারে আলাদা নীতি নেই। স্থানীয় পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ দুর্বল। ফলে একটি ‘গ্রে এরিয়া’ তৈরি হয়েছে—যেখানে ব্যবহার আছে, কিন্তু কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নেই। বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার বিদ্যুৎ ব্যয়ের পাশাপাশি হাজার হাজার কোটি টাকার অপচয়—এই বাস্তবতা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

এখনই সঠিক নীতিমালা, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা গেলে এই খাত বোঝা নয়, বরং টেকসই ও দক্ষ পরিবহন ব্যবস্থায় পরিণত হতে পারে। অন্যথায় ভবিষ্যতে এটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াবে।

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
১০১১১৩
১৫১৬১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭
৩০  

Manual1 Ad Code
Manual5 Ad Code