সরকার পতনের ২৭ দিনের মাথায় পদত্যাগ করেন জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী। গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর তিনি রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের কাছে পদত্যাগপত্র পাঠান। কিন্তু সংসদের ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট শামসুল হক টুকুর অবস্থান কী তা নিয়ে এখনও ধোঁয়াশা রয়ে গেছে। সরকার পতনের কয়েক দিন পর একটি হত্যা মামলায় গ্রেফতার হয়ে বর্তমানে তিনি কারাগারে রয়েছেন। তবে সংসদের ডেপুটি স্পিকার হিসেবে এখনও বহাল আছেন কি না তা পরিষ্কারভাবে কেউ কিছু না বললেও জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের নতুন ওয়েবসাইটে ‘কী পারসন অব বাংলাদেশ পার্লামেন্ট’ এ ডেপুটি স্পিকার হিসেবে শামসুল হক টুকুর নাম ও ছবি রয়েছে। তা ছাড়া তার দায়িত্ব পালনের সময়কাল ৩০ জানুয়ারি-২০২৪ থেকে কত দিন পর্যন্ত তা ফাঁকা রাখায় তিনি এখনও তার স্বপদে বহাল রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। ফলে ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নতুন এমপিদের শপথ ডেপুটি স্পিকার নাকি সিইসি পড়াবেন তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের মধ্যেও।
একাধিক কর্মকর্তা জানান, হত্যা মামলায় জেলে থাকলেও পদত্যাগ না করায় ডেপুটি স্পিকার এখনও স্বপদে বহাল রয়েছেন। সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় সংসদের ওয়েব সাইটের কী পারসন অব বাংলাদেশ পার্লামেন্টে ডেপুটি স্পিকার হিসেবে তার নাম ও ছবি শোভা পাচ্ছে। তবে হোম পেজে প্রধান উপদেষ্টা, সংসদ কাজে দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল ও সংসদ সচিব কানিজ মাওলার ছবি শোভা পাচ্ছে। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পড়ানোর দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে তাকে। কারণ তার বিরুদ্ধে এখনও কোনো মামলার রায় হয়নি বা কোনো মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হননি। ফলে সরকার চাইলে তিনি স্পিকারের পদ শূন্য থাকায় ডেপুটি স্পিকার হিসেবে নিয়ম অনুযায়ী প্যারোলে মুক্ত হয়ে নতুন এমপিদের শপথ পড়াতে পারবেন।
সংসদ সচিবালয়ের একজন সাবেক কর্মকর্তা বলেন, নিয়ম অনুযায়ী স্পিকার না থাকলে ডেপুটি স্পিকার নতুন সংসদের এমপিদের শপথ পড়াবেন। এ ছাড়া সংসদের প্রথম অধিবেশনের শুরুতে তিনি সভাপতি হিসেবে সংসদ পরিচালনা করে নতুন স্পিকার নির্বাচন সম্পন্ন করবেন। এর পরই নতুন স্পিকার দায়িত্ব নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ডেপুটি স্পিকারের দায়িত্বের অবসান হবে। তবে সরকার যদি ডেপুটি স্পিকারকে প্যারোলে এনে শপথ পড়ানোর সুযোগ না দেন তা হলে সংবিধান অনুযায়ী সিইসি নতুন এমপিদের শপথ পড়াবেন।
Manual4 Ad Code
কারণ সংবিধানের ১৪৮-এর ২(ক) ও ১২৩ অনুচ্ছেদের (৩) দফায় বলা হয়েছে, ‘সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচনের ফল সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপিত হইবার তারিখ হইতে পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে এই সংবিধানের অধীন এতদুদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা তদুদ্দেশ্যে অনুরূপ ব্যক্তি কর্তৃক নির্ধারিত অন্য কোনো ব্যক্তি যেকোনো কারণে নির্বাচিত সদস্যদের শপথ পাঠ পরিচালনা করিতে ব্যর্থ হইলে বা না করিলে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার উহার পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে উক্ত শপথ পাঠ পরিচালনা করিবেন, যেন এই সংবিধানের অধীন তিনিই ইহার জন্য নির্দিষ্ট ব্যক্তি।’ এরপর ৩০ দিনের মধ্যে অধিবেশন ডাকতে হয়। তবে ভোটের কত দিনের মধ্যে গেজেট হবে, সে বিষয়ে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
Manual1 Ad Code
সংশ্লিষ্টরা জানান, গত বছরের ১৮ নভেম্বর ‘জাতীয় সংসদ সচিবালয় (অন্তর্বর্তীকালীন বিশেষ বিধান) অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে সংসদ সচিবালয় পরিচালনার ক্ষেত্রে স্পিকারের প্রশাসনিক, আর্থিক ও অন্যান্য দায়িত্ব ও ক্ষমতা দেওয়া হয় আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টাকে। এতে বলা হয়, জাতীয় সংসদ সচিবালয় আইন, ১৯৯৪ ও এর অধীনে প্রণীত বিধিমালা এবং নীতিমালায় যা কিছুই থাকুক না কেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের স্পিকার তার দায়িত্বভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা হিসেবে উক্ত আইনের অধীন সংসদ সচিবালয় পরিচালনার ক্ষেত্রে স্পিকারের প্রশাসনিক, আর্থিক ও অন্যান্য দায়িত্ব ও ক্ষমতা (সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭৪ অনুযায়ী সংসদ কার্য সংক্রান্ত দায়িত্ব ব্যতীত) সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা পালন ও প্রয়োগ করতে পারবেন। ফলে অধ্যাদেশ অনুযায়ী আইন উপদেষ্টা স্পিকারের প্রশাসনিক, আর্থিক ও অন্যান্য দায়িত্ব ও ক্ষমতা পালন করতে পারলেও এমপিদের শপথ পড়ানো বা প্রথম অধিবেশনে স্পিকার নির্বাচন পরিচালনা করতে পারবেন না। এ দায়িত্ব পালনের সুযোগ পাবেন ডেপুটি স্পিকার। এ বিষয়ে সংসদ সচিবালয়ের কোনো কর্মকর্তা কথা বলতে রাজি হননি।
প্রসঙ্গত, বিগত সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ৫ আগস্ট গণআন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করে দেশ ছাড়লে আওয়ামী লীগের টানা ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। পরদিন সংসদ ভেঙে দেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। সংবিধানের নিয়ম অনুযায়ী সংসদ ভেঙে দেওয়া হলেও স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের পদ তাৎক্ষণিভাবে শূন্য হয় না। পরবর্তী স্পিকারের শপথ পর্যন্ত তারা দায়িত্বে থেকে যান। তবে সেই সময় পর্যন্ত অপেক্ষা না করে পদত্যাগ করেছেন স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী। সরকার পতনের পর আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের প্রায় সবাই আত্মগোপনে চলে যান। সাবেক মন্ত্রী-এমপিদের কেউ কেউ গ্রেফতার হন। তবে শিরীন শারমিন চৌধুরী আর প্রকাশ্যে আসেননি। ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের শপথ অনুষ্ঠানেও তিনি যাননি। বিগত সরকারের প্রভাবশালী কয়েকজনসহ কয়েকশ মানুষ ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর প্রাণভয়ে সেনাবাহিনীর কাছে আশ্রয় নিয়েছিল। তাদের মধ্যে কয়েকজনকে পরে পুলিশে সোপর্দ করা হয়। পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে অনেকে নিজে থেকে চলে যান। আত্মগোপনে থাকা অবস্থাতেই স্পিকার তার পাসপোর্ট নবায়ন করেন। এ নিয়ে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়।
অন্যদিকে সরকারের পতনের ১০ দিনের মাথায় ১৫ আগস্ট গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের খিলক্ষেত থানাধীন নিকুঞ্জ আবাসিক এলাকা থেকে আত্মগোপনে থাকাবস্থায় টুকুকে গ্রেফতার করা হয়। তাকে পল্টন থানায় রুজুকৃত মামলার প্রেক্ষিতে গ্রেফতার দেখানো হয়।