নিউজ ডেস্ক:
ভারতের কট্টর হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) জন্য পশ্চিমবঙ্গ ছিল সব সময়ই এক ‘অজেয় দুর্গ’। জনসংঘের প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জন্মস্থান হওয়ায় এই রাজ্য জয় করা ছিল তাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। অবশেষে বাংলায় বিজেপির বিশাল জয়ের পর অনেকেই প্রশ্ন করছেন, কে হচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী? রাজ্যে দলের ভিত্তি মজবুত করার লক্ষ্যে বিজেপি একজন শক্তিশালী নেতাকে বেছে নেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। রেকর্ড ভেঙে সেখানে একজন নারীকেও প্রথমবারের মতো মুখ্যমন্ত্রী বানাতে পারে বিজেপি, সেই গুঞ্জনও চলছে।
দেশটির কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ নির্বাচনী প্রচারণার সময় বারবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেছিলেন, বিজেপি ক্ষমতায় এলে কোনও ‘ভূমিপুত্র’ কিংবা বাঙালিকেই মুখ্যমন্ত্রী করা হবে। আর বিজেপি দলীয় কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার এক ধাপ এগিয়ে বলেছিলেন, বাংলার পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী হবেন একজন ‘আমিষভোজী’। যা মূলত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বিজেপি মাছ-মাংস নিষিদ্ধ করবে’ এমন প্রচারণার পাল্টা জবাব হিসেবে তিনি বলেছিলেন বলে ধারণা করা হয়। বর্তমানে বাংলা বিজেপির দখলে আসায় সবার নজর এখন মমতার উত্তরসূরির দিকে।
Manual1 Ad Code
• কে হচ্ছেন পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী?
আঞ্চলিক দলগুলোর মতো বিজেপি সাধারণত বিধানসভা নির্বাচনে কোনও নির্দিষ্ট পরিচিত মুখকে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তুলে ধরে না। বাংলায় নরেন্দ্র মোদিই ছিলেন দলের একমাত্র বাজি। রাজ্যজুড়ে ২০টিরও বেশি জনসভা করে মমতার দুর্গ ভাঙতে ব্যাপক চেষ্টা চালিয়েছেন তিনি।
গত এক মাসে নরেন্দ্র মোদি আক্ষরিক অর্থেই বাংলায় মিশে গিয়েছিলেন। তাকে ঝালমুড়ি খেতে দেখা গেছে, কালী মন্দিরে (যেখানে আমিষ ভোগ দেওয়া হয়) পূজা দিয়েছেন, বাঙালির প্রিয় ফুটবল খেলেছেন এবং বাংলায় অডিও বার্তাও দিয়েছেন। দেশটির রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলার মানুষ ‘ব্র্যান্ড মোদি’র ওপরই আস্থা রেখেছেন বলে মনে হচ্ছে।
কিন্তু মোদির এই প্রাণপন প্রচেষ্টাকে সামনের দিকে এগিয়ে নেবেন কে? নারী নিরাপত্তাকে প্রচারণার প্রধান কৌশল করায় বিজেপি একজন নারী মুখ্যমন্ত্রী নিয়োগের পথে হাঁটতে পারে বলে গুঞ্জনও রয়েছে। বর্তমানে কেবল দিল্লিতেই (রেখা গুপ্তা) বিজেপির নারী মুখ্যমন্ত্রী রয়েছেন। নারীর নিরাপত্তা আইন নিয়ে আলোচনার আবহে বিজেপি তাদের ‘নারী-বান্ধব’ ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে এই সুযোগটি কাজে লাগাতে পারে।
দলের প্রভাবশালী নারী নেত্রীদের মধ্যে অগ্নিমিত্র পাল এবং বি আর চোপড়ার কালজয়ী সিরিজ ‘মহাভারতে’ দ্রৌপদী চরিত্রে অভিনয় করা রূপা গাঙ্গুলীও আলোচনায় রয়েছেন। এছাড়া অন্যান্যদের মধ্যে আছেন বিরোধী দলীয় নেতা ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী শুভেন্দু অধিকারী, রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য, নিশীথ প্রামাণিক এবং দাপুটে নেতা দিলীপ ঘোষ।
• শুভেন্দু অধিকারী
তৃণমূলের সাবেক হেভিওয়েট এবং মমতার একসময়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী শুভেন্দু অধিকারীকে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী পদের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রার্থী বলে মনে করা হচ্ছে। বাংলার বিজেপির সবচেয়ে পরিচিত মুখ হওয়ার পাশাপাশি তার রয়েছে তৃণমূল স্তরে শক্ত যোগাযোগ এবং সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক। মেদিনীপুরে তার বিপুল প্রভাব রয়েছে।
২০২১ সালে নন্দীগ্রামে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারিয়ে তিনি ‘জায়ান্ট কিলার’ হিসেবে আবির্ভূত হন। এবার ভবানীপুরেও মমতাকে ব্যাপক টক্কর দিয়েছেন তিনি। তবে তার বিরুদ্ধে অভিযোগও রয়েছে; ২০২১ সালে নারদ স্টিং অপারেশন মামলায় তার নাম জড়িয়েছিল।
• শমীক ভট্টাচার্য
বিজেপির নবনিযুক্ত রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের রাজনৈতিক হাতেখড়ি দেশটির কট্টর হিন্দুত্ববাদী সংগঠন ও বিজেপির আদর্শিক গুরুখ্যাত রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘে (আরএসএস)। বিজেপিতে তিনি একজন ‘সর্বজনগ্রাহ্য’ ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। আড়ালে থেকে কাজ করতে পছন্দ করা শমীক বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর মাঝে বিজেপির প্রভাব বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
Manual4 Ad Code
• অগ্নিমিত্র পাল
পেশায় ফ্যাশন ডিজাইনার অগ্নিমিত্র পাল বর্তমানে বাংলার বিজেপির অন্যতম শীর্ষ নারী নেত্রী। মহিলা মোর্চার সভানেত্রী থেকে শুরু করে তিনি দ্রুত রাজ্য সহ-সভাপতির পদে জায়গা পেয়েছেন। ২০২৬ সালের নির্বাচনেও তিনি আসানসোল দক্ষিণ আসনটি ধরে রেখেছেন। এনআইএফটির গ্রাজুয়েট এই নেত্রী তার লড়াকু প্রচার শৈলী এবং মমতার প্রতি তীক্ষ্ণ আক্রমণের জন্য পরিচিত।
• রূপা গাঙ্গুলী
‘মহাভারতের’ দ্রৌপদী হিসেবে আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা পাওয়া রূপা গাঙ্গুলী বিজেপির অন্যতম জনপ্রিয় মুখ। সাবেক এই রাজ্যসভা সাংসদ বর্তমানে সোনারপুর দক্ষিণের বিধায়ক। শহুরে ভোটারদের মধ্যে তার যেমন গ্রহণযোগ্যতা আছে, তেমনি মহিলা মোর্চার সভাপতি থাকাকালীন প্রান্তিক স্তরেও তিনি যোগাযোগ গড়ে তুলেছেন।
Manual1 Ad Code
• দিলীপ ঘোষ
আগ্রাসী রাজনীতি এবং তৃণমূল স্তরে দৌড়ঝাঁপের জন্য পরিচিত সাবেক রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ। ২০২১ সালে বাম-কংগ্রেসকে হটিয়ে বিজেপিকে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার কৃতিত্ব তাকেই দেওয়া হয়।
বর্তমানে সভাপতি পদে না থাকলেও বাংলার রাজনীতিতে তিনি অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং মুখ্যমন্ত্রী দৌড়ে চমক হতে পারেন তিনি। আরএসএসের একনিষ্ঠ কর্মী দিলীপ ২০১৪ সালে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে বিজেপিতে যোগ দেন। তবে বিতর্কিত মন্তব্যের কারণে তিনি প্রায়ই খবরের শিরোনামে থাকেন।
ঐতিহাসিক এই জয়ের পর বিজেপি কি শুভেন্দু বা দিলীপের মতো পরিচিত মুখের ওপর বাজি ধরবে, নাকি নতুন কোনও নারী নেতৃত্বকে মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসাবে; সেটিই এখন দেখার অপেক্ষা।