প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার যাত্রা শুরু করার পরপরই দেশের পানি ব্যবস্থাপনা ও জলাবদ্ধতা নিরসনে সারা দেশে খাল খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচির বিষয়ে নীতিগত অগ্রাধিকার দেওয়ার ঘোষণা আসে। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমানের রেখে যাওয়া উন্নয়নভাবনার ধারাবাহিকতা হিসেবে এ কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়া হবে।
দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একাধিক আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে দ্রুত সম্ভাব্য খালের তালিকা প্রস্তুত, অগ্রাধিকার নির্ধারণ ও বাজেট প্রস্তাব তৈরির নির্দেশ দেন। কর্মসূচিটি জরুরি জলাবদ্ধতা নিরসন, কৃষি ও সেচ সম্প্রসারণ এবং নৌপথ ও পরিবেশ পুনরুদ্ধারÑ এই তিন ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ৫ থেকে ৭ হাজার কিলোমিটার খাল পুনঃখননের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে ভূমি মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয়সহ সংযুক্ত অন্যান্য মন্ত্রণালয় সম্ভাব্য ব্যয়, খালের সীমানা ও গভীরতা নির্ধারণসহ তালিকা চূড়ান্ত করেছে। শিগগিরই এসব অনুমোদন হতে পারে।
‘তালিকা আগে, কাজ পরে’-নীতিগত বার্তা
গত কয়েক সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পানিসম্পদ, স্থানীয় সরকার, কৃষি, নৌপরিবহন, পরিবেশ এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও সচিবদের নিয়ে অন্তত তিনটি বৈঠক হয়েছে বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। এসব বৈঠকে নির্দেশনা ছিলÑ প্রথমে জেলার ভিত্তিতে সম্ভাব্য খালগুলোর তালিকা, দৈর্ঘ্য, বর্তমান অবস্থা ও সম্ভাব্য উপকারভোগীর সংখ্যা নির্ধারণ করতে হবে।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রমতে, এবার কেন্দ্রীয়ভাবে তালিকা প্রস্তুত করে জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রকৌশল দপ্তরের তথ্য যাচাই করে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হবে। শুধু খনন নয়, রক্ষণাবেক্ষণের আলাদা পরিকল্পনাও চাইছে সরকার। প্রাথমিক পর্যায়ে ব্যয় হতে পারে ১২ থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা। অর্থের উৎস হিসেবে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি), জলবায়ু তহবিল ও বৈদেশিক উন্নয়ন সহায়তার সম্ভাবনা যাচাই করা হচ্ছে।
খাল হারানোর ইতিহাস ও বর্তমান সংকট
বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ হলেও গত কয়েক দশকে খাল ও জলাশয় দখল, ভরাট এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে প্রাকৃতিক নিষ্কাশনব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়েছে। রাজধানী ঢাকাসহ বিভাগীয় শহরগুলোতে বর্ষায় জলাবদ্ধতা এখন নিয়মিত দুর্ভোগ। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা বলছে, স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন শহরে প্রায় ৪০ শতাংশ খাল আংশিক বা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়েছে। পরিবেশবাদীরা বলছেন, খাল পুনরুদ্ধার ছাড়া টেকসই নগর ব্যবস্থাপনা সম্ভব নয়।
Manual4 Ad Code
পানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাল খননকে শুধু মাটি কাটার প্রকল্প হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি হতে হবে সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনার অংশ। না হলে কয়েক বছরের মধ্যে আবার ভরাট হয়ে যাবে।
কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে সম্ভাব্য ইতিবাচক প্রভাব বাড়বে
কৃষি মন্ত্রণালয়ের একটি প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তরাঞ্চলে খাল পুনঃখনন হলে শুকনো মৌসুমে সেচের পানি সরবরাহ বাড়বে। এতে বোরো ও রবি ফসলের উৎপাদন ৮ থেকে ১২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
অন্যদিকে মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, অনেক এলাকায় খাল পুনরুজ্জীবিত হলে দেশীয় প্রজাতির মাছের প্রজনন ক্ষেত্র বাড়বে। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের ধারণা, ছোট নৌপথ সচল হলে গ্রামীণ পণ্য পরিবহন ব্যয় কমবে।
সাবেক পানিসম্পদ সচিব ড. নাজমুল আহসান এ বিষয়ে বলেন, ’৭০-এর দশকে খাল খনন কর্মসূচি গ্রামীণ অর্থনীতিতে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। বর্তমানে প্রযুক্তি ও জিআইএস ম্যাপিং ব্যবহার করে পরিকল্পিতভাবে আবারও এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা গেলে ফল আরও বেশি হবে।
স্বপ্ন বনাম টেকসই বাস্তবায়ন
Manual3 Ad Code
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, কর্মসূচিটি কেবল অবকাঠামো নয়, রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতারও প্রতীক। শহীদ জিয়াউর রহমানের সময় গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে খাল খনন একটি উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ ছিল। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার সেটিকে আধুনিক রূপ দিতে চায়। তবে এক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ কম নয়। কারণ অতীতে খাল খনন প্রকল্পে একাধিকবার অনিয়ম, অতিরিক্ত ব্যয় এবং নিম্নমানের কাজের অভিযোগ উঠেছে।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রমতে, প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ই-টেন্ডারিং, তৃতীয় পক্ষ মনিটরিং ও জনসম্পৃক্ততা বাড়ানো জরুরি। পরিবেশ অধিদপ্তরও সতর্ক করছে, অপ্রয়োজনীয় গভীর খনন বা ড্রেজিং করলে আশপাশের বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (ইআইএ) বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রকল্পের প্রথম ধাপের কাজ ২০২৬-২০২৮ মেয়াদে শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। এ সময়ে ২ হাজার কিলোমিটার খাল পুনঃখনন, ৫০০ কিলোমিটার নতুন সংযোগ খাল এবং ৩০০টির বেশি স্লুইসগেট মেরামতের পরিকল্পনা রয়েছে। বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে অর্থ মন্ত্রণালয় বলছে, বৈদেশিক ঋণের ক্ষেত্রে সুদের হার ও শর্ত বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
Manual3 Ad Code
তালিকা তৈরিতে স্থানীয় প্রশাসনের ব্যস্ততা
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) কাছে পাঠানো এক নির্দেশনায় বলা হয়েছে, প্রতিটি ইউনিয়নের খালের বর্তমান অবস্থা, দখল পরিস্থিতি ও স্থানীয় জনমতের তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে এক মাসের মধ্যে প্রাথমিক প্রতিবেদন পাঠাতে বলা হয়েছে। যশোর, খুলনা ও রংপুর অঞ্চলে ইতোমধ্যে জরিপ দল কাজ শুরু করেছে। কয়েকটি জেলায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বলছেন, খাল দখলমুক্ত না করলে খননের সুফল মিলবে না।
নাগরিক সমাজের প্রত্যাশা
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বলেছে, বড় বাজেটের অবকাঠামো প্রকল্পে দুর্নীতির ঝুঁকি থাকে। তাই প্রকল্পের তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশ ও সামাজিক নিরীক্ষা চালু করা প্রয়োজন। সংস্থাটির মতে, প্রতিটি প্রকল্প এলাকায় তথ্যফলক, অনলাইন ড্যাশবোর্ড ও অগ্রগতি প্রতিবেদন প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা হোক।
খাল খনন কর্মসূচি সফল হলে তা জলাবদ্ধতা নিরসন, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও পরিবেশ পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে পরিকল্পনা থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা, প্রযুক্তি ব্যবহার ও স্থানীয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হলে উদ্যোগটি আবারও কাগুজে প্রকল্পে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সরকার-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি শুধু উন্নয়ন প্রকল্প নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য টেকসই পানি ব্যবস্থাপনার ভিত্তি।