বিশ্বে গণপরিবহন ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা হয় ১৮৮১ সালে জার্মানিতেÑ ইলেকট্রিক রেল চালু হওয়ার মধ্যে দিয়ে। এরপর এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে উন্নত দেশগুলো এই প্রযুক্তিকে শুধু গ্রহণই করেনি, বরং তা আধুনিক করে ও সম্প্রসারণের মাধ্যমে পরিবহন ব্যবস্থার মেরুদণ্ডে পরিণত করেছে। দক্ষিণ এশিয়ায়ও এই অগ্রযাত্রা থেমে নেই। ১৯২৫ সালে ভারতের মুম্বাইয়ে ইলেকট্রিক ট্রেন চালু হওয়ায় উপমহাদেশে নতুন যুগের সূচনা হয়। অথচ এক শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশে এই প্রযুক্তি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এখন সেই বিলম্বিত যাত্রা শুরু হতে চলেছে নতুন এক প্রকল্পের মাধ্যমে। কিন্তু সেটির ব্যয়, বাস্তবায়নের সময়কাল ও বাস্তবতা নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন।
বাংলাদেশ রেলওয়ে নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর রুটে বৈদ্যুতিক ট্রেন চালুর লক্ষ্যে ৪ হাজার ২৮৩ কোটি টাকার একটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব করেছে। পরিকল্পনা কমিশনে জমা দেওয়া এই প্রস্তাবে ৫২ দশমিক ৩২ কিলোমিটার রেলপথে বিদ্যুতায়নের পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে। এতে ১৮৬ ট্র্যাক-কিলোমিটার জুড়ে ওভারহেড ক্যাটেনারি সিস্টেম স্থাপন, ১৬টি ইলেকট্রিক মাল্টিপল ইউনিট ট্রেন সংগ্রহ, জমি অধিগ্রহণ এবং পাঁচ বছরের রক্ষণাবেক্ষণ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। প্রকল্প ব্যয়ের বড় একটি অংশ বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরশীল, যেখানে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংক প্রায় ২ হাজার ৮৩১ কোটি টাকা ঋণ দেবে এবং বাকি অর্থ জোগান দেবে সরকার।
Manual4 Ad Code
তবে প্রকল্পটিকে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও বাস্তবতা ততটা সরল নয়। পরিকল্পনা কমিশনের মূল্যায়ন বৈঠকেই জমি অধিগ্রহণ কমানো এবং বাস্তবায়ন সময়সীমা হ্রাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে প্রকল্পের সময়সীমা ধরা হয়েছে ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩৬ সালের জুন পর্যন্তÑ যা বিশেষজ্ঞদের বিবেচনায়, একটি অপেক্ষাকৃত ছোট রুটের জন্য দীর্ঘ সময়। এর মধ্যে আবার নির্মাণত্রুটি, দায়বদ্ধতা এবং রক্ষণাবেক্ষণ মিলিয়ে সময় বিভাজন এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, যা প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি নিয়ে সংশয় তৈরি করছে।
Manual6 Ad Code
প্রকল্পটির পরিকল্পনায় ঘাটতির ইঙ্গিত পাওয়া যায় এর পূর্ব ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে। ২০১৬ সালে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে ইলেকট্রিক ট্রেন চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়। কিন্তু দীর্ঘ সময় তা কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ ছিল। সম্ভাব্যতা সমীক্ষা শুরু করতেই লেগে যায় আরও পাঁচ বছর। সেই সমীক্ষা শেষ হওয়ার পরও প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে একাধিক অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা সামনে আসে, যার মধ্যে সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো বিদ্যমান রেলপথের অসম্পূর্ণ উন্নয়ন।
নারায়ণগঞ্জ-জয়দেবপুর রুটে ইলেকট্রিক ট্রেন চালু করতে হলে আগে ঢাকা-টঙ্গী এবং টঙ্গী-জয়দেবপুর অংশে চলমান ডাবল লাইন নির্মাণ প্রকল্প শেষ করা অপরিহার্য। অথচ সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের অগ্রগতি এখনও অর্ধেকেরও কম এবং তা শেষ হওয়ার নির্ধারিত সময় ২০২৭ সালের জুন। অর্থাৎ নতুন প্রকল্পের বাস্তব কাজ শুরু হওয়ার আগেই এটি অন্য একটি অসমাপ্ত প্রকল্পের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। ফলে বাস্তবায়নের সময়সীমা আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার ঝুঁকি স্পষ্ট।
প্রকল্পের ব্যয় কাঠামো বিশ্লেষণ করলে আরও কিছু প্রশ্ন উঠে আসে। ১৬টি ইএমইউ ট্রেন কেনার জন্য প্রায় ১ হাজার ৯৫৭ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা মোট ব্যয়ের বড় অংশ। গড়ে প্রতিটি রেল কিনতে খরচ হবে ১২২ কোটি ৩১ লাখ টাকা। একই সঙ্গে একটি ইএমইউ কর্মশালা নির্মাণে ৬৮৭ কোটি টাকা এবং বিদ্যুতায়ন অবকাঠামো নির্মাণে ৮৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ধরনের ব্যয় কাঠামোতে প্রযুক্তি হস্তান্তর, স্থানীয় সক্ষমতা উন্নয়ন বা দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ দক্ষতা কতটা অর্জিত হবে, তা নিয়ে পরিষ্কার কোনো ব্যাখ্যা নেই।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও প্রকল্পটি প্রশ্নের মুখে। প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ইলেকট্রিক ট্রেন চালু হলে পরিচালন ব্যয় ৩৫ শতাংশ কমবে এবং যাত্রা সময় ১৮ শতাংশ কমবে। পাশাপাশি আয় ব্যয়ের তুলনায় অনেক বেশি হবে বলে দাবি করা হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে বার্ষিক আয় ৮৪৯ কোটি টাকা এবং ব্যয় ৭৯ কোটি টাকা ধরা হয়েছে, যা অত্যন্ত আশাবাদী হিসাব বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা। কারণ রেল খাতে দীর্ঘদিন ধরেই আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য রক্ষা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
Manual7 Ad Code
আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো রেলপথের প্রযুক্তিগত বৈচিত্র্য। দেশের বিভিন্ন অংশে এখনও মিটার গেজ ও ব্রড গেজের মিশ্র ব্যবহার বিদ্যমান। বিশেষ করে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো এখনও ব্রড গেজে রূপান্তরিত হয়নি। ফলে পুরো নেটওয়ার্কে ইলেকট্রিক ট্রেন চালু করতে গেলে বড় ধরনের অবকাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন হবে, যা এই প্রকল্পের আওতার বাইরে।
এ ছাড়া বিদ্যুৎ সরবরাহের স্থিতিশীলতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ইলেকট্রিক ট্রেন পরিচালনার জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ অপরিহার্য হলেও দেশে এখনও লোডশেডিং একটি বাস্তবতা। অতীতে পরিকল্পনায় ডিজেল ব্যাকআপ রাখার কথা বলা হলেও বর্তমান প্রস্তাবে সেই বিষয়টি কতটা কার্যকরভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়।
রেলওয়ে কর্মকর্তারা বলছেন, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-গাজীপুর অঞ্চলে যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় ধরনের উন্নতি হবে এবং প্রতিদিন প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজার যাত্রী পরিবহন সম্ভব হবে। একই সঙ্গে দূষণ কমানো এবং জ্বালানি ব্যয় হ্রাসের কথাও উল্লেখ করা হচ্ছে। তবে এসব সম্ভাবনার বাস্তব রূপ পেতে হলে প্রকল্প বাস্তবায়নের দক্ষতা, সময়মতো কাজ শেষ করা এবং ব্যয় নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা জরুরি, যা অতীত অভিজ্ঞতায় বারবার প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
বাংলাদেশে বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রে ব্যয় বৃদ্ধি, সময়সীমা লঙ্ঘন এবং কাঙ্ক্ষিত সুফল না পাওয়ার যে প্রবণতা রয়েছে, এই প্রকল্পও সেই চক্র থেকে বের হতে পারবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। প্রযুক্তিগত অগ্রগতির প্রতীক হিসেবে ইলেকট্রিক রেলের যাত্রা যতটা আকর্ষণীয়, বাস্তবায়নের জটিলতা ও সীমাবদ্ধতা ততটাই গভীর।