চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান-পূর্ববর্তী জাতীয় সংসদের অধিবেশনে প্রায়ই গান শোনাতেন কণ্ঠশিল্পী ও সংসদ সদস্য মমতাজ বেগম। শেখ হাসিনার স্তুতিমূলক এসব গানের কোনো কোনোটির ব্যাপ্তি ছিল ৬-৭ মিনিট পর্যন্ত। সঙ্গে যুক্ত হতো অপ্রাসঙ্গিক আরও বিভিন্ন কথাবার্তা। এভাবে সংসদের পরিচালন ব্যয়ের হিসাবে মমতাজের একটি গান শোনানোর জন্য সরকারের ব্যয় হতো ১৯-২২ লাখ টাকা।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে কোনো কণ্ঠশিল্পী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হননি। এর কোনো অধিবেশনে কোনো গান শোনা না গেলেও কবিতা, শায়েরী, টিপ্পনী, তির্যক বাক্যবাণ ও উর্দু-হিন্দি সংলাপ উচ্চারিত হয়েছে একাধিকবার। এগুলোতেও সরকারের বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্যয় হয়েছে। অথচ একটি কার্যকর সংসদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ সবচেয়ে কম সময় ব্যয় করেছে। অর্থাৎ সংসদের মূল কার্যক্রমবহির্ভূত খরচের বহরই বেশি।
২০২৩ সালে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) হিসাবে, একাদশ জাতীয় সংসদের প্রথম ২২টি অধিবেশন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সংসদ পরিচালনায় প্রতি মিনিটে গড়ে ২ লাখ ৭২ হাজার ৩৬৪ টাকা ব্যয় হয়েছে। এই হিসাবে সংসদ সদস্যদের পারিশ্রমিক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যয় এবং সংসদ পরিচালনার বিভিন্ন প্রশাসনিক ও অবকাঠামোগত খরচও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল। ২০২৩ সালের ওই ব্যয় ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মূল্যস্ফীতির প্রভাবের হারে পরিণত হয়েছে ৩ লাখ ৫৬ হাজার ৮২৫ টাকায়। সে হিসাবে বর্তমানে সংসদে প্রতি সেকেন্ডে ব্যয় হয় ৫ হাজার ৯৪৭ টাকা। টিআইবি সংসদের পরিচালন ব্যয় নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করলেও জাতীয় সংসদ সচিবালয় এ পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে খরচের হিসাব প্রকাশ করেনি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম তিনটি অধিবেশন ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। প্রথম অধিবেশন শুরু হয় ১২ মার্চ এবং ৩০ এপ্রিল শেষ হয়। মোট ২৫ কার্যদিবস সংসদ বসে। দ্বিতীয় বা বাজেট অধিবেশন শুরু হয় ৭ জুন এবং শেষ হয় ১৫ জুলাই। এ অধিবেশন চলে ২৬ কার্যদিবস। তৃতীয় অধিবেশন শুরু হয় ২৭ আগস্ট এবং ১০ সেপ্টেম্বর শেষ হয়। এ অধিবেশনের কার্যদিবস ছিল ৯টি। অর্থাৎ প্রথম তিন অধিবেশনে মোট ৬০ কার্যদিবস সংসদ বসেছে। বিস্ময়কর হলেও সত্য, কার্যদিবসগুলোতে কত ঘণ্টা অধিবেশন চলেছে তার কোনো হিসাব নেই সংসদ সচিবালয়ের কাছে। তারা এ সম্পর্কিত কোনো হিসাব রাখেন না কিংবা তৈরি করেন না।
জাতীয় সংসদের অধিবেশন শুরু এবং সমাপ্তি সংক্রান্ত ঘোষণা সম্পর্কিত একটি হিসাব রয়েছে সার্জেন্ট অ্যাট আর্মস অফিসে। তাতে সংসদ শুরু ও শেষের উল্লেখ রয়েছে। তবে অধিবেশনে আসর কিংবা মাগরিবের নামাজের বিরতি থাকে; কোরাম সংকটে নির্ধারিত সময়ে অধিবেশন শুরু না হওয়ার ঘটনাও ঘটে। বিড়ম্বনা এড়াতে জাতীয় সংসদে প্রথমবারের মতো উভয় নামাজে বিরতির সময় ৩০ মিনিট নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে এটি ছিল ২০ মিনিটের বিরতি। এভাবে প্রাপ্ত হিসেবে সংসদের অধিবেশন বেশিরভাগ দিনই ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা স্থায়ী হয়। শীতকালীন ও বাজেট অধিবেশন অনেক সময় দুবেলা হয়। অর্থাৎ কোনো কোনো দিন ৮ থেকে ৯ ঘণ্টাও অধিবেশন চলে। তবে সামগ্রিক গড় হিসেবে সংসদ অধিবেশনের মেয়াদকাল ৫ ঘণ্টা ৪৭ মিনিটের মতো। সে হিসেবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম তিন কার্যদিবসে ৩২৮ ঘণ্টা ২০ মিনিট অধিবেশন চলেছে। মিনিটের হিসাবে তা ১৯ হাজার ৭০০ মিনিট। এতে পরিচালন ব্যয় দাঁড়ায় ৭০২ কোটি ৯৪ লাখ ৫২ হাজার ৫০০ টাকায়।
কেন এত টাকা
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবির ‘পার্লামেন্ট ওয়াচ’ গবেষণায় একাদশ জাতীয় সংসদের প্রথম ২২টি অধিবেশন অর্থাৎ ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৩ সালের এপ্রিল পর্যন্ত সংসদের কার্যক্রম পর্যালোচনা করা হয়। গবেষণায় সংসদ পরিচালনার প্রতি মিনিটের গড় অর্থমূল্য ধরা হয় ২ লাখ ৭২ হাজার ৩৬৪ টাকা। এ হিসাব তৈরিতে সংশ্লিষ্ট অর্থবছরগুলোর জাতীয় সংসদের বাজেট এবং বার্ষিক বিদ্যুৎ বিলের ব্যয় বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল। অন্যদিকে সংসদীয় কমিটির বার্ষিক ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিত্বমূলক চাঁদা বাদ দেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ এটি সংসদের সার্বিক পরিচালন ব্যয়ের ভিত্তিতে তৈরি করা গড় হিসাব। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের মোট প্রস্তাবিত বাজেট ২৯০ কোটি ৬০ লাখ টাকা। এর মধ্যে ২৮৯ কোটি ৯০ লাখ টাকা পরিচালন খাতে এবং ৭০ লাখ টাকা উন্নয়ন খাতে রাখা হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে মোট বরাদ্দ ছিল ২২৬ কোটি ৬৯ লাখ ৬০ হাজার টাকা।
পরিচালন ব্যয়ের মধ্যে রয়েছে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, সংসদ সদস্যদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা, অফিস পরিচালনা, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য ইউটিলিটি, ভবন ও অবকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণ, বিভিন্ন সরঞ্জাম ও সেবা, অধিবেশন ও দাপ্তরিক কার্যক্রম এবং নিরাপত্তাসহ নানা খরচ। অতীতের সংসদীয় ব্যয়ের বিশ্লেষণেও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও বিভিন্ন ভাতা, সংসদ ভবন ও অবকাঠামোর মেরামত-সংস্কার, বিভিন্ন সরঞ্জাম ও সেবা, দপ্তর ও অনুষ্ঠান এবং সংসদ সদস্যদের ভাতা ও অন্যান্য সুবিধাকে ব্যয়ের অংশ হিসেবে ধরা হয়েছিল। এর সঙ্গে সংসদ ভবনের মতো বিশাল স্থাপনা সচল রাখা, সভাকক্ষ ও কারিগরি ব্যবস্থা পরিচালনা, অধিবেশন সম্প্রচার, নিরাপত্তা এবং সংসদীয় কমিটিগুলোর প্রশাসনিক সহায়তাও যুক্ত থাকে।
রাষ্ট্রপতির ভাষণে কত খরচ
সদ্য পদত্যাগী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন চলতি বছরের ১২ মার্চ জাতীয় সংসদে তার বর্ষ শুরুর ভাষণ দেন। জামায়াত-এনসিপি জোটের সদস্যরা এ সময় সংসদ কক্ষে বিক্ষোভ করেন এবং রাষ্ট্রপতির ভাষণ বর্জন করেন। তাদের বর্জন করা ভাষণের ওপর সাধারণ আলোচনায় তারাই পরে ৫০ ঘণ্টা সময় বরাদ্দের প্রস্তাব করেন। তাদের এ প্রস্তাব গৃহীত হয়।
Manual2 Ad Code
সচিবালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বাস্তবে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনা হয়েছে ৪০ ঘণ্টা ১৪ মিনিট বা ২ হাজার ৪১৪ মিনিট। এতে অংশ নেন ২৮০ জন সংসদ সদস্য। প্রতি মিনিট ৩ লাখ ৫৬ হাজার ৮২৫ টাকা হিসেবে এ খাতে সরকারের ব্যয় হয়েছে ৮৬ কোটি ১৩ লাখ ৭৫ হাজার ৫৫০ টাকা।
Manual6 Ad Code
বাজেট ব্যয় কত
দ্বিতীয় অধিবেশন ছিল বাজেট অধিবেশন। ৭ জুন শুরু হয়ে ১৫ জুলাই শেষ হওয়া এই অধিবেশনে মোট ২৬ কার্যদিবস ছিল। বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনা হয়েছে ১৪ কার্যদিবস। সংসদ সচিবালয়ের হিসাবে এই আলোচনার মোট সময় ৪৮ ঘণ্টা ৫১ মিনিট এবং এতে ৩১৬ জন সংসদ সদস্য অংশ নেন। ৪৮ ঘণ্টা ৫১ মিনিটকে মিনিটে রূপান্তর করলে হয় ২ হাজার ৯৩১ মিনিট। এ খাতে সরকারের ব্যয় হয়েছে ১০৪ কোটি ৫৮ লাখ ৫৪ হাজার ৭৫ টাকা।
বিল পাস ও অন্যান্য কার্যক্রম
ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে ৯৪টি বিল পাস হয়েছে এবং ১৩৩টি অধ্যাদেশ উত্থাপিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীকে করা ৯৩টি প্রশ্নের মধ্যে ৩৫টির উত্তর দেওয়া হয়েছে এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীদের জন্য পাওয়া ২ হাজার ৫০৯টি প্রশ্নের মধ্যে ১ হাজার ৭৭৮টির উত্তর দেওয়া হয়েছে। বাজেট অধিবেশনে ১০টি সরকারি বিল পাস হয়েছে। বিভিন্ন বিধিতে বিপুলসংখ্যক নোটিস ও প্রশ্নের নিষ্পত্তি হয়েছে। বাজেটের সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়েছেন ৩১৬ জন সংসদ সদস্য।
তৃতীয় অধিবেশনের ৯ কার্যদিবসে ৬টি বিল পাস হয়েছে। এ অধিবেশনে ৩টি বিশেষ কমিটিসহ ৪৮টির অধিক সংসদীয় কমিটি গঠন ও পুনর্গঠন করা হয়েছে। এমপিরা গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয়ে নোটিস দিয়েছেন। অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্বের জন্য সংসদ সদস্যরা মোট ১৪৪টি প্রশ্নের নোটিস দেন। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী ১৫টি প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীদের উত্তরদানের জন্য মোট ২ হাজার ৬৭৬টি প্রশ্নের নোটিস পাওয়া যায়। এর মধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা এ অধিবেশনে মোট ১ হাজার ৬৭৮টি প্রশ্নের উত্তর দেন।
জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর থেকে শুরু করে আইন প্রণয়ন পর্যন্ত প্রতিটি বিষয়ে সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা ছাড়াও দেশ পরিচালনায় প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করা হয়। ফলে সংসদের প্রতি মিনিট বা সেকেন্ডের হিসাব সংসদীয় কার্যক্রমকে প্রশ্নবিদ্ধ করে না। বরং একটি কার্যকর সংসদের দিকনির্দেশনা দিয়ে থাকে। তবে এর মধ্যে অনেক অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক, ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক আক্রমণসহ বিভিন্ন বিষয় ছাড়াও স্পিকার-ডেপুটি স্পিকারের রুলিংয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও রয়েছে।
আইন প্রণয়নে সময় কম
Manual1 Ad Code
চলতি সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে ৬টি বিল উত্থাপিত ও পাস হয়েছে। মাত্র ৯ কার্যদিবসে বিল ৬ উত্থাপন করেই তা পাস করে নেওয়ার দৃষ্টান্ত এর আগে নেই। ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল নিজেও এ বিষয়ে নির্বাহী বিভাগের সমালোচনা করেছেন। তার বক্তব্য, মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর যত দ্রুত সম্ভব বিল আইনসভায় পাঠানো উচিত; যাতে সব সংসদ সদস্য আইনটি ভালোভাবে পড়ে আসতে পারেন। এর কিছুটা ব্যত্যয় হচ্ছে। এজন্য তিনি সংসদে হতাশাও প্রকাশ করেন। এই সংসদে মূল কাজ আইন প্রণয়নে যেমন কম সময় দেওয়া হয়েছে, ঠিক তেমনি ব্যয়ও কম হয়েছে।
সংসদ রক্ষণাবেক্ষণেই শতকোটি টাকা
মার্কিন স্থপতি লুই আই কানের নকশায় তৈরি হওয়া জাতীয় সংসদ ভবন সারা বিশ্বে একটি অনন্য স্থাপনা হিসেবে স্বীকৃত। কিন্তু এর বার্ষিক রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় শতকোটি টাকার ওপর। কোনো কোনো বছর বিশেষ প্রকল্প করে এক অর্থবছরে ৫০০ কোটি টাকাও ব্যয় করা হয়েছে এর ভৌত ও ইলেকট্রোমেকানিক্যাল মেইনটেন্যান্সের ক্ষেত্রে।
তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে জাতীয় সংসদ ভবনে রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করছেন প্রকৌশলী আসাদুজ্জামান লিপটন। তিনি জানান, বিশেষ প্রকল্পসহ হিসাব করলে রক্ষণাবেক্ষণের বার্ষিক ব্যয় শতকোটি টাকার বেশি; যা জাতীয় সংসদ পরিচালন ব্যয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে থাকে। এ ছাড়া নিরাপত্তাজনিত কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিপুল সদস্য মোতায়েন, তাদের দৈনন্দিন খরচ ছাড়াও ওভার টাইম দেওয়া, গণপূর্তের প্রায় এক হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীর দায়িত্ব পালন ও ওভার টাইম দেওয়াসহ বিভিন্ন বিল যুক্ত হয়।
Manual2 Ad Code
ব্যয় বৃদ্ধির ইতিহাস
জাতীয় সংসদ পরিচালনায় সময়ের সঙ্গে ব্যয়ও বেড়েছে। আশির দশকের সংসদগুলোর প্রতি মিনিটের পরিচালন ব্যয়ের নির্ভরযোগ্য হিসাব প্রকাশিত গবেষণায় পাওয়া যায় না। তবে সেসময়ে পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে প্রতি মিনিটে ২৩ হাজার টাকা খরচের ধারণা পাওয়া যায়। টিআইবি অষ্টম জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন থেকে নিয়মিত ‘পার্লামেন্ট ওয়াচ’ প্রকাশ শুরু করে। তুলনামূলকভাবে নির্ভরযোগ্য হিসাব পাওয়া যায় পরবর্তী সময় থেকে। অষ্টম জাতীয় সংসদে প্রতি মিনিটের ব্যয় ছিল ৩৫ হাজার টাকা। টিআইবির ২০১১-১২ সালের গবেষণায় নবম সংসদের আটটি অধিবেশনের হিসাবে দেখা যায়, সংসদ পরিচালনায় প্রতি মিনিটে গড়ে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৭৮ হাজার টাকা।
এরপর ব্যয়ের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়েছে। দশম জাতীয় সংসদের ১৪তম থেকে ১৮তম অধিবেশন বিশ্লেষণ করে টিআইবি জানায়, সংসদ পরিচালনায় প্রতি মিনিটে গড়ে ব্যয় হয়েছে ১ লাখ ৬৩ হাজার ৬৮৬ টাকা। অর্থাৎ নবম সংসদের হিসাবের তুলনায় ব্যয় দ্বিগুণেরও বেশি হয়। একাদশ জাতীয় সংসদের প্রথম ২২টি অধিবেশনে এই ব্যয় আরও বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৭২ হাজার ৩৬৪ টাকা। অর্থাৎ প্রায় এক দশকের ব্যবধানে প্রতি মিনিটের ব্যয় সাড়ে তিনগুণের কাছাকাছি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মত
সংসদ বিষয়ক গবেষক এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমদ আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ার গুণগত মান নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আরও সময় দেওয়া উচিত বলে মনে করেন। তিনি বলেন, “আইন প্রণয়নের সময় তড়িঘড়ি না করে পর্যাপ্ত সময় দিলে বিলের প্রতিটি ধারা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করা সম্ভব হয়। আইনের কোনো ফাঁকফোকর বা দুর্বল দিক থাকলে তা সহজেই চিহ্নিত করা যায়।
“একইভাবে সংশ্লিষ্ট সংসদীয় স্থায়ী কমিটিকে যথেষ্ট সময় দিলে তারা বিলটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আরও কার্যকর ও সময়োপযোগী সুপারিশ দিতে পারে। তাড়াহুড়া করে বা কার্যকর বিতর্ক ছাড়া পাস হওয়া আইন প্রায়শই দুর্বল হয় এবং পরে তা বাস্তবায়নে নানা জটিলতা হয়। পর্যাপ্ত সময় দিলে জনকল্যাণমুখী ও টেকসই আইন প্রণয়ন করা সম্ভব হয়। তা করলে জাতীয় সংসদের এই বিপুল ব্যয় অর্থপূর্ণ হয়।”
জাতীয় সংসদের অবসরপ্রাপ্ত পরিচালক কামরুল ইসলাম বলেন, “এই সংসদের একটি বার্ষিক বাজেট রয়েছে। সেই বাজেটকে পরিচালন ব্যয় ধরলে মিনিট বা ঘণ্টার এই হিসাবের সঙ্গে মিলবে না। তবে অধিবেশন চলাকালীন নিরাপত্তা, বার্ষিক মেইনটেন্যান্স, বিটিভি-রেডিওর প্রচার, বিদ্যুৎ-ফায়ার সার্ভিসহ অন্যান্য সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক হিসাব ধরলে এটা ঠিক আছে। কিন্তু কোন দপ্তরে কত টাকা খরচ করে কিংবা কোন অধিবেশনে কত বরাদ্দ, সে সম্পর্কিত কোনো সম্মিলিত হিসাব এখনও হয়নি।” তিনিও মনে করেন, আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে আরও বেশি সময় দেওয়া জরুরি।