স্টাফ রিপোর্টার:
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেপ্তার মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর মুঠোফোনের ফরেনসিক বিশ্লেষণ করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। এতে কিছু সন্দেহজনক মুঠোফোন নম্বর পায় তারা। নম্বরগুলো শনাক্তের জন্য পুলিশের কাছে পাঠানো হয়। এই সূত্র ধরে পলাতক সাবেক সেনা কর্মকর্তা মোজাফফর হোসেনকে (৭৭) শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
৪৫ বছর পলাতক থাকার পর সেনা কর্মকর্তা মোজাফফর হোসেন আটক এক-এগারোর সময়ের আলোচিত লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিনকে গত ২৩ মার্চ রাতে রাজধানীর বারিধারা ডিওএইচএসের বাসা থেকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। অন্যদিকে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ৪৫ বছর ধরে পলাতক মেজর (অব.) মোজাফফরকে (৭৭) গত বুধবার রাতে রাজধানীর বনানীর একটি বাসা থেকে গ্রেপ্তার করার কথা জানায় ডিবি। পরদিন বৃহস্পতিবার তাঁকে ঢাকা সেনানিবাসের মিলিটারি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
মোজাফফরকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে বৃহস্পতিবার ডিএমপির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর থেকে তিনি (মোজাফফর) বিভিন্ন স্থানে আত্মগোপনে ছিলেন। বিশ্বস্ত সোর্স ও তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্লেষণ করে গোয়েন্দা বিভাগ তাঁর অবস্থান শনাক্ত করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ডিবির একটি আভিযানিক দল গত বুধবার রাত ১০টা ১০ মিনিটে বনানীর একটি বাসা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে তাঁর পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়। বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে আর্মড ফোর্সেস ডিভিশনকে অবহিত করা হয়। পরে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা ১০ মিনিটে ঢাকা সেনানিবাসের মিলিটারি পুলিশের কাছে যথাযথ আইনানুগ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তাঁকে হস্তান্তর করা হয়।
Manual1 Ad Code
মোজাফফর কীভাবে শনাক্ত হলেন, সে বিষয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহার কাছ থেকে একটি ভাষ্য পাওয়া গেছে। তাঁর ভাষ্যে, মাসুদ উদ্দিনের সঙ্গে একাধিক মুঠোফোন নম্বর দিয়ে কথা বলেছিলেন এক ব্যক্তি। তিনি খুদেবার্তাও পাঠিয়েছিলেন। এই সূত্র ধরেই শেষ পর্যন্ত মোজাফফর শনাক্ত ও গ্রেপ্তার হন পুলিশের হাতে।
Manual8 Ad Code
ফেনী-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মাসুদ উদ্দিনকে মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় গত ৭ মে গ্রেপ্তার দেখানোর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-২। একই সঙ্গে এই মামলায় তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদেরও অনুমতি দেওয়া হয়।
প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা বলেন, মামলা তদন্তের অংশ হিসেবে মাসুদ উদ্দিনের মুঠোফোনের ফরেনসিক করে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। তাঁর মুঠোফোনের সিডিআর (কল ডিটেইল রেকর্ড) নেওয়া হয়। অর্থাৎ মাসুদ উদ্দিনের মুঠোফোন থেকে যাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে, তাঁদের সবার বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হয়। সিডিআরে ২০২৩ সাল থেকে রাজধানীর বনানী ও মিরপুর ডিওএইচএসের একই অবস্থান থেকে একাধিক নম্বরে মাসুদ উদ্দিনের সঙ্গে মুঠোফোনে এক ব্যক্তির কথা বলা, এসএমএস (খুদেবার্তা) আদান–প্রদানের তথ্য পাওয়া যায়। ফোনালাপগুলোর সময়কাল ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত। পরে দেখা যায়, সিমগুলো ভুয়া নামে নিবন্ধিত।
Manual8 Ad Code
এক-এগারোর সময়ের আলোচিত সাবেক সেনা কর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী গ্রেপ্তার সন্দেহজনক নম্বরগুলো ব্যবহার করে কে বা কারা ব্যক্তি মাসুদ উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন, তা ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা কিংবা প্রসিকিউশন (রাষ্ট্রপক্ষ) চিহ্নিত করতে পারছিল না বলে উল্লেখ করেন তানভীর হাসান জোহা। তিনি বলেন, এ কারণে নম্বরগুলো পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠায় ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। এ ব্যাপারে পরবর্তী সময়ে পুলিশ নিজেদের মতো কাজ করে। উদ্ঘাটিত হয় মাসুদ উদ্দিনের সঙ্গে একাধিক নম্বর থেকে যোগাযোগ করা এই ব্যক্তি হলেন জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ৪৫ বছর ধরে পলাতক থাকা সাবেক সেনা কর্মকর্তা মোজাফফর।
১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোররাতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে একদল বিপথগামী সেনা কর্মকর্তা তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে নৃশংসভাবে হত্যা করেন। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান আগের দিন চট্টগ্রামে গিয়েছিলেন দলের স্থানীয় বিরোধ মেটাতে। জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনা, বয়ান বা বইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে যাওয়া সশস্ত্র সেনা কর্মকর্তাদের একজন ছিলেন মোজাফফর। জিয়াকে হত্যার মুহূর্তে তাঁর কাছেই ছিলেন তিনি। জিয়াউর রহমান হত্যার পর মোজাফফর পালিয়ে যান। তাঁকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য তখন পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান বলেন, ‘সত্যিকার অর্থে আসল কাজটা (মোজাফফরকে শনাক্ত) কিন্তু পুলিশই করেছে। আমরা শুধু সন্দেহজনক নম্বর নিয়ে বসে ছিলাম।’