জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আয়োজিত একাধিক অনুষ্ঠানে হট্টগোল, বাগবিতণ্ডা, হাতাহাতি ও হামলার অভিযোগ সামনে এসেছে। একই আন্দোলনের অংশীদার রাজনৈতিক দল, সংগঠন এবং জুলাই-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে প্রকাশ্য মতবিরোধ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আন্দোলনের কৃতিত্ব, রাজনৈতিক অবস্থান ও আদর্শগত মতপার্থক্যকে ঘিরে এই পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।
Manual2 Ad Code
সম্প্রতি জুলাই আন্দোলনের শক্তিগুলোর মধ্যে এক ধরনের অসহিষ্ণু মনোভাব দেখা যাচ্ছে। কেউ কাউকে ছাড় দিচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রেই সৃষ্টি হচ্ছে সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি।
বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি এবং প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন দুটি ধারাকে কেন্দ্র করে বিভাজন স্পষ্ট হচ্ছে। দুই পক্ষের সঙ্গেই রয়েছে পৃথক প্ল্যাটফর্মে থাকা কয়েকটি রাজনৈতিক দল ও সংগঠন। অন্যদিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মী এবং জুলাইয়ে আহতরা সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত না থাকলেও রাজনৈতিকভাবে সক্রিয়। তবে সরকারের সঙ্গেও তাদের সম্পর্ক খুব একটা সুসম্পর্কপূর্ণ নয়।
রাজধানী থেকে জেলায়
বুধবার (৫ আগস্ট) ঢাকায় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে হট্টগোলের ঘটনা ঘটে। একই দিনে শরীয়তপুর, নারায়ণগঞ্জ ও কুড়িগ্রামসহ আরও কয়েকটি জেলায়ও সংঘাত ও হামলার অভিযোগ ওঠে।
চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রদর্শিত একটি তথ্যচিত্র (ডকুমেন্টারি) ঘিরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। শহীদ পরিবারের একাংশের অভিযোগ, তথ্যচিত্রে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস ও ঘটনাপ্রবাহে অসংগতি রয়েছে। বিশেষ করে ৩ আগস্টের ঘটনাগুলো স্থান পায়নি। এ নিয়ে প্রতিবাদের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী-২ রাশেদ খানের বক্তব্য চলাকালে কয়েকজন ‘ভুয়া, ভুয়া’ স্লোগান দেন। একপর্যায়ে কয়েকটি দেশের কূটনীতিক অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করেন। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
একই দিন শরীয়তপুরে জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবসের অনুষ্ঠানে জুলাই যোদ্ধাদের মারধর ও লাঞ্ছিত করার অভিযোগ ওঠে বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহবুব মোর্শেদ টিপুসহ কয়েকজন তাদের মারধর করে অনুষ্ঠানস্থল থেকে বের করে দেন। তবে বিএনপির নেতাকর্মীরা অভিযোগ অস্বীকার করেন।
এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জের সরকারি তোলারাম কলেজে একই অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে মারামারির ঘটনা ঘটে। কুড়িগ্রামে জুলাইয়ের একটি অনুষ্ঠান থেকে বের করে এক সাংবাদিককে মারধরের অভিযোগও ওঠে।
নেপথ্যে কী
জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে আয়োজিত বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সাধারণত আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে অংশ নেওয়া রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের প্রতিনিধিরাই উপস্থিত থাকেন। তবে দুই বছর পর সেই অংশীজনদের মধ্যেই মতভিন্নতা ও অসহিষ্ণুতা প্রকাশ্যে এসেছে।
Manual5 Ad Code
সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ মনে করেন, এর পেছনে রয়েছে আন্দোলনের কৃতিত্ব নিয়ে প্রতিযোগিতা, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাব এবং আদর্শগত পার্থক্য।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও লেখক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, একসঙ্গে আন্দোলন করে সরকার পতন ঘটালেও নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন করেছে এক পক্ষ, অন্য পক্ষ ক্ষমতার বাইরে রয়েছে। ফলে আন্দোলনের কৃতিত্ব নিয়ে অংশীজনদের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি আদর্শগত মতভিন্নতাও ভূমিকা রাখতে পারে।
তিনি বলেন, মূল্যায়নের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির ব্যবধান থেকেও এ ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। তবে এখনই নিজেদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করা কারও জন্য সুখকর হবে না। এতে জুলাই আন্দোলনের মাহাত্ম্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, রাষ্ট্রীয় ডকুমেন্টারিতে কারও কারও অবদানকে অস্বীকার করা হয়েছে—এমন অভিযোগ উঠেছে। যদিও সরকার এটিকে অনিচ্ছাকৃত ভুল বলে দুঃখ প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন সবার হলেও এখন কেউ কেউ একক কৃতিত্ব দাবি করতে চান। সরকারের পক্ষেও যেমন এ প্রবণতা আছে, তেমনি বিরোধী দল ও জুলাই যোদ্ধাদের মধ্যেও দেখা যায়। তাঁর মতে, এসব কারণেই সংঘাত তৈরি হচ্ছে।
আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ব্যারিস্টার যোবায়ের আহমদ ভূঁইয়া বলেন, জুলাইয়ের একক কৃতিত্ব কারও নয়। একে অপরকে ছোট করার মানসিকতা থেকেই অনেক সময় অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
জুলাইয়ের তাৎপর্য নিয়ে প্রশ্ন
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, একই আন্দোলনের অংশীদারদের মধ্যে বারবার সংঘাতের ঘটনা ঘটতে থাকলে আন্দোলনের তাৎপর্য ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। তবে তাদের ধারণা, ফ্যাসিবাদবিরোধী প্রশ্নে সংশ্লিষ্ট শক্তিগুলো আবারও একসঙ্গে অবস্থান নিতে পারে।
Manual7 Ad Code
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম বলেন, রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে জুলাইকে খাটো করে বক্তব্য দেওয়া হলে অনেক সময় অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটে। তবে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান সম্ভব এবং জুলাইয়ের তাৎপর্য নষ্ট করার সুযোগ নেই।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বলেন, বিএনপি জুলাইয়ের চেতনাকে সমুন্নত রাখতে চায়। তাঁর অভিযোগ, একটি পরাজিত মহল বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে বিভেদ তৈরির চেষ্টা করছে। তবে গণতন্ত্রের স্বার্থেই জুলাইকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে।