ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সরকার এবার চিন্তা করছে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের। বিষয়টি ইতোমধ্যে রাজনৈতিক অঙ্গন তো বটেই, জাতীয় সংসদ অধিবেশনের আলোচনায়ও উঠে এসেছে। জাতীয় সংসদে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জারি করা অধ্যাদেশ পাস হওয়ার পর স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত হওয়ার বিষয়টি পরিষ্কার হয়েছে। সংশোধিত আইনের আলোকে আচরণ-বিধিমালা ও নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালা সংশোধনের বিষয়টি নিয়ে কাজ শুরুর প্রস্তুতি চলছে নির্বাচন কমিশনে (ইসি)। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা পেলেই আনুষ্ঠানিকভাবে এ নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করার অপেক্ষায় এ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি। ইসির পক্ষ থেকে তফসিল ঘোষণার প্রাক-প্রস্তুতি হিসেবে ন্যূনতম ৪৫ দিনের মতো সময় রাখার জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে।
Manual1 Ad Code
ইসি ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানাচ্ছে, জাতীয় নির্বাচনের পর থেকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষ থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এরই মধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদে প্রশাসক হিসেবে বিএনপির দলীয় প্রতিনিধি বসানো হলে এ নিয়ে সমালোচনার পাশাপাশি নির্বাচনের আওয়াজ তোলে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো। কোনো কোনো দল বিভিন্ন সিটি করপোরেশনের জন্য দলীয় প্রার্থীর নামও ঘোষণা করে। নির্বাচন বিবেচনায় নিয়ে তৃণমূল পর্যায়েও কাজ শুরু করেছেন বিভিন্ন দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা। এরই ধারাবাহিকতায় গত ২৭ এপ্রিল জাতীয় সংসদে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কাছে স্থানীয় সরকার নির্বাচন সম্পর্কে জানতে চান স্বতন্ত্র ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা। জবাবে মন্ত্রী জানান, “এই নির্বাচনের বিষয়টি সরকারের সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে। প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শেষে দ্রুত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহের নির্বাচনী প্রক্রিয়া শুরু করা হবে।”
Manual8 Ad Code
এদিকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিষয়টি নিয়ে এই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে আলোচনা করবেন। তাদের আলোচনাসাপেক্ষে উপযুক্ত পারিপার্শ্বিকতা বিবেচনায় নিয়ে সে অনুযায়ী ইসিকে নির্দেশনা দেওয়া হবে। সে অনুযায়ী তফসিল ঘোষণার জন্য বিবেচ্য বিষয়ের মধ্যে রয়েছেÑ ভোটার তালিকা, ভোটের জন্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি সংগ্রহ, ধর্মীয় উৎসব, পাবলিক পরীক্ষা, আবহাওয়া, কেন্দ্র চূড়ান্তকরণ ও সংস্কার, নির্বাচনী কর্মকর্তা নির্বাচন ও প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন বিষয়। তফসিল ঘোষণার প্রাক-প্রস্তুতি হিসেবে ন্যূনতম ৪৫ পঞ্জিকা দিবস প্রয়োজন হয়।
জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার (ইসি) আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, “আমাদের (ইসি) দেওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই স্থানীয় সরকারমন্ত্রী নির্বাচনের বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন। কমিশন সরকারকে জানিয়েছে, দেড় মাসের মতো সময় দিলেই নির্বাচন করা সম্ভব হবে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করেই ইসি স্থানীয় সরকার নির্বাচন করে থাকে। সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচনের পর ইসির মনোযোগ এখন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দিকে।’ কোন স্তরের নির্বাচন প্রথমে অনুষ্ঠিত হতে পারে, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘নিচের দিক থেকে অর্থাৎ ইউনিয়ন অথবা পৌরসভার নির্বাচন দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে। অবশ্য ইউনিয়ন ও পৌরসভা নির্বাচন একসঙ্গেও করা হতে পারে। কমিশনের সভায় সম্ভাব্য সব দিক নিয়েই আলোচনা হবে।”
ইসির একটি সূত্র জানাচ্ছে, ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বর্তমানে দেশের বাইরে আছেন। আগামী ৮ মে তিনি দেশে ফেরার স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে ইসির পক্ষ থেকে যোগাযোগ শুরু হবে। তখন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনার অগ্রগতিও দৃশ্যমান হবে। বর্তমানে সবকিছুই অনানুষ্ঠানিক পর্যায়ে রয়েছে।
কমিশন সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে দেশের মোট ৪ হাজার ৫৮১টি ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে এ বছর নির্বাচন উপযোগী হবে ৩ হাজার ৭৫৫টি। আগামী বছরে হবে আরও ৩৪৯টি। এ ছাড়া ভেঙে দেওয়া ৩৩০ পৌরসভা, ৪৯৫ উপজেলা, ১২টি সিটি করপোরেশন ও ৬১ জেলা পরিষদ এখনই নির্বাচন উপযোগী অবস্থায় রয়েছে। এই অবস্থায় গত ৯ এপ্রিল সংসদে ‘স্থানীয় সরকার ইউনিয়ন পরিষদ সংশোধন বিল, ২০২৬’, ‘উপজেলা পরিষদ সংশোধন বিল, ২০২৬’, ‘জেলা পরিষদ সংশোধন বিল, ২০২৬’, ‘স্থানীয় সরকার পৌরসভা সংশোধন বিল, ২০২৬’ এবং ‘স্থানীয় সরকার সিটি করপোরেশন সংশোধন বিল, ২০২৬’ কণ্ঠভোটে পাস হয়। এরপর থেকেই প্রাথমিক প্রস্তুতির অংশ হিসেবে কাজ শুরু করেছে ইসি।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, “স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে আমরা আমাদের মতো করে প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছি। সংশোধিত আইনের আলোকে বিধি পরিবর্তন হবে। সেগুলো নিয়ে ইসির সংশ্লিষ্ট শাখায় কাজ চলছে। সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে যথাসম্ভব সময়ে নির্বাচনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। পরবর্তী কমিশন সভায় এ নিয়ে আলোচনা হতে পারে।”