ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন আয়োজন নিয়ে গত ১৪ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ঘোষিত সম্ভাব্য ভোটের তারিখ নিয়ে সরকারের সঙ্গে অবস্থানগত মতবিরোধ সংস্থাটির কর্মকর্তাদের ভাবিয়ে তুলেছে। ইসি সূত্রে জানা গেছে, এ বিষয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ‘নাখোশ’ মনোভাব, বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ের বিষয়টি সামনে এসেছে। এ অবস্থায় নির্বাচন অনুষ্ঠানে ‘বুঝেশুনে’ অগ্রসর হতে চায় ইসি।
আজ বৃহস্পতিবার ২৬টি মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে আন্তমন্ত্রণালয় সভার পর পরিস্থিতি নতুন করে পর্যালোচনা করে ইউপি নির্বাচনের রোডম্যাপ ও ভোটের তারিখ চূড়ান্ত করার কথা রয়েছে। নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ ইতোমধ্যে স্পষ্ট করেছেন, কমিশন তফসিল ঘোষণা করেনি, শুধু ভোটের সম্ভাব্য সময় জানিয়েছে। আন্তমন্ত্রণালয় সভায় আলোচনা শেষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
Manual8 Ad Code
এর আগে গত সোমবার কমিশনে বিশেষ বৈঠক শেষে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি হিসেবে ইউনিয়ন পরিষদের ভোট আয়োজনের একটি প্রাথমিক কর্মপরিকল্পনা প্রকাশ করে ইসি। এতে দেশের ৪ হাজার ৫৮০টি ইউনিয়ন পরিষদে সাত ধাপে ভোট আয়োজনের সম্ভাব্য তারিখ জানানো হয়। প্রথম ধাপে আগামী ১২ নভেম্বর ৮০টি উপজেলায় ভোট আয়োজনের কথা বলা হয়। এরপর দ্বিতীয় ধাপে ১৩ ডিসেম্বর, তৃতীয় ধাপে ৩০ ডিসেম্বর, চতুর্থ ধাপে আগামী বছরের ১৭ জানুয়ারি, পঞ্চম ধাপে ৪ ফেব্রুয়ারি, ষষ্ঠ ধাপে ২২ এপ্রিল এবং সপ্তম ধাপে ২৭ মে ভোটের সম্ভাব্য দিন নির্ধারণ করা হয়।
Manual8 Ad Code
ইউপি নির্বাচন নিয়ে ইসির এই সম্ভাব্য রোডম্যাপ ঘোষণার পরই তা নিয়ে শুরু হয় আলোচনা। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, সম্ভাব্য ভোটের তারিখ ঘোষণার আগে স্থানীয় সরকার বিভাগ বা সরকারের সঙ্গে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি। স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বিষয়টি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে তিনি ইউপি নির্বাচনের তারিখ সম্পর্কে জানতে পেরেছেন।
ঘোষিত তারিখগুলো ছিল কেবল প্রাথমিক কর্মপরিকল্পনা, যাতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোকে আগাম প্রস্তুতির সুযোগ দেওয়া যায়। ইসি কর্মকর্তাদের দাবি, নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে স্থানীয় সরকার বিভাগের সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদান হয়েছে।
Manual4 Ad Code
ইসি সূত্র জানায়, গত ৯ জুলাই স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিবকে ইউনিয়ন পরিষদের সর্বশেষ সাধারণ নির্বাচন, শপথ গ্রহণ, প্রথম সভা এবং সীমানা বা ওয়ার্ড বিন্যাসসংক্রান্ত তথ্য চেয়ে চিঠি দেওয়া হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ৮ আগস্ট স্থানীয় সরকার বিভাগের পক্ষ থেকে আট বিভাগের ইউনিয়ন পরিষদগুলোর প্রয়োজনীয় তথ্য ইসিকে পাঠানো হয়। এসব তথ্য পর্যালোচনা করেই বিশেষ সভায় প্রাথমিক রোডম্যাপ তৈরি করে কমিশন। ফলে সরকারকে সম্পূর্ণভাবে অবহিত না করে ইসি একতরফাভাবে নির্বাচনের উদ্যোগ নিয়েছে–এমন ব্যাখ্যার সঙ্গে তারা একমত নন। এ বিষয়ে ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে–এ বিষয়ে কোনো অনিশ্চয়তা নেই। তবে কখন, কীভাবে এবং কত ধাপে হবে, তা সংশ্লিষ্টদের মতামত পাওয়ার পর চূড়ান্ত করা হবে।
আজ বৃহস্পতিবার নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনের সভাপতিত্বে ২৬টি মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও নির্বাচন কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত সংস্থার প্রতিনিধিদের নিয়ে আন্তমন্ত্রণালয় সভা হওয়ার কথা রয়েছে। শিক্ষা, স্থানীয় সরকার, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো এতে অংশ নেবে।
ইসি সচিবের ভাষ্য, নির্বাচনের প্রস্তুতি ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সক্ষমতা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য নেওয়া হবে। সবার মতামত ও পরামর্শ শোনার পর কমিশন ভোটের সময়সূচি চূড়ান্ত করবে। ফলে ইসির ঘোষিত সাত ধাপের রোডম্যাপ অপরিবর্তিত থাকবে–এমন নিশ্চয়তা এখনো নেই। মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোর প্রস্তুতি, প্রশাসনিক সক্ষমতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং দীর্ঘ সময় ধরে নির্বাচন চললে সরকারি প্রশাসন ও উন্নয়ন কার্যক্রমে সম্ভাব্য প্রভাব–এসব বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া হতে পারে।
জানা গেছে, আন্তমন্ত্রণালয় সভার পর স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও পর্যালোচনা করবে কমিশন। আগামী ২১ সেপ্টেম্বর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবে ইসি। ওই সভায় জনপ্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব, পুলিশ মহাপরিদর্শক, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সচিব, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার ছাড়াও বিজিবি, কোস্টগার্ড, আনসার-ভিডিপি, র্যাব, ডিজিএফআই, এনএসআই ও এনটিএমসির কর্মকর্তারা অংশ নেবেন। সভায় স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবং ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
ইউপি নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতিতে এরই মধ্যে বেশ কিছু কাজ এগিয়ে রেখেছে কমিশন। ভোটার তালিকা হালনাগাদ ও সম্ভাব্য ভোটকেন্দ্র নির্ধারণের কাজও করা হয়েছে। ফলে নির্বাচন আয়োজনের মৌলিক প্রস্তুতি অনেকটাই এগিয়ে রয়েছে। তবে ভোটের তারিখ নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক প্রস্তুতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির পাশাপাশি সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এ কারণেই প্রাথমিক রোডম্যাপ ঘোষণার পর তৈরি হওয়া মতভিন্নতার প্রেক্ষাপটে আন্তমন্ত্রণালয় সভাকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে ইসি।