ড. ইউনূসের কূটনীতিতে বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশের বিশ্বসংযোগ
ড. ইউনূসের কূটনীতিতে বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশের বিশ্বসংযোগ
editor
প্রকাশিত মে ২৮, ২০২৫, ১০:০৩ পূর্বাহ্ণ
Manual8 Ad Code
প্রজন্ম ডেস্ক:
চব্বিশের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস তার কূটনৈতিক সুনামকে কাজে লাগিয়ে এ দেশের মসৃণ পরিবর্তনের গতিশীলতাকে সামলে যাচ্ছেন নিপুণভাবে। তিনি তার ভারসাম্যপূর্ণ ও বহুমুখী কূটনীতি দিয়ে বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতিতে উন্মোচন করেছেন এক নতুন দিগন্ত।
বিশ্লেষকরা একে বলছেন ‘৩৬০ ডিগ্রি কূটনীতি’, যেখানে পূর্ব-পশ্চিম, উত্তর-দক্ষিণ, সবদিকেই ছড়িয়েছে তার কূটনৈতিক উদ্যোগ। তারা বলেছেন, ঐতিহ্যগত মিত্রদের পাশাপাশি নতুন জোট গড়ে তোলা হচ্ছে। লক্ষ্য জাতীয় স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং আন্তর্জাতিক বিশ্বে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করা।
প্রথম সাফল্য: সংযুক্ত আরব আমিরাতে বাংলাদেশিদের ক্ষমা
অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সাফল্য আসে সংযুক্ত আরব আমিরাতে। ছাত্র আন্দোলনের পক্ষে বিক্ষোভে অংশ নেওয়ায় শতাধিক বাংলাদেশি শ্রমিককে সাজার আদেশ দিয়েছিলেন দেশটির আদালত। তবে প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস ও আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সরাসরি আলোচনার পর তাদের মুক্তি দেওয়া হয়।
পশ্চিমা বিশ্বে দৃঢ় বার্তা
ড. ইউনূস আন্তর্জাতিক কূটনীতিক হিসেবে তার আত্মপ্রকাশ ঘটান ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের ৭৯তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে। সেখানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেন। বাইডেনের সঙ্গে বৈঠকের পর ক্লিনটন গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে অংশ নেন ড. ইউনূস। সেখানে তিনি তার দীর্ঘদিনের মিত্র সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বৈঠকে উভয়েই সামাজিক ব্যবসা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা করেন। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি পাকিস্তান, কানাডা ও ইতালির প্রধানমন্ত্রী, ব্রাজিল ও মরিশাসের প্রেসিডেন্ট, বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনার ভলকার টুর্কের সঙ্গে বৈঠক করেন।
আন্তর্জাতিক সমর্থনের সূচনা: মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর ঢাকা সফর
গত অক্টোবরের শুরুতে প্রথম বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম ঢাকা সফর করেন। এটি বহির্বিশ্বে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি দৃঢ় সমর্থনের বার্তা দেয়। গত বছরের ৪ অক্টোবর ৫৮ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল নিয়ে ঢাকায় আসেন আনোয়ার ইব্রাহিম। দলটিতে বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও শিল্প, পররাষ্ট্র, পরিবহন এবং ধর্মবিষয়ক উপমন্ত্রীসহ সংসদ সদস্যরাও ছিলেন। এর দুই মাস পর তিমুর লেস্তের প্রেসিডেন্ট রামোস-হোর্তা প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ সফর করেন এবং বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে যোগ দেন।
Manual6 Ad Code
জলবায়ু কূটনীতিতে ‘থ্রি জিরো’ তত্ত্ব
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস ২০২৪ সালের নভেম্বরে আজারবাইজানের বাকুতে অনুষ্ঠিত কপ২৯ জলবায়ু সম্মেলনে অংশগ্রহণ করে ন্যায়ভিত্তিক নেতৃত্ব ও টেকসই উন্নয়নের পক্ষে বৈশ্বিক কণ্ঠস্বর হিসেবে তার অবস্থান আরও সুদৃঢ় করেন। সম্মেলনে তিনি বিশ্বনেতাদের সামনে একটি নতুন সাহসী বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন ‘থ্রি জিরো’ নামে। তিনি ২০টিরও বেশি রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের সঙ্গে বৈঠক করেন। এর মধ্যে ছিলেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান, সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান এবং পাকিস্তান, ভুটান, নেপাল, মালদ্বীপ, বেলজিয়াম, ঘানার প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট। একই সম্মেলনে স্বল্পোন্নত দেশগুলোবিষয়ক (এলডিসি) উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠকে জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসের সঙ্গে দেখা করেন। পরে ড. ইউনূস সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টেরেসা মে, ব্রাজিলের ভাইস প্রেসিডেন্টের স্ত্রী লু আলকমিন এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) ও ফিফাপ্রধানদের সঙ্গেও মতবিনিময় করেন।
Manual3 Ad Code
ঢাকায় ইউনূসের সঙ্গে ইইউর ২৭ রাষ্ট্রদূতের ঐতিহাসিক বৈঠক
নজিরবিহীন কূটনৈতিক উদ্যোগের অংশ হিসেবে ২০২৪ সালের ৯ ডিসেম্বর ঢাকায় প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে ঢাকা ও নয়াদিল্লিতে নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ২৭ সদস্যরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত একযোগে বৈঠক করেন। ঢাকায় যেখানে মাত্র সাতজন ইইউ রাষ্ট্রদূত নিযুক্ত আছেন, সেখানে নয়াদিল্লি থেকে ২০ জন রাষ্ট্রদূতের অংশগ্রহণ আয়োজনটিতে ব্যতিক্রমী ও তাৎপর্যপূর্ণ মাত্রা যোগ করে।
দাভোসে উজ্জ্বল ইউনূস
চলতি বছরের জানুয়ারিতে সুইজারল্যান্ডের দাভোসে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) বার্ষিক সম্মেলনে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অংশগ্রহণ অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য ছিল আরেকটি গৌরবময় অর্জন। সম্মেলনের পাশাপাশি অধ্যাপক ইউনূস সেখানে ৪৭টি আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক কর্মসূচিতে অংশ নেন এবং বেশ কয়েকজন বিশ্বনেতার সঙ্গে বৈঠক করেন। সে সময় তিনি বৈঠক করেন জার্মান চ্যান্সেলর ওলাফ শলৎস, জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস, ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন এবং টিমর-লেস্টে, মালয়েশিয়া, ফিনল্যান্ড ও থাইল্যান্ডের রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে।
জাতিসংঘ মহাসচিবের ঢাকা সফর
চলতি বছরের ১৩ থেকে ১৬ মার্চ জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস বাংলাদেশ সফর করেন। গুতেরেসের সফরের মূল প্রেক্ষাপট ছিল রোহিঙ্গাদের প্রতি সংহতি এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও বৈশ্বিক মানবিক সহযোগিতায় বাংলাদেশের নেতৃত্বের ক্রমবর্ধমান ভূমিকার স্বীকৃতি। জাতিসংঘ কর্মকর্তারা একে ‘সংহতি মিশন’ হিসেবে অভিহিত করেন।
চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার
এ বছরের ২৮ মার্চ বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সেখানে তাকে সম্মান জানাতে কার্যালয় থেকে বেরিয়ে এসে নিজে অভ্যর্থনা জানান চীনা প্রেসিডেন্ট। বৈঠকে প্রেসিডেন্ট শি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেন এবং দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা আরও বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেন। দুই নেতার মধ্যে আঞ্চলিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। এর মধ্যে ছিল নদী ব্যবস্থাপনা ও রোহিঙ্গা সংকট। ড. ইউনূস বাংলাদেশের জন্য একটি ৫০ বছরের সমন্বিত নদী ও পানি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা প্রণয়নে চীনের সহায়তা চান।
Manual1 Ad Code
বিমসটেকের নেতৃত্ব গ্রহণ
২০২৫ সালের এপ্রিলে ব্যাংককে অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস।
বিমসটেক সম্মেলনে মোদি-ইউনূসের প্রথম বৈঠক
এটিই ছিল ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ-ভারত প্রথম উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক সংলাপ। বৈঠকে অধ্যাপক ইউনূস তার সরকারের পক্ষ থেকে ভারতের কাছে বহিষ্কৃত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরত পাঠানোর অনুরোধের বিষয়টি উত্থাপন করেন। একই সঙ্গে তিনি গঙ্গা পানিচুক্তি নবায়ন ও তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তি দ্রুত সম্পন্ন করতে আলোচনার আহ্বান জানান।
পাশাপাশি ইউনূস থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী পেতংতার্ন সিনাওয়াত্রার সঙ্গেও দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন। এ ছাড়া সম্মেলনের ফাঁকে ইউনূস শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী হারিনিয়া আমারাসুরিয়া, ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগে এবং বিমসটেক মহাসচিব ইন্দ্র মণি পান্ডের সঙ্গে আলাদা বৈঠক করেন। এসব বৈঠকে তিনি বাংলাদেশের আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন।
ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির পথে বাংলাদেশ
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতার লক্ষ্য বাংলাদেশকে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অঙ্গনে গঠনমূলক, ভারসাম্যপূর্ণ এবং সক্রিয় অংশগ্রহণকারী রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার পাশাপাশি বড় পরাশক্তিদের সঙ্গে গঠনমূলক অংশীদারত্ব গড়ে তুলে বাংলাদেশে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সুযোগ বাড়াতে চান অধ্যাপক ইউনূস।
আরব বিশ্বের সঙ্গে সংলাপ
Manual7 Ad Code
কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল-থানির আমন্ত্রণে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস চার দিনের সরকারি সফরে দোহা যান। সে সময় তিনি কাতারের কাছ থেকে বাংলাদেশের পুনর্গঠনে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস পান।
জাপানে কৌশলগত সফর
বাংলাদেশের বৈশ্বিক অংশীদারত্ব নতুনভাবে সাজানোর অংশ আজ বুধবার থেকে শনিবার পর্যন্ত চার দিনের সরকারি সফরে থাকবেন ড. ইউনূস। আগামী শুক্রবার তিনি জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিগেরু ইশিবার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন। বৈঠকের মূল লক্ষ্য, বাংলাদেশের বাজেট ঘাটতি মোকাবিলায় ১০০ কোটি মার্কিন ডলারের সহজ শর্তে ঋণ নিশ্চিত করা। এই সফরে সাতটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হবে। দ্বিপক্ষীয় কূটনীতির পাশাপাশি ইউনূস অংশ নেবে ৩০তম নিক্কেই ফোরামেও। সেখানে তিনি লাওস ও পালাউয়ের প্রেসিডেন্ট এবং জাপান ও কম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রীসহ বেশ কয়েকজন বিশ্বনেতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। মূলত আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নীতিনির্ধারণে বাংলাদেশ আবারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় ফেরার ইঙ্গিত দেবে অধ্যাপক ইউনূসের এ সফরের মাধ্যমে।
অর্থনৈতিক কূটনীতিতে দৃশ্যমান সাফল্য
অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অর্থনৈতিক কূটনীতির অন্যতম বড় সাফল্য ছিল এ বছর ঢাকায় ‘বাংলাদেশ গ্লোবাল ইনভেস্টমেন্ট সামিট’-এর সফল আয়োজন। এই আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সম্মেলনে অংশ নেন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান ও উপসাগরীয় অঞ্চলের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা। এ ছাড়া বৈশ্বিক করপোরেট প্রতিষ্ঠান, পুঁজিপতি ও উন্নয়ন অর্থায়ন সংস্থার শীর্ষ নির্বাহীরাও এতে যোগ দেন।