কয়লা তোলার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। এতে পরিবেশবাদী এবং খনি এলাকার মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সরকার মনে করছে, জ্বালানি সংকট মোকাবিলার অন্যতম ক্ষেত্র হচ্ছে দেশীয় কয়লা উত্তোলন। অন্যদিকে পরিবেশবাদী এবং খনি এলাকার মানুষ মনে করছে, এতে বিপুল পরিমাণ মানুষ যেমন উচ্ছেদ হবে, ঠিক একইভাবে খনি এলাকার প্রাণ ও প্রকৃতি ধ্বংস হবে।
দেশে তীব্র জ্বালানি সংকট চলছে। ব্যবহৃত জ্বালানির অন্তত ৭০ ভাগ আমদানিনির্ভর। বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, প্রাপ্যতা এবং ডলার সংকটে জ্বালানির জোগান নিশ্চিতে সরকার হিমশিম খাচ্ছে। দেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি উৎপাদন এককভাবে গ্যাসনির্ভর। কিন্তু গত ১০ বছরে স্থলভাগের গ্যাসের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে শুরু করেছে। দেশে আর কোনো বড় খনি পাওয়ার আশাও দেখছে না পেট্রোবাংলা। এই পরিস্থিতিতে গ্যাসের ওপর চাপ কমাতে সরকার কয়লাকে প্রাধান্য দিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে দেশীয় কয়লাখনির উত্তোলন বৃদ্ধির কথা বলা হচ্ছে।
জ্বালানি বিভাগের একজন অতিরিক্ত সচিব বলেন, কয়লা তোলার বিষয়ে সরকার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিলেও এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো কাজ শুরু হয়নি। সম্প্রতি জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বড়পুকুরিয়ায় গিয়েছিলেন। এর উত্তরে খনি সম্প্রসারণের বিষয়ে আগে থেকেই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আমরা এখন জমি অধিগ্রহণের বিষয়ে আলোচনা করছি। তবে এখানে বড় সমস্যা হচ্ছে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক মানুষের কাছ থেকে প্রভাবশালীরা সব জমি কিনে নিয়েছেন। এখন তারা সরকারের কাছে তিনগুণ দামে এই জমি বিক্রি করবে।
পেট্রোবাংলার ২০২১ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে কয়লার মোট মজুদ প্রায় ৭ দশমিক ৮২ বিলিয়ন মেট্রিক টন। তবে মজুদের পুরোটা উত্তোলনযোগ্য নয়। ধারণার ওপর ভিত্তি করে উত্তোলনযোগ্য কয়লা কতটুকু তা নিয়ে নানা সময়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য দিয়েছে পেট্রোবাংলা। আবার উন্মুক্ত খনন না ভূগর্ভস্থ খনি পদ্ধতির কোন প্রক্রিয়ায় উত্তোলন করা হবে, তা নির্ধারণ হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ, পেট্রোবাংলা এবং বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি কোম্পানির কর্মকর্তারা বলছেন, এখনো সমীক্ষাই হয়নি অনেক জায়গার।
এমনকি ২০১৬ সাল থেকে দেশের একমাত্র কয়লাখনি বড়পুকুরিয়ার উত্তরে একটি উন্মুক্ত খনি করা যায় কি না, সেই আলোচনা চলছে। কিন্তু এখনো বড়পুকুরিয়া খনি কোম্পানি উন্মুক্ত খনি সম্ভব কি না, সে বিষয়ে সমীক্ষাই শেষ করতে পারেনি।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংসদ সদস্য সাবিকুন নাহারের এক প্রশ্নের জবাবে জানান, দেশের জ্বালানি চাহিদা পূরণ ও বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ে ফুলবাড়ীর উচ্চমানের কয়লা উত্তোলনের বিষয়টি সরকারের বিবেচনায় রয়েছে। এ ধরনের কোনো প্রকল্প নেওয়ার আগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের যথাযথ পুনর্বাসন নিশ্চিত করার আশ্বাস দেন তিনি। গত ২ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য ধরে জ্বালানি বিভাগ এবং পেট্রোবাংলায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আনুষ্ঠানিক কোনো প্রক্রিয়াই শুরু করেনি সরকার। তবে এর মধ্যে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বড়পুকুরিয়া খনি এলাকা পরিদর্শন করেন।
অন্যদিকে জাতীয় সংসদে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে ৬৮ বিধির আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গত ৭ সেপ্টেম্বর জানান, বড়পুকুরিয়ার দেশীয় কয়লা ব্যবহার করে ৬০০ মেগাওয়াটের একটি নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সবকিছু মিলিয়ে সরকার কয়লা উত্তোলনের বিষয়ে নীতিগতভাবে সম্মত বলে মনে করা হচ্ছে।
পেট্রোবাংলা তাদের প্রকাশিত বিভিন্ন সময়ের প্রতিবেদনে বলেছে, দেশে মোট ৫টি কয়লাখনি আছে। এই খনিগুলো দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া, ফুলবাড়ী ও দিঘীপাড়া, রংপুরের খালাসপীর এবং জয়পুরহাট ও নওগাঁ জেলার জামালগঞ্জ কয়লাখনি। এর মধ্যে একমাত্র বড়পুকুরিয়া থেকে ভূগর্ভস্থ পদ্ধতিতে কয়লা তোলা হচ্ছে। প্রতিদিন এক থেকে তিন হাজার টন কয়লা তোলা হয়। এই কয়লা দিয়ে বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনা করা হয়। তবে এই খনির কয়লা দিয়ে বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৫৩৪ মেগাওয়াটের কেন্দ্র একসঙ্গে চালানো সম্ভব হয় না। নতুন করে এখানে কয়লা তোলা না হলে কোনো কেন্দ্র নির্মাণ করা সম্ভব নয় বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশে কয়লা তোলার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে খনির গভীরতা। হাইড্রোকার্বন ইউনিটের প্রতিবেদনে দেখা যায়, বড়পুকুরিয়ার খনিতে কয়লা রয়েছে ১১৮ থেকে ৫০৯ মিটার গভীরতায়। ফুলবাড়ীতে ১৫০ থেকে ২৭০ মিটার, খালাসপীরে ২৩৯ থেকে ৪৮৫ মিটার গভীরতায়, জামালগঞ্জে ৬৪০ থেকে ১ হাজার ১৫৮ মিটার এবং দীঘিপাড়ায় ৩২০ থেকে ৫০৬ মিটার গভীরতায় কয়লা রয়েছে। এত গভীরতায় উন্মুক্ত খনন করতে হলে বিপুল পরিমাণ জমি অধিগ্রহণ করতে হবে। এখানে ফসলি জমির পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানির উৎসের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে।
জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন ভূঁইয়া বলেন, ‘আমাদের গ্যাসের মজুদ ফুরিয়ে আসছে। এখন আমাদের খনিজের মধ্যে রয়েছে কয়লা। আমাদের একটি বাস্তবসম্মত সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা থাকতে হবে। সবার আগে একটি গ্রহণযোগ্য সমীক্ষা প্রয়োজন। ওই এলাকা থেকে খনন করার সময়জুড়ে কী পরিমাণ ফসল পাওয়া যাবে। একই সঙ্গে কী পরিমাণ কয়লা পাওয়া যাবে। দুটোর হিসাবে যদি মনে হয় কয়লা বেশি পাওয়া যাবে, তাহলে কেন আমরা কয়লা তুলব না। কিন্তু সবার আগে ওই এলাকার মানুষের মতামত নিতে হবে। তাদের সঙ্গে আলোচনা করে এই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তিনি বলেন, আমাদের গ্যাস ২০৩০ সালের পর শেষ হয়ে যাবে। এরপর যদি কয়লা দিয়ে আরও ২০ বছর চালানোর চেষ্টা করা যেতে পারে। এই সময়ে আমাদের নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে যাওয়ার একটি পথ বের করতে হবে। কয়লাখনি করার পর ওই এলাকা যদি আবার মাটি দিয়ে ভরে দেওয়া যায়, তাহলে কয়েক বছরের মধ্যে আবার ফসল ফলানো সম্ভব হতে পারে।
Manual5 Ad Code
বিগত বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সময় কয়লা প্রকল্প ঘিরে রক্তাক্ত সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে ২০০৬ সালে উত্তাল হয়ে উঠেছিল দিনাজপুরের ফুলবাড়ী। ওই বছরের ২৬ আগস্ট এশিয়া এনার্জির প্রস্তাবিত কয়লা প্রকল্পের বিরুদ্ধে স্থানীয় মানুষের বিশাল সমাবেশে তৎকালীন বিডিআর (বর্তমান বিজিবি) গুলি চালালে তিনজন নিহত হন। আহত হন অন্তত দুই শতাধিক আন্দোলনকারী। ওই ঘটনার পর ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে ফুলবাড়ীর বাইরেও। পার্শ্ববর্তী পার্বতীপুর, বিরামপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলন তীব্র রূপ নেয়। শেষ পর্যন্ত টানা বিক্ষোভ ও জনরোষের মুখে ওই বছরের ৩০ আগস্ট আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সমঝোতায় আসে তৎকালীন সরকার। স্বাক্ষরিত হয় বহুল আলোচিত ‘ফুলবাড়ী চুক্তি’, যার মাধ্যমে ফুলবাড়ীর কয়লা প্রকল্প নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
চুক্তিতে মোট ছয়টি ধারা উল্লেখ করা হয়। ফুলবাড়ীতে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন করা যাবে না, এশিয়া এনার্জির সঙ্গে করা চুক্তি বাতিল করতে হবে; এশিয়া এনার্জিকে ফুলবাড়ী থেকে প্রত্যাহার করতে হবে; কয়লাখনি প্রকল্পের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে; আন্দোলনে নিহত ও আহতদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ দিতে হবে এবং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার ও গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মুক্তির ব্যবস্থা করতে হবে। বিএনপি সেই চুক্তি বাস্তবায়ন করে। এরপর আওয়ামী লীগ এবং অন্তর্বর্তী সরকারও কয়লা তোলার চেষ্টা করেনি।
ফুলবাড়ী ট্র্যাজেডির ২০ বছর পর ফের ফুলবাড়ী থেকেই কয়লা তোলার বিষয়ে তৎপরতা শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঘোষণার পর সংবাদ সম্মেলন করে উদ্বেগ জানিয়েছে ফুলবাড়ীর সাধারণ মানুষ। তারা সরকারের এই উদ্যোগ প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়েছেন। গত ৫ সেপ্টেম্বর ফুলবাড়ীতে তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি এবং স্থানীয়রা মিছিল ও সমাবেশ করেছে। ওই সমাবেশ থেকে বলা হয়েছে, উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের উদ্যোগ নিলে আবার বৃহত্তর গণআন্দোলন হবে।
তেল, গ্যাস, বন্দর, বিদ্যুৎ রক্ষা কমিটির দিনাজপুরের ফুলবাড়ীর আহ্বায়ক সৈয়দ সাইফুল ইসলাম জুয়েল বলেন, ফুলবাড়ীতে তারা সমাবেশ এবং সংবাদ সম্মেলন করার পর সরকারের কেউ তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। সাধারণ মানুষ নিজেদের উদ্বেগ নিয়ে পরস্পর আলোচনা করছে। আগামী অক্টোবর মাসে আবার একটি কর্মসূচি পালন করার কথা ভাবা হচ্ছে। তিনি বলেন, ফুলবাড়ী খনি করতে হলে অন্তত ১ লাখ পরিবারকে পুনর্বাসন করতে হবে। ফুলবাড়ীতে উন্মুক্ত খনি করতে ৬৭ বর্গকিলোমিটার বা প্রায় ১৬ হাজার ৫৫৬ একর জমি অধিগ্রহণ করতে হবে।
Manual5 Ad Code
দীর্ঘদিন ফুলবাড়ী কয়লা আন্দোলন করে আসা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তানজিমউদ্দিন খান বলেন, কয়লা উত্তোলন করলে পরিবেশের কী ক্ষতি হবে, এ বিষয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। ইতিমধ্যে বিষয়টি নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে। তিনি বলেন, উত্তরবঙ্গ হচ্ছে আমাদের শস্যভা-ার। গোটা বছরের খাদ্যের জোগানের অনেকটাই আসে এই অঞ্চল থেকে। আমাদের শস্যভান্ডার, পরিবেশ সবকিছু জলাঞ্জলি দিয়ে কি আমরা কয়লা তুলব? এমন প্রশ্ন করে তিনি বলেন, নাম ও পরিচয় পরিবর্তন হলেও ফুলবাড়ীতে কয়লা উত্তোলনের উদ্যোগের পেছনে এখনো সেই এশিয়া এনার্জি বা জিএসএমেরই স্বার্থ রয়েছে বলে আমার ধারণা।