জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) প্রায় ৮৮ হাজার আয়কর রিটার্ন অডিট বা নিরীক্ষার জন্য নির্বাচন করেছে এবং এ নিয়ে বর্তমানে মাঠপর্যায়ে ব্যাপক তৎপরতা চলছে।
এসব রিটার্নকারীর বেশির ভাগই অল্প আয়ের নিয়মিত করদাতা। তাদের অনেকে এরই মধ্যে আয়-ব্যয়ের কাগজপত্র নিয়ে তদন্ত কর্মকর্তার কাছে ছুটছেন। এ কাগজ আছে তো, সেই কাগজ লাগবে। করদাতাদের অনেকে হয়রানির অভিযোগ করে বলেছেন, নিয়মিত কর দিয়েও এখন অডিটে পড়েছি।
Manual3 Ad Code
অন্যদিকে বড়মাপের সম্পদশালী করদাতাদের কাছে এনবিআরের বকেয়া রাজস্বের পরিমাণ এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। বছরের পর বছর পার হলেও বকেয়া আদায়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই।
Manual5 Ad Code
রাজস্ব খাতের বিশ্লেষকরা বলেছেন, ছোটদের চেয়ে বড় করদাতাদের দিকে এনবিআরের নজর দেওয়া প্রয়োজন। অল্প আয়ের করদাতাদের অডিটে ফেলে হয়রানি করা হলে নতুন করে আর কেউ করের আওতায় আসতে উৎসাহিত হবে না।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুল মজিদ বলেন, ১০০ জন অল্প আয়ের করদাতার কাছ থেকে যে রাজস্ব আদায় হয়, সুপারট্যাক্স গ্রুপের (বড় মাপের) একজন করদাতার কাছ থেকে তার চেয়ে বেশি আদায় হয়। বকেয়া রাজস্বের প্রায় সবই সম্পদশালীদের কাছে পাওনা। বছরের পর বছর এসব বকেয়া পড়ে আছে। এনবিআর এ কাজে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখাতে পারছে না। উল্টো অল্প আয়ের করদাতাদের অডিটে ফেলে হয়রানি করছে।
তিনি বলেন, চলতি অর্থবছরের ১১ মাস চলছে। বকেয়া এক লাখ কোটি টাকার সঙ্গে চলতি অর্থবছরের রাজস্ব ঘাটতি আরও এক লাখ কোটি টাকা যোগ হয়েছে। চলতি অর্থবছরের শেষ সময়ে এনবিআরের উচিত বড় মাপের করদাতাদের কাছ থেকে বেশি পরিমাণের কর আদায়ে মনোযোগী হওয়া। বকেয়া আদায় হলে রাজস্ব ঘাটতি থাকবে না।
রাজস্ব খাতের এই বিশ্লেষক বলেন, অল্প আয়ের করদাতাদের বেশির ভাগই চাকরিজীবী। এরা বেতন থেকে হিসাব করে কর পরিশোধ করে থাকেন। আর যত কৌশল করে ফাঁকি দেন বড় মাপের করদাতারা। এনবিআরের উচিত ছোট করদাতাদের পিছনে সময় না দিয়ে বড় করদাতাদের দিকে আদায়ে জোর বাড়ানো।
পরিসংখ্যান বিভাগের তথ্য
এনবিআরের পরিসংখ্যান বিভাগের তথ্যানুসারে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) শুল্ক ও কর আদায়ে ঘাটতি ৯৭ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা। এপ্রিলে ঘাটতি বেড়ে এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এ সময়ে সবচেয়ে বেশি ঘাটতি হয়েছে আয়কর খাতে, ৪০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। গত অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব ঘাটতি ছিল ৯২ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা। এবারে চলতি অর্থবছরের ৯ মাসেই তা ছাড়িয়ে গেল।
Manual6 Ad Code
এনবিআরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘বকেয়া রাজস্বের ৯০ শতাংশই ধনী ব্যক্তি ও তাদের প্রতিষ্ঠানের কাছে পাওনা। এদের বেশির ভাগই প্রভাবশালী। বারবার তাগিদ দেওয়া হলেও প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন অজুহাতে বা কৌশলে বকেয়া পরিশোধ করছেন না। এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ৫৫ শতাংশই একটি অর্থও কর হিসেবে জমা না দিয়ে মামলা করেন। এতে বকেয়া রাজস্ব আদায় প্রক্রিয়া বছরের পর বছর আটকে যায়। ৪০ থেকে ৪২ শতাংশ পাওনার অল্প কিছু দিয়ে বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে বাকিটা পরিশোধে বছরের পর বছর সময় পার করেন। বাকি ৩ থেকে ৫ শতাংশ দিচ্ছি-দেব বলে সময় পার করতে থাকেন।
এনবিআরের সাবেক সদস্য আমিনুল করিম বলেন, বড় মাপের করদাতাদের কাছ থেকে বকেয়া ও নিয়মিত দুভাবেই আদায়ে আটঘাট বেঁধে এনবিআরকে নামতে হবে। বড় মাপের করদাতারা নিয়মিত কর দেন না বলেই বকেয়া বাড়তে থাকে। এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বকেয়া ও নিয়মিত আদায়ে গেলে সরকারের ওপরের মহলের লোকজনকে দিয়ে হুমকি-ধমকি দেয়। অনেক সময় বদলিও করে দেয়।
তিনি আরও বলেন, অল্প আয়ের করদাতারা সাধারণত নিয়মিত করদাতা। এসব করদাতাদের অডিটে ফেলে বা বিভিন্ন হিসাবপত্র নিয়ে জটিলতা তৈরি করা হলে তারা ভোগান্তিতে পড়বেন। এসব দেখলে অন্যরা কর প্রদানে নিরুৎসাহিত হবেন। বড় মাপের করদাতাদের ৩৩ হাজার রাজস্ব মামলা নিষ্পত্তি হয়নি। এতে জড়িত রাজস্ব প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা। এসব বিষয়ে এনবিআরের নজর নেই। মূল্যস্ফীতির সঙ্গে মিলিয়ে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো হয় না।
এনবিআর সূত্র জানায়, ২০২৩-২৪ করবর্ষের আয়কর রিটার্ন থেকে এ অডিট করা হচ্ছে। প্রথম ধাপে ১৫ হাজার ৪৯৪ রিটার্ন এবং পরের ধাপে ৭২ হাজার ৩৪১ রিটার্ন–এভাবে মোট ৮৭ হাজার ৮৩৫ করদাতার রিটার্ন অডিটের জন্য নির্বাচন করা হয়েছে। প্রত্যেক সার্কেল থেকে সর্বোচ্চ ২০০ এবং সর্বনিম্ন ২০ জন করদাতার রিটার্ন অডিটের জন্য নেওয়া হয়েছে। স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় অডিটের জন্য নির্বাচিত ইটিআইএন নম্বরের তালিকা এনবিআরের ওয়েবসাইট: nbr.gov.bd প্রকাশ করা হয়েছে।
আইনি ব্যবস্থা নেবে এনবিআর
চলতি করবর্ষে যেসব করদাতা রিটার্ন জমা দেননি তাদের বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নেবে এনবিআর। আয় নেই এমন সব করদাতার শূন্য কর হলেও রিটার্ন দিতে হবে বলে এনবিআর আইন করেছে। এ ক্ষেত্রে শূন্য কর কেন হয়েছে তার তথ্যও এনবিআর খতিয়ে দেখছে। রিটার্ন জমা দেননি বা অডিটের জন্য নির্বাচন করা হয়েছে– এমন সব ব্যক্তির তালিকা তৈরি করে ধাপে ধাপে নোটিশ পাঠানো শুরু করেছে।
রিটার্ন জমা না দিলে এনবিআরে তলব করে কারণ জানতে চাওয়া হবে। রিটার্ন দাখিলে সময় বেঁধে দেওয়া হবে। এই পর্যায়েও রিটার্ন দাখিল না করলে রাজস্ব আইনে জরিমানা করা হবে। প্রয়োজনে কর ফাঁকির মামলা করা হবে। অন্যদিকে অডিটের জন্য নির্বাচিত অনেক রিটার্নের তথ্য নিয়ে এরই মধ্যে তদন্ত কর্মকর্তারা প্রশ্ন তুলেছেন। তথ্যপ্রমাণ দেখাতে বলেছেন। অনেক রিটার্নকারী তদন্ত কর্মকর্তাদের সব প্রশ্নের সন্তোষজনক জবাব দিতে না পারায় আরও বিস্তারিত তদন্তের জন্য আয়কর ইউনিটের গোয়েন্দা শাখা বা কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা শাখা সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেলে (সিআইসি) পাঠানো হচ্ছে।
অডিটের আওতায় পড়েছেন ব্যবসায়ী আফজাল হোসেন (ছদ্মনাম)। তিনি বলেন, ‘সেই ৩০ বছর বয়স থেকে ব্যবসা করছি। একটি করবর্ষেও আয়কর রিটার্ন ও ভ্যাট রিটার্ন বাদ দেওয়া হয়নি। কর পরিশোধের কাগজ এনবিআর থেকে দিয়েছে। ইটিআইএন ও ভ্যাটের ক্ষেত্রে অনলাইনে নিবন্ধন নিয়েছি। এনবিআরের ওয়েবসাইটে অডিটের জন্য আমার ইটিআইএন নম্বর দেওয়া হয়েছে। এটা দেখে অনেকে মনে করছেন যে, আমি করখেলাপি। আমার পক্ষ থেকে একজন আইনজীবী নিয়োগ দিয়েছি। তাকে ফি দিতে হচ্ছে। আমার প্রশ্ন এনবিআর থেকে আমাকে কর পরিশোধের সনদ দেওয়ার পরও কেন অডিটে ফেলেছে?’
তিনি বলেন, ‘আইনজীবী বিভিন্ন ধরনের কাগজপত্র কর কর্মকর্তাকে দেখিয়েছেন। কিন্তু তাতে কর কর্মকর্তা সন্তুষ্ট হচ্ছেন না। আরও কাগজপত্র, তথ্যপ্রমাণ চাচ্ছেন। এসব করতেই ব্যস্ত আছি, ব্যবসা করব কখন? আমি ছোট ব্যবসায়ী, আমাকে হয়রানি করা হচ্ছে বলে মনে করছি।’
বেসরকারি ব্যাংকের এক কর্মকর্তা নূরজাহান বেগম বলেন, ‘আমার রিটার্ন অডিটে রাখা হয়েছে। আমার বেতন ব্যাংকের মাধ্যমে গ্রহণ করি। প্রতি করবর্ষে হিসাব করে কর পরিশোধ করি। রিটার্ন জমা দিলে এনবিআর কর পরিশোধের পক্ষে সনদ দেয়। এরপরেও কেন আমাকে অডিটে ফেলা হলো। রিটার্ন উল্লেখ করার পরও আমার সম্পদ, সঞ্চয় নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন করা হচ্ছে। এতে আমি বিব্রত।’
এনবিআর চেয়ারম্যানের বক্তব্য
সম্প্রতি এক অনুষ্ঠান শেষে এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বলেন, ‘যারা রিটার্ন দেন না, তাদের শনাক্ত করা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে তাদের কাছে নোটিশ পাঠানো হবে। নোটিশ পাওয়ার পরও কেউ রিটার্ন জমা না দিলে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা সরাসরি তদন্তে নামবেন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আয়-ব্যয়ের হিসাব যাচাই করবেন।’
Manual4 Ad Code
এনবিআর সূত্র জানায়, ‘ভ্যাট অডিটের ক্ষেত্রে ৬০০টি প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করা হয়েছে। বড় করদাতাদের জন্য যৌথ অডিট চালু করা হয়েছে, যেখানে ভ্যাট ও আয়কর কর্মকর্তারা একসঙ্গে কাজ করবেন। কিন্তু ছোট প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সে সুযোগ রাখা হয়নি।’