প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

১২ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২৯শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২৫শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

সিআইডির মামলায় সাজা বেশি, কিন্তু কেন

editor
প্রকাশিত মে ১২, ২০২৬, ০৮:৫০ পূর্বাহ্ণ
সিআইডির মামলায় সাজা বেশি, কিন্তু কেন

Manual1 Ad Code

প্রজন্ম ডেস্ক:

অর্থ পাচার, মানব পাচার, ফরেনসিক ল্যাব ও ডিএনএ টেস্টসহ পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো তদন্ত করে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এখন পর্যন্ত সিআইডির দেওয়া চার্জশিটভুক্ত আসামিদের নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে খালাস পাওয়ার সংখ্যা খুবই কম। অর্থ পাচার ও মানব পাচার মামলার তদন্তে সিআইডির সাফল্য বেশি। গত দুয়েক বছরের মধ্যে সিআইডির আলোচিত প্রশ্নফাঁস, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির অর্থ ফেরত ও ক্রিপ্টোকারেন্সি উদ্ধারসহ গুরুত্বপূর্ণ সব মামলায় তদন্ত সংস্থাটি বরাবরই আলোচনায় ছিল।

Manual2 Ad Code

চলতি পুলিশ সপ্তাহ-২০২৬ এ পুলিশের তিনটি বিশেষ ইউনিট নিজেদের কার্যক্রম ও পরিকল্পনা তুলে ধরবে। তার মধ্যে রয়েছে স্পেশাল ব্যাঞ্চ (এসবি), সিআইডি ও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। সেখানে মানব পাচারের ওপর একটি বিশেষ সøাইড প্রদর্শন করবে সিআইডি। সেখানে মানব পাচারের সম্ভব্য রুট ও গন্তব্য সম্পর্কে তুলে ধরা হবে।

অর্থ পাচার মামলার এক তদন্ত কর্মকর্তা প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, পুলিশে একমাত্র সিআইডি অর্থ পাচার মামলা তদন্ত করে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এসব মামলা করার আগে তার সম্পর্কে প্রাথমিক অনুসন্ধান করা হয়। ফলে মামলা থেকে আসামিরা তেমন একটা খালাস পায় না। প্রতিটি মামলায় হয় তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে, কারও মৌখিক অভিযোগের ভিত্তিতে নয়। এটাই মামলাকে শক্তিশালী করে। মামলা রেকর্ড হওয়ার পর তদন্তে কোনো ত্রুটি রাখার সুযোগ থাকে না।

ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ ও সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, বাংলাদেশ পুলিশের সিআইডি ও পিবিআইকে বিশেষ তদন্ত সংস্থা বলা হয়। তাদের জটিল ও আলামতবিহীন মামলা তদন্তের অভিজ্ঞতা অনেক বেশি। তারা দীর্ঘ সময় নিয়ে মামলা বিশ্লেষণসহ গভীরভাবে অনুসন্ধান করে। এসব কারণেই তারা যখন কোনো মামলায় কাউকে অভিযুক্ত হিসেবে দেখায়, সেখানে যুক্তি থাকে। কোর্টও বিষয়টি আমলে নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করে। সামগ্রিকভাবে এ দুই ইউনিটের মামলায় সাজার হারও বেশি হয়ে থাকে।

সিআইডির তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে নতুন করে জিআর মামলা হয় ১৭২৩টি, নিষ্পত্তি হয় ২৪১২টি, তদন্তধীন ছিল ৩৫৭৮টি। আর ২০২৫ সালে মামলা ছিল ২০৩০টি। গত বছরের তুলনায় ৩০৭টি মামলা বেড়েছে। ওই বছরে ২০৯৩টি মামলা নিষ্পত্তি হয়। এ ছাড়া তদন্তাধীন ছিল ৩৫১৫টি। এদিকে সিআর মামলা ২০২৪ সালে নতুন করে হয় ১০ হাজার ২৬৩টি, নিষ্পত্তি হয় ১১ হাজার ৯৯১টি, তদন্তাধীন ৮২৫৫টি। আর ২০২৫ সালে ১২ হাজার ৬১৫টি মামলা ছিল। গত বছরের তুলনায় ২৩৫২টি মামলা বেড়েছে (২৩%)। ওই বছরে ১২ হাজার ৯৬৩টি মামলা নিষ্পত্তি হয়। এ ছাড়া তদন্তাধীন আছে ৭৯১১টি। এসব মামলায় অভিযুক্ত আসামিদের প্রায় ৭০ শতাংশ সাজা পেয়েছে। এর মধ্যে অর্থ পাচার ও মানব পাচার মামলায় সাজার হার বেশি।

বর্তমানে সিআইডিতে মুলতবি মামলার সংখ্যা ৬০৮টি। এর মধ্যে ৩-৪ বছর মুলতবি রয়েছে ৩৫১টি, ৪-৫ বছর মুলতবি ১৭৯টি এবং পাঁচ বছরের ওপরে মুলতবি রয়েছে ৭৮টি মামলা। এর মধ্যে অধিকাংশ জিআর মামলা। এসব মামলা নিষ্পত্তির জন্য নতুন করে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সিআইডি। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির মামলা দেশের ইতিহাসে আর্থিক অপরাধ প্রতিরোধে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন।

Manual1 Ad Code

সংস্থাটির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটের তথ্য বলছে, সালমান এফ রহমান, এস আলম, শেরাটন ঢাকা হোটেলের অর্থ পাচার, ইউনিক গ্রুপ, বোরাক রিয়েল এস্টেট ছাড়াও অনেক মাদক কারবারি ও শতাধিক রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে অনুসন্ধান এবং ১৪টি রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে পাচার আইনে মামলা করা হয়। তাদের মধ্যে ফাইভ এম ইন্টারন্যাশনাল, স্নিগ্ধা ওভারসিজ, আহমেদ ইন্টারন্যাশনালসহ বিভিন্ন এজেন্সির নাম রয়েছে। রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর বিরুদ্ধে প্রবাসীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা হাতিয়ে তা বিদেশে পাচারের অভিযোগ রয়েছে। তাদের অনেকের সম্পদ জব্দ ও বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।

Manual5 Ad Code

সিআইডির তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত বিভিন্ন মামলায় অভিযুক্তদের অবৈধভাবে অর্জিত ৩৮ হাজার ৫৯৭ শতাংশ জমি ক্রোক, যার মূল্য প্রায় ২২১৬ কোটি ১৪ লাখ টাকা। ৪২১টি ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ (এসব হিসাব নম্বরে ৩২৯ কোটি ২১ লাখ ৬৯ হাজার ৬৭২ টাকা) এবং ৩৫০ শতাংশ জমি, ২০টি ফ্ল্যাট, ১১টি কোম্পানির শেয়ার, ২৩টি গাড়ি বাজেয়াপ্ত (২৫ কোটি ৩ লাখ ২ হাজার ৬২৮ টাকা) ও ৮১ মিলিয়ন ইউএস ডলার জব্ধ করা হয়।

সিআইডির মামলার পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত চার বছরে (২০২২-২৫) মানব পাচার আইনের ৪২২টি মামলা সিআইডিতে আসে। এসব মামলায় ৩৪৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছে তদন্ত সংস্থাটি। এর মধ্যে ২০২২ সালে ১১৪টি, ২০২৩ সালে ৮৬টি, ২০২৪ সালে ১০০টি ও ২০২৫ সালে ১২২টি মামলা সিআইডিতে আসে। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বাদী-বিবাদী আপসের চেষ্টা করায় অধিকাংশ মানব পাচার মামলা তদন্তের মাঝ পথে যায়।

জানা যায়, আকাশপথে ভুয়া ভিসা ও উচ্চ বেতনে চাকরির প্রলোভনে ইতালি, আমেরিকা, কম্বোডিয়া-লাওস, সার্বিয়া, কানাডা, রাশিয়া ও অস্ট্রোলিয়া মানব পাচার করা হয়। এতে দেশ-বিদেশে অবস্থান করা আন্তর্জাতিক মানব পাচারকারী চক্রের সদস্যরা জড়িত রয়েছে। বাংলাদেশ থেকে সাধারণ মানুষকে নিয়ে চক্রটি প্রথমে নেপাল-ভারত-শ্রীলংকা-দুবাই-মিশর-তিউনিসিয়া ও লিবিয়া হয়ে ইতালিতে গেম দেয়; ব্রাজিল ও মেক্সিকো হয়ে আমেরিকায় পাঠায়; মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া হয়ে আস্ট্রোলিয়ায় পাচার করে এবং দুবাই হয়ে সার্বিয়া পাঠিয়ে দেওয়া হয় অনেককে। এ ছাড়া শিক্ষা ও পর্যাটন ভিসা ব্যবহার করে নেপাল হয়ে কানাডায়; সম্প্রতি সময়ে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠাতে সৌদি আরব হয়ে রাশিয়ায় এবং থাইল্যান্ড হয়ে কম্বোডিয়া ও লাওসে সাইবার-স্ক্যাম কেন্দ্রে দাসত্বের কাজে পাচার করা হচ্ছে।

তবে আশার আলো দেখাচ্ছে, সিআইডির ফরেনসিক ল্যাব। গত ছয় বছরে (২০২০-২০২৫) ৩ লাখ ৭১ হাজার ৪৩২টি আলামত পরীক্ষার জন্য ল্যাবে আসে। এর মধ্যে ৩ লাখ ৬৯ হাজার ৫১টি নিষ্পত্তি হয়েছে, যা প্রায় ৯৯.৩ শতাংশ। ছয় বছরের মধ্যে ২০২২ সালে সর্বোচ্চ ৭৫ হাজার ৮৭৫টি আলামত জমা পড়ে, যেখানে ওই বছরেই ৭৪ হাজার ৯৯৮টি নিষ্পত্তি করা হয়।

Manual2 Ad Code

জানা যায়, ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড (ডিএনএ), ফরেনসিক ল্যাব ও ফটোগ্রাফি ল্যাবেই এসব আলমত পরীক্ষা করে সিআইডি। তবে দেশে একমাত্র সিআইডিই কেমিক্যাল, ডিজিটাল ফরেনসিক, জাল নোট পরীক্ষা, ফুটপ্রিন্ট বিশ্লেষণ, অডিও অ্যানালাইসিস ও ব্যালিস্টিকস পরীক্ষা করে। এতে সংস্থাটির শনাক্তের হার ৯০ শতাংশ।

সাইবার তথ্য বলছে, এ ছাড়া সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারে তিন বছরে (২০২৩-২০২৫) অভিযোগ আসে ৬৩ হাজার ৭৯৭টি, নিষ্পত্তি করা হয় ৪৭ হাজার ৩৯০টি। এ ছাড়া ১৬ হাজার ৪০৭টি অভিযোগ বিভিন্নভাবে নিষ্পত্তি হয়ে গেছে। ২০২৩ সালে অভিযোগ আসে ২৮ হাজার ২১২টি, ২০২৪ সালে ২১ হাজার ৭৭২টি ও ২০২৫ সালে ১৩ হাজার ৮১৩টি। সাইবার অপরাধ বাড়লেও সিআইডিতে ক্রমশ অভিযোগ হ্রাস পেয়েছে।

এ বিষয়ে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয় (মাভাবিপ্রবি) ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ উমর ফারুক বলেন, বিজ্ঞানভিত্তিকভাবে সিআইডি অপরাধী শনাক্ত করে। তাদের অনেক ধরনের লজিস্টিক সাপোর্ট রয়েছে, যা সাধারণত অন্যান্য ইউনিটে নেই। এ ছাড়া সিআইডি একটি মামলা তদন্তের সব দিক অনুসরণ করে, যা সাধারণত অন্য ইউনিটগুলো করে না। তদন্ত রিপোর্টের ভিত্তিতেই মামলায় সাজা নির্ধারণ হয়। একটি দুর্বল অভিযোগের কারণে আসামিরা ছাড়া পেয়ে যায়। সে ক্ষেত্রে সিআইডিতে সেটা হয় না।

সার্বিক বিষয়ে সিআইডির মুখপাত্র বিশেষ পুলিশ সুপার (এসএসপি) জসীম উদ্দিন খান বলেন, বিশেষায়িত তদন্ত সংস্থা হিসেবে সিআইডির তদন্তকৃত মামলায় তুলনামূলক অধিক সাজার হারের মূলে রয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও প্রমাণকেন্দ্রিক তদন্ত প্রতিবেদন। প্রতিটি মামালার আগে প্রাথমিক তদন্তকাজ শেষ হয়। জটিল ও স্পর্শকাতর মামলাসমূহে প্রশিক্ষিত ও অভিজ্ঞ তদন্ত কর্মকর্তারা সময় নিয়ে প্রতিটি তথ্য-উপাত্ত যাচাই-বাছাই ও বিশ্লেষণ করেন। ফলে আদালতে উপস্থাপিত তদন্ত প্রতিবেদন অধিকতর গ্রহণযোগ্য হয়। এ সমন্বিত পেশাদারত্বই সাজার হার বৃদ্ধিতে নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করে।

জসীম উদ্দিন খান আরও বলেন, অর্থ পাচার সংক্রান্ত মামলাসমূহ প্রকৃতিগতভাবে জটিল ও বহুমাত্রিক। সিআইডির ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিট এসব মামলার অনুসন্ধান ও তদন্ত কার্যক্রমের প্রতিটি ধাপে জাতীয় আইন, বিচারিক নির্দেশনা ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত চর্চা অনুসরণ করে । তদন্তের মান ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতে প্রতিটি মামলায় অভিজ্ঞ তদন্ত কর্মকর্তার পাশাপাশি একজন তদারক কর্মকর্তা নিবিড় পর্যবেক্ষণ করেন। তিনি বলেন, ফরেনসিক সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিদ্যমান ল্যাবসমূহের আধুনিকায়ন, অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন এবং ডিএনএ, সাইবার ফরেনসিক ও ডিজিটাল ফরেনসিক ইউনিটের পরিসর সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছি। পাশাপাশি তদন্ত কর্মকর্তাদের জন্য প্রশিক্ষণসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহের সঙ্গে কারিগরি সহযোগিতা জোরদার করছি।

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০
১১১৩১৫১৬
১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭৩০৩১

Manual1 Ad Code
Manual7 Ad Code