মায়ের অপেক্ষার প্রহর যেন শেষ হয় না। প্রতিদিন সকালে ঘুম ভেঙে তিনি দরজায় কান পাতেন, এই বুঝি ছেলে ফিরে এলো! কিন্তু দিন গড়িয়ে রাত নামে, ছেলে আর ফেরে না।
এভাবেই বছর ঘুরে বছর কাটে, অপেক্ষার যন্ত্রণা বুকে নিয়ে এক অনিশ্চিত অন্ধকারে ডুবে থাকেন গুম হওয়া মানুষের স্বজনরা। কেউ জানে না তার প্রিয়জন আদৌ বেঁচে আছে, নাকি চিরতরে হারিয়ে গেছে। মৃত্যুর ক্ষেত্রে অন্তত একটি দাফন বা শেষকৃত্যের আনুষ্ঠানিকতা থাকে, কিন্তু গুমের শিকার পরিবারের সদস্যদের সেই সান্ত্বনাটুকুও জোটে না।
গুমের ভয়াবহতা সম্পর্কে বলতে গিয়ে সাবেক গুম সংক্রান্ত অনুসন্ধান কমিশনের চেয়ারম্যান ও হাইকোর্টের সাবেক বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, ‘গুম আসলে মৃত্যুর চেয়েও ভয়াবহ।’
Manual8 Ad Code
দেশে দীর্ঘদিন ধরে গুমের অভিযোগ আলোচিত হলেও ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্তের আওতায় আসে। তবে বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, এক হাজার ৯১৩টি অভিযোগের বিপরীতে গুম তদন্ত কমিশন দেশে ১ হাজার ৫৬৯টি জোরপূর্বক গুমের ঘটনা শনাক্ত করলেও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এখন পর্যন্ত গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগে মাত্র ১১টি মামলা বা মামলার কার্যক্রম চলছে, যার একটিরও চূড়ান্ত রায় আজ পর্যন্ত হয়নি। আশঙ্কা করা হচ্ছে, গুম হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ২৮৭ জনের মৃত্যু হয়েছে।
বিগত স্বৈরাচারী সরকারের আমলের এই নিকৃষ্টতম অপরাধের বিচার নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকার বদ্ধপরিকর বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গুমের ঘটনাগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত ও ‘আয়নাঘর’-এর কারিগরদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে ইতোমধ্যেই আইনি পদক্ষেপ শুরু হয়েছে বলেও এক বাণীতে উল্লেখ করেছেন তিনি। কিন্তু মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবীরা গুমের তদন্তপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের দাবি, গুমের অভিযোগের তদন্তের দায়িত্ব স্বাধীন কোনো সংস্থার হাতে দেওয়া উচিত।
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে গুমের অভিযোগ দেশ-বিদেশে ব্যাপকভাবে আলোচিত হলেও ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানের পরই বিষয়টি প্রথম আনুষ্ঠানিক তদন্তের আওতায় আসে। গঠিত হয় গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশন।
আশঙ্কা করা হচ্ছে ২৮৭ জনের মৃত্যু হয়েছে
Manual3 Ad Code
চলতি বছরের জানুয়ারিতে গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এক ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। সবচেয়ে হৃদয়বিদারক হলো, শনাক্ত হওয়া ঘটনাগুলোর মধ্যে ২৮৭টি ক্ষেত্রে নিখোঁজ ব্যক্তিকে মৃত বলে ধারণা করা হয়েছে।
Manual1 Ad Code
কমিশনের সদস্যরা মনে করেন, গুমের প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়েও অনেক বেশি। ভয়ের সংস্কৃতি, আস্থাহীনতা কিংবা সামাজিক পারিপার্শ্বিকতার কারণে অনেক ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবার আজও কমিশনের কাছে আসেননি। সব মিলিয়ে দেশে ৪ থেকে ৬ হাজার মানুষ জোরপূর্বক গুমের শিকার হয়ে থাকতে পারেন বলে কমিশনের ধারণা। কমিশনের অনুসন্ধানে তৎকালীন স্বৈরাচারী সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের প্রত্যক্ষ মদদ ও নির্দেশনায় গুমের ঘটনাগুলোর প্রমাণ মিলেছে। বিশেষ করে বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলী, চৌধুরী আলম, সালাহউদ্দিন আহমদ, হুম্মাম কাদের চৌধুরী, জামায়াত নেতা আবদুল্লাহিল আমান আজমি, ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেম ও সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামানের মতো আলোচিত গুমের ঘটনাগুলো কমিশনের অনুসন্ধানে বিস্তারিতভাবে উঠে এসেছে।
১১ মামলার অগ্রগতি, রায় শূন্য
কমিশনের তথ্যানুযায়ী গুমের সংখ্যা দেড় হাজার ছাড়ালেও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এখন পর্যন্ত গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগে মাত্র ১১টি মামলা বা মামলার কার্যক্রম চলছে বলে জানিয়েছেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম। তবে হতাশার বিষয় হলো, এখন পর্যন্ত এসব মামলার একটিরও চূড়ান্ত রায় হয়নি।
প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম বলেন, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগে ট্রাইব্যুনালে প্রথম গুমের মামলাটি হচ্ছে ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) সাবেক মহাপরিচালক জিয়াউল আহসানের মামলাটি। প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিমের মতে, পদ্ধতিগত অসংখ্য গুমের ঘটনা রয়েছে। নতুন অধ্যাদেশ পাস হলে সেগুলোর বিচার সম্ভব হবে। কারণ বিদ্যমান আইনে সব অপরাধের বিচার পুরোপুরি সম্ভব নয়।
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আজম খান এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, বর্তমান সরকার গুম, খুন, অত্যাচার ও নির্যাতনমুক্ত দেশ গড়তে নিরলস কাজ করছে। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন বলেছেন, ‘দেশে গুমের দিন শেষ হয়ে গেছে। ভয়ংকর সেই কালো অধ্যায় অতিক্রম করে আমরা একটি ন্যায়বিচারের দেশ প্রতিষ্ঠা করতে চাই।’
Manual4 Ad Code
অন্তর্বর্তী সরকার গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারের জন্য একটি অধ্যাদেশ অনুমোদন করেছিল এবং ‘জোরপূর্বক গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’-এর খসড়াও তৈরি করেছিল তারা। এতে গুমকে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন বা মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। তবে প্রস্তাবিত আইনের তদন্তব্যবস্থা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, ‘গুমের অভিযোগের তদন্তের দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে থাকলে নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন থাকবে। তদন্তের দায়িত্ব স্বাধীন কোনো সংস্থার হাতে দেওয়া উচিত।’ গুম কমিশনের সদস্য ও আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক নূর খান লিটনও প্রস্তাবিত আইনে বিভিন্ন বাহিনীর হাতে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছেন।
বিল সংশোধনের দাবি
জাতীয় প্রেস ক্লাবে গতকাল হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) আয়োজিত এক সভায় মানবাধিকারকর্মীরা গুম প্রতিরোধ বিলে স্বতন্ত্র তদন্তপ্রক্রিয়া রাখার দাবি জানান। সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন বলেন, নিজস্ব বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্তের দায়িত্ব তাদের হাতেই রাখলে তা আসলে একপ্রকার ধোঁকা দেওয়া হবে।
সভায় বিশেষজ্ঞরা বলেন, গুম শুধু কোনো ব্যক্তির হারিয়ে যাওয়া নয়, এটি একটি গোটা পরিবারের স্বপ্ন, আশা ও বেঁচে থাকার অধিকারের সমাধি রচনা করে। স্বজনদের এই বুকফাটা কান্নার অবসান ঘটিয়ে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার এখনই সময়। একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে গুমের মতো দানবীয় অপতৎপরতার কোনো স্থান হতে পারে না। বিচারের দীর্ঘসূত্রতা কাটিয়ে অবিলম্বে গুম হওয়া প্রতিটি মানুষের সন্ধান এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের পবিত্র দায়িত্ব।