দেশে পেঁয়াজ উৎপাদনে বড় ধরনের অগ্রগতি হয়েছে। গত তিন অর্থবছরে শস্যটির উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ১২ লাখ টন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়েছিল ৩৯ লাখ ১১ হাজার ২০০ টন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৪ লাখ ৪৮ হাজার ৭০০ টনে। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছে ৫০ লাখ ৯০ হাজার ৯০০ টন। উৎপাদনের এই ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি দেশীয় পেঁয়াজেই চাহিদা পূরণের সম্ভাবনাকে আরও জোরালো করেছে।
কৃষি খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, পেঁয়াজ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের বিষয়টি শুধু উৎপাদনের পরিমাণ দিয়ে বিচার করলে হবে না। দেশের মোট চাহিদা, বীজ ও অন্যান্য কাজে ব্যবহার, সংরক্ষণে ক্ষতি এবং মৌসুমভিত্তিক সরবরাহের হিসাবও বিবেচনায় নিতে হবে। বিশেষ করে উৎপাদন মৌসুমে দাম পড়ে যাওয়া এবং পরবর্তী সময়ে সরবরাহ কমে দাম বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে দেশীয় উৎপাদনের সুফল কৃষক ও ভোক্তাÑ দুপক্ষই পাবে।
এ প্রসঙ্গে কৃষিমন্ত্রী মো. আমিনুর রশিদ বলেন, বাংলাদেশ এখন পেঁয়াজ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে। আমাদের লক্ষ্য শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণ করা নয়, বরং ভবিষ্যতে উদ্বৃত্ত পেঁয়াজ বিদেশে রপ্তানির সক্ষমতা অর্জন করা। এ লক্ষ্য সামনে রেখে উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি পেঁয়াজ সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ ব্যবস্থার উন্নয়নে সরকার কাজ করছে। একই সঙ্গে প্রচলিত মৌসুমের বাইরে গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের উৎপাদন বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কারণ গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের আবাদ সম্প্রসারণ করা গেলে মৌসুমি উৎপাদন ও সরবরাহের ব্যবধান কমবে, সারা বছর বাজারে পেঁয়াজের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা সহজ হবে এবং আমদানির ওপর নির্ভরতা পর্যায়ক্রমে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
তিন বছরে উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ১২ লাখ টন
Manual2 Ad Code
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দেওয়া পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পেঁয়াজ উৎপাদন বেড়েছিল ৫ লাখ ৩৭ হাজার ৫০০ টন। পরের অর্থবছরে উৎপাদন আরও ৬ লাখ ৪২ হাজার ২০০ টন বেড়েছে। অর্থাৎ দুই বছরের ব্যবধানে উৎপাদন বেড়েছে ১১ লাখ ৭৯ হাজার ৭০০ টন। শতাংশের হিসাবে এই বৃদ্ধি প্রায় ৩০ শতাংশ। উৎপাদনের এই প্রবৃদ্ধি দেশের কৃষিতে পেঁয়াজের গুরুত্ব ও উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়।
Manual4 Ad Code
ধারাবাহিকভাবে কমছে আমদানি
প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে পেঁয়াজ আমদানি হয়েছিল ৫ লাখ ৯৭ হাজার ৭৩০ টন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আমদানির পরিমাণ কমে দাঁড়ায় ৪ লাখ ৭৩ হাজার ১১৬ টনে। আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ৯ মাসে আমদানির পরিমাণ ৮৬ হাজার ৩৬৮ টন। এসব তথ্যে আমদানির পরিমাণ কমার প্রবণতা স্পষ্ট। সুতরাং দেশীয় উৎপাদন আরও বাড়লে বিদেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানির প্রয়োজন ফুরাবে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয়ের পাশাপাশি স্থানীয় কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের বাজার তৈরি হওয়ার সুযোগ বাড়বে।
সংরক্ষণে জোর, মজুদ প্রায় ৮ লাখ ৭৮ হাজার টন
Manual4 Ad Code
পেঁয়াজ উৎপাদনে অগ্রগতির পাশাপাশি সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রাপ্ত তথ্যমতে, ১৯ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত চলতি বছরের পেঁয়াজের সংরক্ষিত মজুদের পরিমাণ ৮ লাখ ৭৮ হাজার ২৭৪ টন।
পেঁয়াজের একটি বড় সমস্যা হলো সংরক্ষণকালীন পচন ও ওজন কমে যাওয়া। প্রচলিত পদ্ধতিতে যথাযথ বায়ু চলাচল নিশ্চিত করা না গেলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পেঁয়াজ নষ্ট হতে পারে। ফলে উৎপাদন বেশি হলেও মৌসুমের পরবর্তী সময়ে বাজারে ঘাটতি দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থাকে। এই সমস্যা মোকাবিলায় কৃষক পর্যায়ে এয়ার ফ্লো মেশিন বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রাপ্ত হিসাব অনুযায়ী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রণোদনার আওতায় ৪ হাজারটি এয়ার ফ্লো মেশিন দেওয়া হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রথম কিস্তিতে ৪ হাজার এবং দ্বিতীয় কিস্তিতে ১৫ হাজার মেশিন বিতরণ করা হয়েছে। এর বাইরে কর্মসূচির আওতায় দেওয়া হয়েছে আরও ৩ হাজার ৭০০টি। সব মিলিয়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিতরণ করা হয়েছে ২২ হাজার ৭০০টি এয়ার ফ্লো মেশিন। সংরক্ষণের এই উদ্যোগ সফল হলে কৃষক উৎপাদনের পরপরই কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি করতে বাধ্য হবেন না। সংরক্ষিত পেঁয়াজ পরিকল্পিতভাবে বাজারে সরবরাহ করা গেলে মৌসুমের পরবর্তী সময়ে সরবরাহের ঘাটতি ও অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
প্রণোদনায় দেড় লাখের কাছাকাছি কৃষক
পেঁয়াজ উৎপাদন বাড়াতে কৃষককে প্রণোদনা দেওয়ার কর্মসূচিও রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পেঁয়াজ উৎপাদনের জন্য ১ লাখ ৪১ হাজার ৯০০ জন কৃষককে প্রণোদনার আওতায় আনা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে প্রণোদনাপ্রাপ্ত কৃষকের সংখ্যা আরও বাড়বে।
কৃষি সচিব মো. সেলিম খান বলেন, দেশকে পেঁয়াজ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী যে অনুশাসন দিয়েছেন, তা বাস্তবায়নে কৃষি মন্ত্রণালয় ও কৃষি বিভাগ সমন্বিতভাবে কাজ করছে। দেশে পেঁয়াজের উৎপাদন বাড়িয়ে অভ্যন্তরীণ চাহিদা দেশীয় উৎপাদনের মাধ্যমে পূরণ করা এবং আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে আনার লক্ষ্য নিয়ে আমরা এগোচ্ছি। এজন্য কৃষকেরা যাতে সময়মতো পেঁয়াজ চাষ করতে পারেন, সে লক্ষ্যে উন্নতমানের বীজ সরবরাহ, চাষাবাদে প্রয়োজনীয় কারিগরি পরামর্শ এবং বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আধুনিক উৎপাদন প্রযুক্তির সম্প্রসারণ ও কৃষকদের উৎসাহিত করার মাধ্যমে পেঁয়াজের ফলন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।