দুই মাস পর শিল্পে বাড়লো গ্যাসের চাপ, স্বস্তি ফিরছে কারখানায়
দুই মাস পর শিল্পে বাড়লো গ্যাসের চাপ, স্বস্তি ফিরছে কারখানায়
editor
প্রকাশিত সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৬, ০৮:২৯ পূর্বাহ্ণ
Manual6 Ad Code
Manual5 Ad Code
প্রজন্ম ডেস্ক:
প্রায় দুই মাসের তীব্র সংকটের পর শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহে কিছুটা উন্নতি হয়েছে। বিশেষ করে বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকে গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জসহ কয়েকটি প্রধান শিল্পাঞ্চলের অধিকাংশ কারখানায় গ্যাসের চাপ আগের তুলনায় বেড়েছে। কোথাও কোথাও গ্যাস সরবরাহ প্রায় স্বাভাবিক পর্যায়ে পৌঁছেছে। একইসঙ্গে কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতিরও উন্নতি হয়েছে।
তবে শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, সংকট পুরোপুরি কেটে গেছে—এমনটা এখনই বলা যাচ্ছে না। সব শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের চাপ একইভাবে বাড়েনি। কোথাও সরবরাহে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হলেও কিছু এলাকায় এখনও চাপ কম। ফলে বুধবারের উন্নতিকে শিল্প খাতের জন্য তাৎক্ষণিক স্বস্তি হিসেবে দেখা হলেও, এটিকে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে দেখছেন না উদ্যোক্তারা।
বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক ও বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, “আজ বুধবার সকাল থেকেই গ্যাস সরবরাহ অনেকটা স্বাভাবিক হয়েছে। সংকট পুরোপুরি কেটে গেছে বলা না গেলেও গত দুই মাস ধরে চলা যে অচলাবস্থা ছিল, সেটি অনেকটা কেটে গেছে। এতে শিল্প উদ্যোক্তারা কিছুটা স্বস্তি বোধ করছেন।”
তিনি বলেন, ‘‘হঠাৎ করে এ ধরনের জ্বালানি সংকট তৈরি হলে শিল্পকারখানার উৎপাদন পরিকল্পনা বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে। তাই শুধু বর্তমান সংকট সামাল দিলেই হবে না, ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতির জন্য কীভাবে প্রস্তুত থাকা যায়, সে বিষয়েও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে।’’
মহিউদ্দিন রুবেলের ভাষায়, শিল্পকারখানা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে গ্যাস সরবরাহের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। কারণ জ্বালানি সরবরাহ অনিশ্চিত হলে শুধু একটি দিনের উৎপাদন ব্যাহত হয় না; এর প্রভাব পড়ে উৎপাদন খরচ, শ্রমঘণ্টা, রফতানি, ক্রেতার আস্থা এবং নতুন বিনিয়োগের ওপরও।
গাজীপুরে বেড়েছে গ্যাসের চাপ
বুধবার গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাসের চাপ ও বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতির খবর পাওয়া গেছে। এতে জেলার বিভিন্ন শিল্পকারখানায় উৎপাদন কার্যক্রমে স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছে।
গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি সরেজমিন দেখতে এবং শিল্পকারখানার উৎপাদন পরিস্থিতি জানতে বুধবার জেলার কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ-গ্যাস সরবরাহ কেন্দ্র পরিদর্শন করেন গাজীপুরের জেলা প্রশাসক নুরুল করিম ভূঁইয়া। তিনি স্প্যারো ফ্যাশন, ডিবিএল গার্মেন্টস, পল্লী বিদ্যুতের জয়দেবপুর গ্রিড এবং তিতাসের আঞ্চলিক বিপণন কেন্দ্র পরিদর্শন করেন।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে তিনি গ্যাসের চাপ, বিদ্যুৎ সরবরাহ, লোডশেডিং এবং শিল্পকারখানার উৎপাদন পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজ নেন।
সম্প্রতি গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়া এবং বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছিল। উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি বাড়ছিল বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের খরচ। একইসঙ্গে নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল।
সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গাজীপুরের শিল্পকারখানায় গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর বিপরীতে সংকটের সময়ে সরবরাহ ছিল প্রায় ২৬০ মিলিয়ন ঘনফুট। বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুটে উন্নীত হয়েছে।
অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় এখনও ঘাটতি রয়েছে, তবে সংকটের সবচেয়ে খারাপ সময়ের তুলনায় সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এ কারণেই বুধবার থেকে অনেক কারখানায় উৎপাদন পরিস্থিতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে।
নারায়ণগঞ্জেও স্বস্তির খবর
Manual7 Ad Code
গাজীপুরের পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন কারখানাতেও গ্যাসের চাপ আগের তুলনায় বেড়েছে বলে জানিয়েছেন শিল্প মালিকরা। তবে সব কারখানা বা সব এলাকায় পরিস্থিতি একই নয়।
কারখানা মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কিছু এলাকায় গ্যাসের চাপ বেড়ে উৎপাদন প্রায় স্বাভাবিক হয়েছে। আবার কিছু এলাকায় এখনও চাপ প্রয়োজনের তুলনায় কম। ফলে শিল্প খাতে এখন মূল প্রত্যাশা হচ্ছে—সরবরাহ বৃদ্ধির এই ধারা যেন স্থায়ী হয়।
বিজিএমইএ’র সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, ‘‘বিগত প্রায় দুই মাস পর কারখানাগুলোতে আগের চেয়ে গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বেড়েছে। তবে সব অঞ্চলে বেড়েছে এমনটি নয়। দীর্ঘদিন পর গ্যাসের সরবরাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় শিল্প উদ্যোক্তারা কিছুটা স্বস্তি বোধ করছেন।’’
তার বক্তব্যেও স্পষ্ট, শিল্প খাতের স্বস্তি মূলত সাময়িক সরবরাহ বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে। এখন উদ্যোক্তাদের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এই সরবরাহ কতটা স্থায়ী হবে এবং সব শিল্পাঞ্চলে সমানভাবে গ্যাসের চাপ নিশ্চিত করা যাবে কিনা।
দুই মাসের সংকটে উৎপাদনে বড় ধাক্কা
গত ২১ জুলাই মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটি ও অগ্নিকাণ্ডের পর দেশে গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়। এর প্রভাব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে শিল্পাঞ্চলগুলোতে। গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, আশুলিয়া, নরসিংদী ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন শিল্পকারখানা দীর্ঘ সময় ধরে কম গ্যাসের চাপ এবং বিদ্যুৎ সংকটে ভুগেছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গ্যাসনির্ভর নিটিং, ডাইং, টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাক শিল্প। কোথাও উৎপাদন এক-তৃতীয়াংশে নেমেছে, কোথাও অর্ধেকের কাছাকাছি কমেছে।
বিকেএমইএ’র সক্রিয় সদস্য কারখানার প্রায় ২০ শতাংশের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি একটি সারসংক্ষেপে দেখা গেছে, অংশ নেওয়া কারখানাগুলোর প্রায় ৯০ শতাংশ বিদ্যুৎ সংকটে এবং ৭৫ শতাংশ গ্যাস সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার কথা জানিয়েছে।
যেসব কারখানা গ্যাসের চাপের তথ্য দিয়েছে, তাদের হিসাবে স্বাভাবিক চাহিদার তুলনায় গ্যাস সরবরাহে গড়ে প্রায় ৭৮ শতাংশ ঘাটতি ছিল। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময়ও আগের তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেড়েছিল।
এর প্রভাব পড়েছে সরাসরি উৎপাদনে। জরিপ অনুযায়ী, নিটিং উৎপাদন গড়ে প্রায় ৩৮ শতাংশ, তৈরি পোশাক প্রায় ৪০ শতাংশ এবং ডাইং উৎপাদন প্রায় ৫১ শতাংশ কমেছে।
শুধু উৎপাদন নয়, বাড়ছে ব্যবসার ঝুঁকিও
গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের সবচেয়ে বড় ক্ষতি শুধু উৎপাদন কমে যাওয়া নয়। উৎপাদন কমার সঙ্গে সঙ্গে শ্রমঘণ্টার অপচয়, বিকল্প জ্বালানির বাড়তি খরচ এবং শিপমেন্ট বিলম্বের মতো সমস্যা তৈরি হয়েছে।
জরিপে প্রায় ৯২ শতাংশ প্রতিষ্ঠান বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারে অতিরিক্ত খরচের কথা জানিয়েছে। একই সংখ্যক প্রতিষ্ঠান শ্রমঘণ্টা নষ্ট হওয়ার কথাও জানিয়েছে। প্রায় ৮৭ শতাংশ প্রতিষ্ঠান শিপমেন্ট বিলম্বের কথা জানিয়েছে।
Manual2 Ad Code
আরও বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা নিয়ে। প্রায় ৮৯ শতাংশ প্রতিষ্ঠান ক্রেতার আস্থা হারানোর ঝুঁকির কথা জানিয়েছে। প্রায় ৫৫ শতাংশ প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, তাদের রফতানি আদেশ কমেছে অথবা বাতিল হয়েছে।
অর্থাৎ গ্যাস সংকটের প্রভাব কারখানার গেটের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এর প্রভাব পড়েছে পুরো রফতানি সরবরাহ ব্যবস্থায়।
সংকট কমলেও গ্যাসের ঘাটতি রয়ে গেছে
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, সংকটের আগে দেশে দৈনিক প্রায় ২৬০ থেকে ২৬৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হতো। এর মধ্যে মহেশখালীর দুটি ভাসমান টার্মিনাল থেকে আসত প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট এলএনজি।
Manual2 Ad Code
সংকটের পর আগস্টে দেশের গড় গ্যাস সরবরাহ নেমে আসে দৈনিক প্রায় ২২৩ কোটি ঘনফুটে। সাম্প্রতিক সময়ে দুটি টার্মিনাল থেকে এলএনজি সরবরাহ প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুটে ফিরে আসায় মোট সরবরাহও সংকটপূর্ব পর্যায়ের কাছাকাছি এসেছে।
তবে সংকটপূর্ব সরবরাহে ফিরে আসা মানেই দেশের গ্যাস সমস্যা শেষ হয়ে যাওয়া নয়। সরকারি হিসাবে, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮৬ কোটি ঘনফুট। সে হিসাবে ২৬০ কোটি ঘনফুটের কাছাকাছি সরবরাহ থাকলেও ঘাটতি থেকে যাচ্ছে প্রায় ১২৫ কোটি ঘনফুট।
ফলে বর্তমান পরিস্থিতিকে দীর্ঘমেয়াদি গ্যাস সংকটের সমাধান না বলে বরং সাম্প্রতিক তীব্র সংকট থেকে কিছুটা উত্তরণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
সামনে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার দাবি
শিল্প উদ্যোক্তাদের বক্তব্য, বুধবার থেকে গ্যাস সরবরাহ বাড়ায় তাৎক্ষণিকভাবে উৎপাদন কিছুটা স্বাভাবিক করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। কিন্তু গত দুই মাসের ক্ষতি একদিনে পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।
যেসব কারখানার উৎপাদন কমেছে, তাদের অনেককে এখন আগের অর্ডার শেষ করতে অতিরিক্ত সময় দিতে হবে। যেসব চালান পিছিয়েছে, সেগুলো দ্রুত পাঠানোর চাপ থাকবে। একই সঙ্গে বাড়তি জ্বালানি খরচ ও উৎপাদন ব্যয়ের চাপও মোকাবিলা করতে হবে।
এ কারণে শিল্প মালিকদের প্রত্যাশা, সাম্প্রতিক সরবরাহ বৃদ্ধিকে সাময়িক উদ্যোগ হিসেবে না দেখে গ্যাস সরবরাহের একটি স্থায়ী ও পূর্বানুমানযোগ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।
কারণ একটি রফতানিমুখী কারখানার জন্য গ্যাস শুধু জ্বালানি নয়—এটি উৎপাদন পরিকল্পনা, শ্রমিকের কর্মসংস্থান, ক্রেতার সঙ্গে চুক্তি এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
মহিউদ্দিন রুবেলের মতে, আকস্মিক সংকট মোকাবিলায় শিল্পকে কীভাবে প্রস্তুত রাখা যায়, সেটিও এখন ভাবতে হবে। পাশাপাশি গ্যাস সংকট থেকে স্থায়ীভাবে বেরিয়ে আসতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জরুরি।
শিল্প উদ্যোক্তাদের বর্তমান স্বস্তির জায়গাটি তাই খুব স্পষ্ট—দুই মাস পর গ্যাসের চাপ বাড়ছে, অনেক কারখানায় উৎপাদন আবার গতি পাচ্ছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি নিশ্চয়তার জায়গাটি এখনও তৈরি হয়নি। বুধবারের সরবরাহ বৃদ্ধি শিল্পকে সাময়িক স্বস্তি দিলেও শিল্পের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতার জন্য প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন ও পূর্বানুমানযোগ্য গ্যাস সরবরাহ।