প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

১৪ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৩১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২৮শে জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি

সৌরবিদ্যুতে হঠাৎ বাড়াবাড়ি

editor
প্রকাশিত মে ১১, ২০২৬, ১০:২৩ পূর্বাহ্ণ
সৌরবিদ্যুতে হঠাৎ বাড়াবাড়ি

Manual1 Ad Code

 

প্রজন্ম ডেস্ক:

Manual6 Ad Code

বাংলাদেশে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার শুরুতে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকট দেখা দেয়। সাধারণ মানুষ বিদ্যুতের আসা-যাওয়ার খেলায় নাজেহাল হয়ে ওঠে। দেশে বিদ্যুৎকেন্দ্র থাকলেও জ্বালানির অভাবে উৎপাদন ব্যাহত হয়। সরকারের তরফ থেকে তড়িঘড়ি ঘোষণা আসে আগামী চার বছরে নতুন করে ১০ হাজার মেগাওয়াট বা ১০ গিগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই পরিমাণ সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের স্বপ্ন আর বাস্তবতার মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভবিষ্যৎ জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় অবশ্যই সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করতে হবে। কিন্তু এখন যে কেন্দ্রগুলো রয়েছে তার সঙ্গে সমন্বয় করে পরিকল্পনা সাজাতে হবে। এমনটি না করা হলে জীবাশ্ম জ্বালানির বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের দাম যোগ হয়ে বিদ্যুৎ খাতে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকির চাপ সৃষ্টি হবে। এমনকি আমাদের বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থা আদৌ এই বিদ্যুতের প্রবাহ নিশ্চিত করতে পারবে কি না পরিকল্পনায় সেই বিবেচনাও করা হয়নি।

পাওয়ার সিস্টেম মাস্টার প্ল্যান ২০১০ অনুযায়ী দেশে ৭ ভাগ জিডিপি প্রবৃদ্ধি বিবেচনায় নিয়ে বিদ্যুতের চাহিদা নির্ধারণ করা হয়। তবে করোনা মহামারী এবং নানা কারণে ৭ ভাগ জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়নি। কিন্তু বিদ্যুৎ বিভাগ ৭ ভাগ প্রবৃদ্ধি ধরে কেন্দ্র নির্মাণ করায় দেশে চাহিদার প্রায় দ্বিগুণ ক্ষমতার কেন্দ্র নির্মাণ হয়েছে। একই সঙ্গে বিগত আওয়ামী লীগ সরকার রাজনৈতিক এবং প্রতিবেশী দেশের অনেক কোম্পানিকে পাওয়ার সিস্টেম মাস্টার প্ল্যানের বাইরে সুযোগ দিতে গিয়ে কিছু বড় কেন্দ্র নির্মাণের অনুমোদন দিয়েছে। এরপর পাওয়ার সিস্টেম মাস্টার প্ল্যান ২০১৬ এবং সমন্বিত জ্বালানি এবং বিদ্যুতের মহাপরিকল্পনা ২০২৩ প্রণয়ন করে। সবশেষ পরিকল্পনায় দেখা যায় সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদনে নেট জিরো পরিকল্পনা ২০৫০ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াতে কার্বন নির্গমনের হার শূন্যে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা করে। সেই পরিকল্পনায় দেখা যায় ১৬ গিগাওয়াটের সোলার পার্ক স্থাপনের পাশাপাশি সোলার সেচ প্রকল্প থেকে ৬ গিগাওয়াট এবং সোলার রুফটপ থেকে আরও ১২ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়ার কথা। যদিও এই পরিকল্পনা কতটা বাস্তবসম্মত তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সন্দেহ রয়েছে। এর মধ্যে সম্প্রতি নতুন সরকার ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনার ঘোষণা দিয়েছে। এমনিতেই দেশে অন্তত ১২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র বসে থাকে। এর সঙ্গে আরও ১০ হাজার মেগাওয়াট কেন্দ্র যোগ হলে অলস কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়বে।

Manual4 Ad Code

 

প্রতি এক মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের নির্মাণ ব্যয় এখন ৯ কোটি টাকার মতো। সেই হিসাবে ১০ হাজার মেগাওয়াটের নির্মাণ ব্যয় দাঁড়াবে ৯০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সোলার প্যানেল, ইনভার্টার, ক্যাবল, স্ট্রাকচার, বিদ্যুতের গ্রিড লাইনের যন্ত্রাংশ এবং সাবস্টেশন বাবদ অন্তত ৮০ ভাগ খরচ হয়। যার পুরোটাই বৈদেশিক মুদ্রায় করতে হয়। সেই হিসাবে ৭২ হাজার কোটি টাকার ব্যয়ের সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা প্রয়োজন হবে। এখনকার বাজারদর প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ধরে হিসাব করলে ৫৮৫ কোটি ডলার বা ৫ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন হবে। চার বছরের হিসাবে প্রতি বছর বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়াবে এক দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলার। দেশি-বিদেশি মুদ্রা মিলিয়ে প্রতি বছর কেবল সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে ২২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে।

Manual6 Ad Code

 

বাংলাদেশের সরকারি-বেসরকারি খাত মিলিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে এত বিপুল বিনিয়োগের কোনো রেকর্ড অতীতে নেই। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আহ্বান জানানো হলে সৌরবিদ্যুতের দাম পরিশোধ করতে হবে ডলারে। সে ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ পাওয়া গেলেও দর পরিশোধে ডলারের বাজার অস্থির হবে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের সাবেক সদস্য মিজানুর রহমান বলেন, ২০০৮ সালে যখন নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি করা হয় তখন ৩ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু প্রায় ১৮ বছরে সরকার এক হাজার মেগাওয়াট গ্রিড-সংযুক্ত সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করতে পেরেছে। কাজেই যারা ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা করছেন তারাও বিষয়টি বিশ্বাস করে করছেন বলে মনে হয় না। তবে এটি রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে খুব জুতসই বলে মনে করেন তিনি।

বিপুল জমির সংস্থানে বাড়তে পারে খাদ্য ঘাটতি

প্রতি এক মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য দুই দশমিক ৫ একর জমি প্রয়োজন হয়। সেই হিসাবে ১০ হাজার মেগাওয়াটের জন্য ২৫ হাজার একর বা ৭৫ হাজার বিঘা জমি প্রয়োজন হবে। বাংলাদেশে সাধারণ এক বিঘা জমিতে ২৫ থেকে ৩০ মণ ধান উৎপাদন হয়। সেই হিসাবে এই জমিতে বছরে একবার ধান উৎপাদন হলেও ১৮ লাখ ৭৫ হাজার মণ থেকে ২২ লাখ ৫০ হাজার মণ ধানের উৎপাদন সম্ভব। বাংলাদেশে জমি সীমিত হওয়ায় সাধারণত কোনো জমিই পড়ে থাকে না। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকারীরা কৃষিজমিকে অবৈধ উপায়ে অকৃষি দেখিয়ে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প পাস করিয়ে নেয়। সৌরবিদ্যুতের তুলনায় ফসল উৎপাদন খুব একটা লাভজনক না হওয়ায় উদ্যোক্তারা এসব জমি অনাবাদি ফেলে রাখে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে কৃষিবিদ ড. রুস্তম আলী বলেন, সৌরবিদ্যুতের নিচের জমিকে কোনো অবস্থায় অনাবাদি রাখা যাবে না। বিদ্যুৎকেন্দ্রের উদ্যোক্তাকে বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে কৃষি আবাদের পরিকল্পনাও দিতে হবে। এখন আমাদের দেশের মতো কোথাও সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের নিচের জমি ফেলে রাখা হয় না। সরকারকে বিষয়টিতে নজর দেওয়ার অনুরোধ জানান তিনি।

আগের কেন্দ্রের সঙ্গে নতুন কেন্দ্রের সমন্বয় করা কঠিন হবে

বাংলাদেশে সরকারি হিসাবে এখন প্রায় ১৭ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের পিক ডিমান্ড রয়েছে। যা সাধারণত রাতের বেলায় হয়ে থাকে। দিনে সরকারি হিসাবে এই চাহিদা ১৪ থেকে ১৫ হাজার মেগাওয়াট। গ্রীষ্মের চাহিদা শীতে দিনের বেলা কমে ১০ থেকে ১২ হাজার মেগাওয়াটে নেম আসে। সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে যদি স্টোরেজ বা ব্যাটারি সংযোজন না করা হয় তাহলে দিনের বেলায় কোনো এক সময়ে পুরো ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে। তখন সিস্টেমে থাকা অন্য বিদ্যুৎকেন্দ্রের কী হবে এমন প্রশ্নও রাখছেন কেউ কেউ। চাইলেই বেজ লোড বা বড় আকারের বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রাখা যায় না। আর একবার কোনো বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হলে চালু হতে এক থেকে তিন দিন সময় প্রয়োজন হয়। অন্যদিকে কারিগরি বিষয় এড়িয়ে সরকার যদি বন্ধ রাখে তাহলেও এসব কেন্দ্রকে ক্যাপাসিটি পেমেন্ট দিতে হবে। একই সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদনের জন্য জীবাশ্ম জ্বালানির কেন্দ্রগুলো কম বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। সক্ষমতার পূর্ণ মাত্রা ব্যবহার করতে না পারায় বিদ্যুতের ইউনিট প্রতি উৎপাদন খরচ বাড়বে। অর্থাৎ একদিকে সরকার সৌরবিদ্যুৎ কিনবে অন্যদিকে অলস বসে থাকা কেন্দ্রকে বিল পরিশোধ করবে। জানতে চাইলে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, সরকার যদি তেলচালিত সব বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি বাতিল না করে এসব সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করে তাহলে বিপাকে পড়তে হবে। একই সঙ্গে সরকার কী দামে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করছে, তাও দেখতে হবে।

গ্রিডের স্থিতিশীলতা

সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র সাধারণত বাংলাদেশের আবহাওয়াতে গড়ে সাড়ে চার ঘণ্টা থেকে পাঁচ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারে। কোনো কারণে আকাশ মেঘলা হলে যেমন উৎপাদন কমে তেমনি শীতের দিনেও উৎপাদন কমে যায়। এ জন্য গ্রিডের স্থিতিশীলতার জন্য জীবাশ্ম জ্বালানির অন্য কেন্দ্র প্রস্তুত রাখতে হয়। কোনো কারণে একসঙ্গে মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের ১০ ভাগ একই সময়ে গ্রিডে সরবরাহ বন্ধ হলে লাইন ট্রিপ করে ব্ল্যাকআউটের মতো ঘটনা ঘটতে পারে। সঙ্গত কারণে দিনের কোনো সময় মোট চাহিদার ৭০ থেকে ৮০ ভাগ যদি সৌরবিদ্যুৎ থেকে আসে, সে ক্ষেত্রে হঠাৎ নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেলে গ্রিডের স্থিতিশীলতা নষ্ট হতে পারে। জানতে চাইলে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের সাবেক সদস্য মিজানুর রহমান বলেন, শীতের সময় আমাদের দিনের পিক ডিমান্ড কত থাকে সেটার ওপর নির্ভর করে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করতে হবে। তিনি বলেন, আমার হিসাবে ২০৩০ সালের মধ্যে সর্বোচ্চ ৪ থেকে ৫ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র গ্রিড নিতে পারবে। এর বাইরে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করলে স্টোরেজ ক্যাপাসিটি বা ব্যাটারি সংযোজন করতে হবে। যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তিনি বলেন, অস্ট্রেলিয়া মেলবোর্নে ১২ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করেছে। কিন্তু শীতের সময় দিনের বেলায় তাদের পিক ডিমান্ড কমে হয় দুই হাজার মেগাওয়াট। এতে ১০ হাজার মেগাওয়াটের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ নিয়ে তারা বিপাকে পড়েছে। একই সমস্যা পাকিস্তানেরও রয়েছে। তিনি বলেন, আমাদের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র আসছে, তাই চাইলেই আমরা সেই কেন্দ্র বন্ধ করতে পারব না। একই সঙ্গে আমাদের আরও বড় বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে সেগুলোও বিবেচনায় নিতে হবে।

Manual6 Ad Code

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
১০১১১৩
১৫১৬১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭
৩০  

Manual1 Ad Code
Manual3 Ad Code