উন্নয়নে গতি আনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে দায়িত্ব নেওয়া নতুন সরকারের যাত্রা শুরুর পর উদ্যোগ নিয়েছে পুরনো প্রকল্পের জটিলতা থেকে বেরিয়ে আসার। তবে একনেক সভার কার্যতালিকায় দেখা গেছে, নতুন উদ্যোগের চেয়ে সংশোধিত প্রকল্পই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পুরনো প্রকল্পে গুরুত্বারোপের বিষয়টি উন্নয়ন ব্যবস্থাপনায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
Manual1 Ad Code
জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) দ্বিতীয় সভার কার্যতালিকা বিশ্লেষণে দেখা যায়, নতুন সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা পুরনো প্রকল্পের সংশোধন ও মেয়াদ বৃদ্ধির চক্রে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে আজ রবিবার সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে একনেকের দ্বিতীয় সভা। এতে ১৭টি প্রকল্প তোলা হচ্ছে; যার মধ্যে নতুন প্রকল্প মাত্র ৬টি। অন্যদিকে সংশোধিত প্রকল্প ১১টি। অর্থাৎ মোট প্রকল্পের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই পুরনোÑ যেগুলো আবারও ব্যয় ও সময় বাড়িয়ে অনুমোদনের জন্য উত্থাপিত হচ্ছে।
Manual5 Ad Code
Manual7 Ad Code
প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলোর মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১৪ হাজার ২৪৩ কোটি ২০ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকার দেবে ৮ হাজার ৮৮৭ কোটি ৩৬ লাখ টাকা, বিদেশি ঋণ ৫ হাজার ৩৪০ কোটি ২৬ লাখ এবং সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন থেকে আসবে ১৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট ব্যয়ের প্রায় ৩৭ শতাংশই বিদেশি ঋণনির্ভর। বিশেষজ্ঞরা বলছে, এই বিদেশ ঋণনির্ভরতা ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টির ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষত যখন এই অর্থের বড় অংশ নতুন উদ্যোগে নয়, বরং পুরনো প্রকল্পের ব্যয় সমন্বয়ে ব্যবহার হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, নতুন ছয়টি প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ নগর স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, ঢাকা শহরের জরুরি পানি সরবরাহ, সচিবালয়ে ২১ তলা অফিস ভবন নির্মাণ, ময়মনসিংহ বিভাগে জলবায়ু সহনশীল সেতু নির্মাণ এবং পার্বত্য এলাকায় সীমান্ত সড়ক নির্মাণ। এগুলো দেশের অবকাঠামো উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ হলেও সংখ্যায় কম হওয়ায় সামগ্রিক পরিকল্পনায় নতুনত্ব সীমিত থাকছে।
অন্যদিকে সংশোধিত প্রকল্পগুলোর তালিকা উদ্বেগজনক। বরিশাল অঞ্চলের তিনটি সড়ক ও সেতু প্রকল্প পঞ্চমবারের মতো মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে একনেকে উঠছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প চতুর্থবারের মতো মেয়াদ বৃদ্ধির মুখে। শুল্ক আধুনিকায়ন, চট্টগ্রাম মুসলিম ইনস্টিটিউট সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স, গণগ্রন্থাগার ভবন, পিপিআর রোগ নির্মূল এবং জলবায়ু অভিযোজন প্রকল্পসহ একাধিক উদ্যোগ একাধিকবার সংশোধনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এসব প্রকল্পে সময় ও ব্যয়ের পূর্বানুমান বারবার ভেঙে পড়ছে, যা পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা নির্দেশ করছে।
প্রথম একনেক সভার অভিজ্ঞতায়ও মিলেছে একই চিত্র। ওই সভায় ১৯টি প্রকল্পের তালিকা থাকলেও অনুমোদন দেওয়া হয় মাত্র ৫টিতে, যার অধিকাংশই ছিল সংশোধিত বা মেয়াদ বৃদ্ধি পাওয়া প্রকল্প। এ সভায় আইটি ট্রেনিং অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টার প্রকল্পের সময় চতুর্থবারের মতো সময় বাড়ানো হয় এবং গোপালগঞ্জ ডেন্টাল কলেজ প্রকল্পসহ কয়েকটিতে ব্যয় সমন্বয় করা হয়। করতোয়া নদী উন্নয়ন প্রকল্প ফেরত পাঠানো হয়। কেননা এটির পরিকল্পনার মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
এবারও ৫০ কোটি টাকার কম ব্যয়ের ৩৩টি প্রকল্প একনেকে অবহিত করা হবে, যেগুলোর মধ্যেও সংশোধিত প্রকল্পের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। নদী পুনঃখনন, সড়ক উন্নয়ন, আইটি অবকাঠামো, বিদ্যুৎ বিতরণ এবং কৃষি গবেষণার মতো খাতে এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। তবে এখানেও নতুন উদ্যোগের চেয়ে পুরনো প্রকল্প টিকিয়ে রাখার প্রবণতাই বেশি।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, উন্নয়ন পরিকল্পনায় নতুনের চেয়ে সংশোধিত প্রকল্প বেশি হলে অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত গতি আসবে না। পুরনো প্রকল্পে বারবার ব্যয় বাড়ানো মানে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ সংকুচিত হওয়া। দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প সময়মতো শেষ না হলে অর্থনৈতিক রিটার্নও বিলম্বিত হয়, যা প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
পরিকল্পনা কমিশনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বেশ কয়েকটি নতুন প্রকল্প প্রস্তুত হচ্ছে, তবে সেগুলো এখনও সম্পূর্ণ হয়নি। একই সঙ্গে আগের সরকারের নেওয়া প্রকল্পগুলোর মধ্যে অপচয় ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের বিষয়গুলো যাচাই করা হচ্ছে এবং কিছু বাতিলও করা হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রায় ২১টি নতুন প্রকল্প প্রস্তুত করে গেলেও বর্তমান সরকার সেগুলো অনুমোদনের আগে পুনরায় যাচাই করছে।
এ প্রসঙ্গে পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সম্প্রতি বলেছেন, ‘বিগত সরকারের অনেক প্রকল্পে অপচয় ও দুর্নীতির ইস্যু রয়েছে। এ কারণে ১ হাজার ৩০০টির বেশি রিভিউর আওতায় আনা হয়েছে। আর বর্তমানে যেসব প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে, সেগুলোর মূল লক্ষ্য গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করা।’