প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

১২ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২৯শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২৫শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

সীমান্তে কাঁটাতার উত্তেজনা

editor
প্রকাশিত মে ১২, ২০২৬, ০৯:২৮ পূর্বাহ্ণ
সীমান্তে কাঁটাতার উত্তেজনা

Manual6 Ad Code

 

প্রজন্ম ডেস্ক:

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ ঘিরে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের নবগঠিত বিজেপি সরকারের একটি সিদ্ধান্ত। অবৈধ অনুপ্রবেশ রোধ ও সীমান্ত সুরক্ষার যুক্তিতে বাংলাদেশ লাগোয়া এলাকায় বিএসএফকে জমি হস্তান্তরের ঘোষণা দিয়েছে রাজ্য সরকার, যা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন ও কূটনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে নানা প্রতিক্রিয়া। বিষয়টিকে নির্বাচনি বক্তব্যের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখছেন বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকরা, যদিও এটিকে ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে মন্তব্য করেছে ঢাকা। এ পরিস্থিতিতে সীমান্তে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বিজিবি, আর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, বিষয়টি আপাতত উদ্বেগের না হলেও কূটনৈতিক পর্যায়ে নিবিড় পর্যবেক্ষণ জরুরি।

বাংলাদেশ লাগোয়া সীমান্তে বেড়া নির্মাণের জন্য আগামী ৪৫ দিনের মধ্যে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের কাছে জমি হস্তান্তরের ঘোষণা দিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের নবনির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।

শপথ গ্রহণের পর রাজ্যের ক্ষমতায় আসা ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সরকারের মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

Manual8 Ad Code

গতকাল সোমবারের মন্ত্রিসভার বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নেতৃত্বাধীন পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি সরকার অন্তত ছয়টি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে অন্যতম বড় সিদ্ধান্ত, অবৈধ অনুপ্রবেশ রোধ ও সীমান্ত সুরক্ষায় বাংলাদেশ সীমান্ত লাগোয়া এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের জন্য দেশটির সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের কাছে জমি হস্তান্তর করা।

মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে মুখ্যমন্ত্রী অধিকারী বলেন, আমাদের দেশের সুরক্ষার প্রশ্ন। পশ্চিমবঙ্গের সুরক্ষার প্রশ্ন এবং যেভাবে জনবিন্যাস বদলে গেছে, আজ প্রথম দিনেই আমরা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র দফতর ও বিএসএফকে সীমান্ত সুরক্ষিত করার জন্য জমি ট্রান্সফার প্রক্রিয়ার অনুমোদন দিলাম। ভূমি ও রাজস্ব সচিব এবং মুখ্য সচিবকে দায়িত্ব দেওয়া হলো। ৪৫ দিনের মধ্যে হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করতে হবে।

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সংসদের শীতকালীন অধিবেশনে জানিয়েছিলেন যে, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ২,২১৬ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। তিনি জানান, এর মধ্যে ১,৬৫৩ কিলোমিটার সীমান্ত কাঁটাতার দেওয়া সম্পন্ন হয়েছে। তবে একমাত্র পশ্চিমবঙ্গে ৫৬৩ কিলোমিটার সীমান্ত কাঁটাতার দেওয়া বাকি রয়েছে।

ওই ভাষণে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অভিযোগ করেছিলেন তৃণমূল কংগ্রেস সরকার অনুপ্রবেশকারীদের সুরক্ষা দেওয়ার কাজ করছে।

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির নির্বাচনি প্রচারের মূল ইস্যুই ছিল বাংলাদেশ সীমান্তে বেড়া নির্মাণ এবং অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের প্রত্যাবাসন। সদ্য ক্ষমতা থেকে বিদায় নেওয়া মমতা বন্দোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেসের সরকারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সীমান্ত অরক্ষিত রাখার অভিযোগ করেছিল বিজেপি।

নির্বাচনি প্রচারকালে অমিত শাহর দফতর থেকে এক্স হ্যান্ডেলে লেখা হয়েছিল যে, পশ্চিমবঙ্গে সীমান্ত সুরক্ষিত করতে ৬০০ একর জমির প্রয়োজন, তা বিএসএফকে দিচ্ছে না মমতা ব্যানার্জি, বিজেপি ক্ষমতায় এলেই সেই জমি বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়া হবে।

এদিকে ভারতীয় সীমান্তে কাঁটাতারের সীমানা দেওয়া ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তবে সীমান্তে অনুপ্রবেশ রোধ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বিজিবি সার্বক্ষণিক সতর্ক রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

গতকাল সোমবার সচিবালয়ে এক সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি এসব কথা বলেন।

Manual7 Ad Code

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন পরবর্তী পরিস্থিতি ও সীমান্ত উত্তেজনা সংক্রান্ত সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সীমান্তে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন হয়েছে। সেখানে রাজনৈতিক দলের পরিবর্তন হয়েছে। নতুন একটি রাজনৈতিক সরকার গঠিত হয়েছে সেখানে। ভারতের কোনো অঙ্গরাজ্যে সরকার পরিবর্তন বা অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত (যেমন কাঁটাতার নির্মাণ) তাদের নিজস্ব বিষয়।

মন্ত্রী স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখে। কোনো নির্দিষ্ট অঙ্গরাজ্যের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি বা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলে না। সীমান্তে অনুপ্রবেশ রোধ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বিজিবি সার্বক্ষণিক সতর্ক রয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন-পরবর্তী কথিত সংখ্যালঘু নির্যাতন ও এর প্রভাব নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন তথ্যের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অনেক ক্ষেত্রে পুরোনো ও বিভ্রান্তিকর ভিডিও ব্যবহার করে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। এখন পর্যন্ত এ ধরনের কোনো পরিস্থিতির সত্যতা বা নেতিবাচক প্রভাব বাংলাদেশে পড়ার মতো কোনো তথ্য স্বরাষ্ট্র বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে নেই। তিনি জনগণকে এ ধরনের অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হওয়ার আহ্বান জানান।

অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কাঁটাতার দেওয়ার বিষয়টি ঢাকা পর্যবেক্ষণ করছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির। গতকাল সোমবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক ব্রিফিংয়ে তিনি এ কথা বলেন।

পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেন, নির্বাচনি বক্তব্য আর বাস্তবিক সরকার পরিচালনা দুটো ভিন্ন বিষয়। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সরকার নির্বাচনি বক্তব্যের ধারাবাহিকতা শাসনকার্যেও রাখছে কি না, তা একটু সময় দিয়ে দেখতে চায় ঢাকা।

Manual4 Ad Code

তিনি আরও বলেন, কাঁটাতার দিয়ে বাংলাদেশের মতো দেশকে এখন ডর দেখানোর মতো কোনো জায়গা নেই। যদি মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক করতে চান, বাংলাদেশের মানুষ কাঁটাতার ভয় পায় না। বাংলাদেশের সরকারও কাঁটাতার ভয় পায় না, যেখানে আমাদের কথা বলা দরকার, আমরা কথা বলব।

পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, মানুষে মানুষে সম্পর্ক চাইলে সীমান্ত নিরাপত্তার বিষয়গুলো সমাধানের ক্ষেত্রে ভারত সরকারকে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি দেখাতে হবে।

বাংলাদেশের সঙ্গে এখনও অরক্ষিত সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের ইস্যুটি পশ্চিমবঙ্গের আগের সরকারের সময় ঝুলে ছিল বলে জানান তিনি।

Manual8 Ad Code

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক (আইআর) বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেনও মনে করেন, বিষয়টি একবারেই রাজনৈতিক বক্তব্য। এ ধরনের ঘোষণায় বাংলাদেশের উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু না থাকলেও বাংলাদেশের উচিত বিষয়টি পর্যবেক্ষণে রাখা।

তিনি বলেন, পশ্চিমবঙ্গে বিজিবি নির্বাচনি অন্যতম এজেন্ডা ছিল সীমান্তে অনুপ্রবেশ রোধ করা, বেড়া দেওয়া। নির্বাচনে বিজয়ের পর জনগণকে তুষ্ট করতেই এ ধরনের চমক (জমি দেওয়ার ঘোষণা) দিয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী। তবে সীমান্তে বেড়া নির্মাণের বিষয়টি শুধু রাজ্য সরকারের একক সিদ্ধান্ত নয়। এটা কেন্দ্রীয় সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আর বাংলাদেশে বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ভারতও চাচ্ছে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন করতে। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের অনেক দ্বিপক্ষীয় স্বার্থ জড়িত আছে। তাই বাংলাদেশের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হবে এরকম যেকোনো ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে কেন্দ্রীয় সরকারকে আরও অনেক বেশি চিন্তা করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, যদিও বিষয়টি এখন একেবারেই প্রাথমিক পর্যায়ে আছে তারপরও বাংলাদেশের উচিত হবে এখনই বিষয়টি নিয়ে কূটনৈতিক পর্যায়ে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে আলোচনা শুরু করা। কারণ এর সঙ্গে দুই দেশের জনগণেরই আবেগ জড়িত।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ এবং ভারতের মধ্যে বিদ্যমান ৪,১৫৬ কিলোমিটার সীমান্তের মধ্যে ৩,২৭১ কিলোমিটার স্থানে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ কাঁটাতারের বেড়া স্থাপন করেছে এবং ৮৮৫ কিলোমিটার স্থানে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করা হয়নি বলে জানিয়েছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সীমান্তে বেড়া দেওয়া নিয়ে যেসব অসম সমঝোতা চুক্তি হয়েছে সেগুলো বাতিলের বিষয়ে চিঠি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বিগত অন্তর্বর্তী সরকার।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সীমানা নির্ধারণ এবং উভয় দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর দায়িত্ব পালন সংক্রান্ত বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে উভয় দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত মোট ৪টি চুক্তি আছে। বাংলাদেশ-ভারত যুগ্ম সীমান্ত নির্দেশাবলি-১৯৭৫ অনুযায়ী উভয় দেশের শূন্য লাইনের ১৫০ গজের মধ্যে প্রতিরক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যেকোনো কাজ সম্পন্ন করার বিষয়ে সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

এ ছাড়া উভয় দেশের প্রয়োজনে শূন্য লাইন থেকে ১৫০ গজের মধ্যে যেকোনো উন্নয়নমূলক কাজ সম্পন্নের ক্ষেত্রে একে-অপরের সম্মতি গ্রহণের বাধ্য-বাধকতা রয়েছে।

সর্বশেষ গত বছরের শুরুতে সীমান্তের পাঁচটি জায়গায় ভারত কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণকাজ শুরু করলে বিজিবির ও স্থানীয় মানুষের শক্ত অবস্থানের কারণে ভারত ওই সব স্থানে কাজ বন্ধ করতে বাধ্য হয়।

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০
১১১৩১৫১৬
১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭৩০৩১

Manual1 Ad Code
Manual6 Ad Code