সকাল ৯টা। অফিসগামী মানুষের ভিড়ে হাঁটছেন আজিজুর রহমান। ঘর থেকে বেরোতেই মুখে লাগে ধোঁয়া আর ধুলোর তীব্র গন্ধ। কিছু দূর এগোতেই শুরু হয় হাঁচি। অ্যালার্জি আছে, তাই এমন ধুলাবালিতে তার প্রতিদিনই কষ্ট বাড়ছে। প্রতিদিনের বাংলাদেশকে আজিজুর রহমান বলেন, ‘কয়েক দিন ধরে মাথাব্যথা, ঠান্ডায় ভুগছি। বাসের জন্য দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে দেখলাম, সাদা জামাটাও হলুদ হয়ে গেল। এমন দূষিত বাতাসে দিন কাটানোই যেন অসহ্য হয়ে যায়।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতি বছর শীতকালে দেশের বায়ুদূষণের ৩০ থেকে ৪০ ভাগই ভারত ও লাহোরের দিক থেকে প্রবাহিত দূষিত বায়ুর কারণে বৃদ্ধি পায়। এ সময় উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে দক্ষিণ-পূর্বদিকে বাতাস প্রবাহিত হওয়ায় সীমান্ত পেরিয়ে দূষণের প্রভাব বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। দিল্লি ও লাহোরের দূষিত বায়ু ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই বাংলাদেশে প্রবেশ করে।
Manual2 Ad Code
Manual7 Ad Code
আন্তর্জাতিক বায়ুমান প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আইকিউএয়ারের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, ১৬৭ একিউআই স্কোর নিয়ে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের দ্বিতীয় দূষিত দেশ। সর্বোচ্চ দূষণের তালিকায় শীর্ষে আছে ১৭৬ পয়েন্ট নিয়ে চাঁদ, আর তৃতীয় স্থানে আছে পাকিস্তান ১৬৪ পয়েন্ট নিয়ে। প্রতিবেশী ভারতও ছাড় পায়নি; তারা ১৩৪ পয়েন্ট নিয়ে পঞ্চম স্থানে রয়েছে। শুধু দেশ নয়, শহরভিত্তিক তালিকাও উদ্বেগজনকÑ ২২১ পয়েন্টের একিউআই নিয়ে দিল্লি এখন বিশ্বের দূষিততম শহর। দ্বিতীয় স্থানে আছে পাকিস্তানের লাহোর আর ঢাকার অবস্থান ১১৮ স্কোর নিয়ে ১৬তম।
শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের এনার্জি পলিসি ইনস্টিটিউটের এয়ার কোয়ালিটি লাইফ ইনডেক্স রিপোর্টে এ তথ্য উঠে এসেছে। বাংলাদেশের ১৬ কোটির বেশি মানুষের সবাই এমন এলাকায় বাস করে, যেখানে বাতাসে ফাইন পার্টিকুলেট দূষণের বার্ষিক গড় মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকা (৫ মাইক্রোগ্রাম প্রতি ঘনমিটার) এবং দেশের জাতীয় সীমা (৩৫ মাইক্রোগ্রাম) উভয়ই ছাড়িয়ে গেছে। ঢাকার মতো জায়গায় এই মাত্রা ৭৬ মাইক্রোগ্রামের ওপরে দেখা গেছে।
Manual2 Ad Code
প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৯৮ সালের তুলনায় বাংলাদেশে বায়ুদূষণ ৬৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যার ফলে মানুষের গড় আয়ু কমে গেছে দুই বছর আট মাস। তবে আশার বিষয় হলোÑ ২০২০-২১ সালের তুলনায় দূষণের হার ২ দশমিক ২ শতাংশ কমেছে, যা নিয়ন্ত্রণ প্রচেষ্টার কিছু ইতিবাচক অগ্রগতি নির্দেশ করে। বৈশ্বিক হিসাবে বায়ুদূষণ কমাতে সবচেয়ে বড় সাফল্য দেখিয়েছে চীন। গত এক দশকে দেশটি দূষণ নিয়ন্ত্রণে ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করে, যার ফলে তাদের বায়ুর মান ৪২ শতাংশের বেশি উন্নত হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের গবেষণায় দেখা গেছে, যানজট ও নির্মাণকাজ থেকে উৎপন্ন দূষণ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত বায়ুমানের চেয়ে ১৫০ শতাংশ বেশি, আর ইটভাটার কারণে দূষণ ১৩৬ শতাংশ বেশি। তুলনামূলকভাবে সিলেটে দূষণ কম হলেও সেখানকার বায়ু ডব্লিউএইচও মানের চেয়ে ৮০ শতাংশ বেশি দূষিত। গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, বায়ুদূষণ মাত্র ১ শতাংশ বাড়লেই বিষণ্নতার ঝুঁকি ২০ গুণ পর্যন্ত বাড়তে পারে। ঢাকার বাতাস এতটাই ক্ষতিকর যে, একজন মানুষ দিনের বেলায় যে পরিমাণ দূষিত বায়ু গ্রহণ করে, তা দুটি সিগারেট খাওয়ার সমান ক্ষতি করে।