বাজেটে বাড়ছে ভর্তুকি-প্রণোদনা ও সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর আওতা
বাজেটে বাড়ছে ভর্তুকি-প্রণোদনা ও সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর আওতা
editor
প্রকাশিত মে ৯, ২০২৬, ০৮:৪১ পূর্বাহ্ণ
Manual6 Ad Code
প্রজন্ম ডেস্ক:
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবে দেশের অর্থনীতির সংকট বেড়ে মহাসংকটে রূপ নিয়েছে। এ পরিস্থিতি কবে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে তা নিয়ে রয়েছে অনিশ্চয়তা। আগামী অর্থবছরে সরকারের আয় বাড়ানো কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ভর্তুকি ও প্রণোদনা কমানোর চাপ দিলেও সরকারের পক্ষে তা মেনে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। আগামী বাজেটে বাড়তি খরচের চাপ কাঁধে নিয়েই বাড়াতে হচ্ছে ভর্তুকি ও প্রণোদনা। একই সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর আওতা বাড়ানোর চাপও নিতে হচ্ছে সরকারকে।
Manual2 Ad Code
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুল মজিদ বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক অস্থিরতার নেতিবাচক প্রভাবে দেশের অর্থনীতি এখন মহাসংকটে। অন্যভাবে বললে, অর্থনীতিতে কঠিন পরিস্থিতি চলছে। রাজস্ব ঘাটতি বেড়ে এক লাখ কোটি টাকা হয়েছে। ভূ-রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা কবে আসবে তা কেউ জানেন না। তাই দেশের অর্থনীতিতে কবে গতি ফিরবে তাও অনিশ্চিত। আগামী বাজেটে আয়-ব্যয়ে ভারসাম্য আনতে কাগজেকলমে হিসাব মিলিয়ে যে পরিকল্পনা নেওয়া হবে বর্তমান পরিস্থিতির উন্নয়ন না হলে তার বেশির ভাগই বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না। সরকারের আয় বাড়ানো কঠিন হবে। ভর্তুকি ও প্রণোদনা বাড়ানোর মতো পদক্ষেপ নিলে সরকারের জন্য তা বড় ধরনের চাপ হয়ে যাবে। কিন্তু অর্থনীতি টিকিয়ে রাখার স্বার্থে সরকারকে এই চাপ নিতে হবে। চাপ না নিলে আইএমএফ অসন্তুষ্ট হতে পারে। ঋণের কিস্তি পাওয়া পিছিয়ে যেতে পারে। তারপরও সরকারকে ভর্তুকি ও প্রণোদনা বাড়াতে হবে। একইভাবে সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর আওতাও বাড়াতে হবে। না হলে অল্প আয়ের মানুষের কষ্ট বাড়বে।
সিপিডির মোস্তাফিজুর রহমানের বক্তব্য
একই মত জানিয়ে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, দেশের অর্থনীতির গতিধারা মূল্যায়ন করতে বেশ কিছু সূচক থাকে। এসব সূচক ভালো খবর দিচ্ছে না। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর বাংলাদেশের অর্থনীতি নির্ভরশীল। বিশ্ব রাজনীতি কোন পথে যাবে তা এখনই বলা যাচ্ছে না। বাজেট দিতে হলে অবশ্যই হিসাব মিলিয়ে দিতে হবে। তবে এসব হিসাব যে শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হবে তা বলা যাবে না। ভর্তুকি আর প্রণোদনা বাড়াতে হলেও তা কোন খাতে কতটা দেওয়া হবে তা খুব হিসাব করে দিতে হবে। সরকারের আয় থাকলে তো এত চিন্তার কিছু ছিল না। আবার অল্প আয়ের মানুষকে ভালো রাখতে হলে সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর আওতা বাড়াতেই হচ্ছে। এ খাতে খরচের চাপ না নিয়ে সরকারের সামনে অন্য কোনো উপায় নেই।
চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসের (জুলাই-এপ্রিল) হিসাবে এখনো রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। এ সময়ে ৩ হাজার ৯৪০ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২ শতাংশ কম। দেশে প্রকৃত বিনিয়োগ বাড়ছে এমন সুখবর নেই।
বিবিএসের তথ্যানুযায়ী, চলতি অর্থবছরে টানা চার মাস মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির পর মার্চে মূল্যস্ফীতি কমে এপ্রিলে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। অর্থাৎ গত ছয় মাসের মধ্যে পাঁচ মাসেই মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের বেশি। গত এপ্রিলে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩৯ শতাংশ।
প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি নেই। চলতি অর্থ বছরের গত ১০ মাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায়ের ঘাটতি এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে এরই মধ্যে প্রবাসী শ্রমিকদের অনেকে ফিরে এসেছেন। কবে তারা আবার কাজে ফিরবেন তা এখনো জানা যায়নি।
এপ্রিলে প্রবাসী আয় বাড়লেও অর্থনীতির বিশ্লেষকরা বলছেন বেশির ভাগ শ্রমিক রাজনৈতিক অস্থিরতা নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন, তাই যার যা আছে তা দেশে ফিরিয়ে আনছেন বলে দেশে আসা অর্থের পরিমাণ বেড়েছে। এই অর্থ আসা মানে সুখবর না। কাজ না থাকলে প্রবাসী আয়ে ধস নামার আশঙ্কা রয়েছে। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির গতি ৬ শতাংশের ঘরে আটকে আছে।
দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন বলেন, ‘বর্তমানে দেশের শিল্প খাত কোনো রকমে টিকে আছে। ব্যবসা-বাণিজ্য ভালো যাচ্ছে না। ভর্তুকি ও প্রণোদনা না দিলে আমাদের পক্ষে টিকে থাকা কঠিন হবে।’
আইএমএফের ঋণের কিস্তি পেতে
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) থেকে ঋণের কিস্তি পেতে হলে বর্তমান সরকারকে যেসব শর্ত মানতে হবে তার মধ্যে অন্যতম আগামী বাজেটে ভর্তুকি ও প্রণোদনা কমাতে হবে। সরকার পড়ছে বেকায়দায়। অর্থনীতির এই মহাসংকটে ব্যবসা-বাণিজ্য শিল্প খাত টিকিয়ে রাখতে হলে ভর্তুকি ও প্রণোদনা কমানো সম্ভব হবে না। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার ফলে উদ্ভূত বৈদেশিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সার খাতে ভর্তুকি বাবদ অতিরিক্ত বরাদ্দের প্রয়োজন রয়েছে।
আগামী বাজেটে ভর্তুকি ও প্রণোদনার জন্য ১ লাখ ৫ হাজার ১২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হতে পারে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে এ বরাদ্দের পরিমাণ ১ লাখ ৪৫৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ আগামী অর্থবছরে ভর্তুকি ও প্রণোদনার জন্য ৪ হাজার ৬৭০ কোটি টাকা বেশি বরাদ্দ দেওয়ার হিসাব কষা হচ্ছে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ খাতে ৩৭ হাজার কোটি টাকা, গ্যাস খাতে ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং সারে ২৭ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি বাবদ বরাদ্দ রাখা হতে পারে।
আসন্ন অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিধি, উপকারভোগীর সংখ্যা ও ভাতার পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে বয়স্ক, বিধবা, প্রতিবন্ধীসহ ১৫টি কর্মসূচির আওতায় প্রায় সাড়ে ১১ লাখ নতুন সুবিধাভোগী যুক্ত হবে। ভাতা ৫০ টাকা থেকে শুরু করে বিভিন্ন হারে বাড়ানো হবে।
Manual1 Ad Code
সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী
বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ ও কৃষক কার্ডে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া বিদ্যমান কর্মসূচির আওতায় বৈষম্য কমাতে কর্মসূচি সম্প্রসারণ, নতুন উপকারভোগী অন্তর্ভুক্তি এবং ভাতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা করছে সরকার। পাশাপাশি খাদ্য সহায়তা কর্মসূচিও বাড়ানো হবে। এই কর্মসূচির আওতায় সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি। চলমান বৈশ্বিক সংকটের কারণে মূল্যস্ফীতি বাড়লেও সরকার খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় চালের দাম না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
Manual5 Ad Code
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীর বক্তব্য
Manual5 Ad Code
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিগত দুই সরকারের স্থবির অর্থনীতি উত্তরাধিকার সূত্রে বর্তমান সরকারের কাঁধে পড়েছে। অর্থনীতি কঠিন সময় পার করছে। দায়িত্ব গ্রহণের দুই মাস না যেতে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ধাক্কা পড়েছে দেশের অর্থনীতিতে। এখান থেকে অর্থনীতিকে টেনে তুলতে দুই বছরের বেশি সময় লাগবে। মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিরতা না কমলে অর্থনীতিতে ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হবে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে জ্বালানিসংকট, প্রবাসী শ্রমিকদের ফিরে আসাসহ বিভিন্ন ধরনের সমস্যা নতুন করে অর্থনীতিতে যোগ হয়েছে। সরকার প্রচণ্ড চাপেও আগামী বাজেটে ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা ও সাধারণ মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করছে।