বাংলাদেশের সংবিধানের মোট ১৫৩টি অনুচ্ছেদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ৭০ অনুচ্ছেদ। জাতীয় সংসদে সরকারি দলের সদস্যদের (এমপি) ‘পরাধীন’ করে রাখার এ অনুচ্ছেদ নিয়ে আপত্তি, সমালোচনাও হয়েছে অনেক। বিশ্লেষকদের মতে, সংসদকে ‘একপেশে’, সরকারকে ‘একনায়ক’ এবং সরকারি দলের সংসদ সদস্যদের মতামতকে দমিয়ে রাখার ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন বা সংস্কারে অনাগ্রহের বড় কারণ ‘রাজনৈতিক’। গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি। ইতিমধ্যে সংসদে নানা বিষয়ে সিদ্ধান্ত হচ্ছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। শিগগিরই হওয়ার সম্ভাবনাও প্রায় নেই বলে আভাস পাওয়া গেছে।
আড়াই বছরের বেশি সময় আগে বিএনপির রাষ্ট্র মেরামতের ৩১ দফায় আস্থা ভোট, অর্থ বিল, সংবিধান সংশোধনী বিল এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িত এমন সব বিষয় ব্যতীত অন্য বিষয়ে সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে মতামত প্রদানের সুযোগ নিশ্চিতের লক্ষ্যে ৭০ অনুচ্ছেদ বিবেচনা করা হবে উল্লেখ করা হয়। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগে দলটির নির্বাচনী ইশতেহারে রাষ্ট্র ব্যবস্থার সংস্কার হিসেবে ৭০ অনুচ্ছেদের সংস্কারের কথাও বলা হয়েছে।
জুলাই জাতীয় সনদের ২৫ নম্বর ক্রমিকে এ অনুচ্ছেদের বিষয়ে বলা হয়েছে, জাতীয় সংসদের সদস্যরা কেবল অর্থ বিল এবং আস্থা ভোট প্রদানের ক্ষেত্রে নিজ দলের প্রতি অনুগত থাকবেন। অন্য যেকোনো বিষয়ে তারা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবেন।
গত বছর জুনে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর দ্বিতীয় পর্বের যে আলোচনা হয়, তাতে শর্তসাপেক্ষে ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন বিষয়ে বিএনপি, জামায়াত ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের প্রতিশ্রুতি ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। অর্থ বিল, আস্থা ভোট ও সংবিধান সংশোধন এমন তিন বিষয় ছাড়া সংসদ সদস্যরা স্বাধীনভাবে দলের বিরুদ্ধেও কথা বলতে পারবেন বলে বিএনপিও তখন একমত পোষণ করে।
পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় বিএনপির পক্ষে মুখ্য ভূমিকা পালনকারী দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং বর্তমানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের মুঠোফোন এবং হোয়াটসআপ নম্বরে যোগাযোগ করলেও তিনি সাড়া দেননি। অবশ্য অন্তর্বর্তী সরকারের ১৩৩ অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাইয়ে গঠিত সংসদের বিশেষ কমিটির সভাপতি ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন বলেন, ৭০ অনুচ্ছেদের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সময় নিয়ে এখনই কিছু বলা যাবে না।
তিনি বলেন, ‘জুলাই সনদে ৭০ অনুচ্ছেদের বিষয়টি ওইভাবে ছিল না। আর অদূর ভবিষ্যতে এ বিষয়ে উদ্যোগের বিষয়ে এখন কিছু বলা যাবে না।’ তিনি বলেন, ‘সেই সময় (বিএনপির ৩১ দফা ও নির্বাচনী ইশতেহার) এ কমিটি ছিল না। নির্বাচনের পর এ কমিটি হয়েছে। কমিটির সদস্যরা কী কী বিষয় উত্থাপন করবেন তা তো আমি বলতে পারব না।’ এক প্রশ্নে বিএনপির এ সংসদ সদস্য বলেন, ‘জুলাই সনদ বিএনপি বাস্তবায়ন করবে, এটা নিশ্চিত। তবে সুনির্দিষ্ট কিছু এখনই বলা সম্ভব নয়।’
Manual8 Ad Code
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের ভাষ্য হলো কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থী হিসেবে কেউ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলে তিনি যদি সেই দল থেকে পদত্যাগ করেন, অথবা সংসদে সেই দলের বিপক্ষে ভোট দেন, তাহলে সংসদে তার সংসদীয় আসন শূন্য হবে। অর্থাৎ সংসদে সরকারি দল কোনো জনস্বার্থবিরোধী, নেতিবাচক সিদ্ধান্ত নিলেও আপত্তি জানাতে পারবেন না সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলের সংসদ সদস্যরা। বিশ্লেষকরা বরাবরই বলে আসছেন, এই অনুচ্ছেদের কারণে সরকারি দলের সদস্যরা যা খুশি তাই মেনে নেন। অন্যদিকে লাভজনক পদ হওয়া, রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় সংসদ সদস্যের দলের বিপক্ষে ভেটো দেওয়ার নজিরও খুব বেশি নেই।
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া মনে করেন কোন পদ্ধতিতে ৭০ অনুচ্ছেদের সুরাহা হবে, সেটি আগে নির্ধারণ করতে হবে। তিনি বলেন, ‘জুলাই সনদের পক্ষে জনগণ তাদের মতামত দিয়েছে। এখন এ অনুচ্ছেদের সংস্কার সংবিধান সংস্কার পরিষদে হবে না কি, সংসদে হবে সে বিষয়ের সুরাহা জরুরি। অর্থাৎ সংস্কারের পদ্ধতিগত বিষয়টির আগে সমাধান হতে হবে। এরপরই বিষয়বস্তুর প্রসঙ্গ আসবে।’ শরীফ ভূঁইয়া আরও বলেন, ‘সংসদে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠ। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন বিষয়ে অদূর ভবিষ্যতে তারা কী করবে তা দেখতে হবে। কাজেই এটি বিষয়বস্তুর পর্যায়ে আসতে আরও সময় লাগবে।’
৭০ অনুচ্ছেদ যখন হাইকোর্টে : দেশের বিচারিক ইতিহাসে সাংবিধানিক গুরুত্বপূর্ণ ও আলোচিত মামলার একটি উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণসংক্রান্ত সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর মামলা। আওয়ামী লীগের আমলে সংসদ সদস্যদের মাধ্যমে বিচারকদের অপসারণের এ সংশোধনী ২০১৬ সালের ৫ মে অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেয় হাইকোর্ট। পূর্ণাঙ্গ রায়ে ৭০ অনুচ্ছেদের কড়া সমালোচনা করে হাইকোর্ট বলে, ‘এ অনুচ্ছেদের ফলে সংসদ সদস্যদের দলের অনুগত থাকতে হয়। তারা দলের হাইকমান্ডের কাছে জিম্মি এবং কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষমতা তাদের নেই।’
Manual4 Ad Code
২০১৭ সালের ৩ জুলাই হাইকোর্টের এ রায় বহাল রেখে আপিল বিভাগ সংখ্যাগরিষ্ঠের ভিত্তিতে যে রায় দেয় তাতে তখনকার প্রধান বিচারপতি এস কে (সুরেন্দ্র কুমার) সিনহা হাইকোর্টের রায়ের পক্ষাবলম্বন করে বলেন, ‘৭০ অনুচ্ছেদের উপস্থিতিতে ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের নির্দেশনা উপেক্ষা করে একজন সংসদ সদস্যের পক্ষে কখনো স্বাধীনভাবে মতামত প্রকাশের সুযোগ থাকে না।’
ষোড়শ সংশোধনী মামলার রিট আবেদনের পক্ষে শুনানিকারী জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, ত্রয়োদশ সংসদে অন্তর্বর্তী সরকারের করা অধ্যাদেশগুলো নিয়ে জরুরি কাজ হয়েছে। অবস্থাদৃষ্টে ৭০ অনুচ্ছেদের বিষয়টি সহসাই সংসদে উঠবে না বলে মনে করেন তিনি।
Manual2 Ad Code
তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক দলের সিদ্ধান্ত ছাড়া সংসদ সদস্যরা নিজের মত প্রকাশ করতে পারেন, সমালোচনা করতে পারেন, দলের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারেন এমন চর্চা আমাদের দেশে নেই। কাজেই স্বাধীনতা দিলেও কতটুকু কাজে লাগবে সেটা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।’ অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলোর মনোভাব এমন যে, সংসদের প্রত্যেকটা জায়গায় যদি সবাই স্বাধীন হয়ে যায় তাহলে শৃঙ্খলা থাকে না। যারা নির্বাচনে জিতল সেই দলের তো কর্তৃত্ব থাকতে হবে। জনগণ তো তাকে কর্তৃত্ব দিয়েছে। এখন সব যদি দলের সংসদ সদস্যদের হাতে ছেড়ে দেন তাহলে তো সেই কর্তৃত্বটা থাকবে না।
২০১৭ সালের এপ্রিলে ৭০ অনুচ্ছেদকে অগণতান্ত্রিক এবং সংবিধানের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক উল্লেখ করে একটি রিট আবেদন করেন আইনজীবী ইউনূস আলী আকন্দ। ২০১৮ সালের ১৫ জানুয়ারি বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী (এখন অবসরে) ও বিচারপতি আশরাফুল কামালের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চ এ ব্যাপারে বিভক্ত আদেশ দেয়। বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী এ অনুচ্ছেদের বৈধতা প্রশ্নে রুল দিয়ে বলেন, ‘৭০ অনুচ্ছেদের কারণে রাজনৈতিক দলের প্রধানদের সিদ্ধান্তের বাইরে যাওয়া যায় না। ফলে সংসদ সদস্যরা নিজ দলের কাছে পরাধীন। গণবিরোধী আইন পাস হলেও তারা নিজের দলের পক্ষে ভোট দিতে বাধ্য। এ অনুচ্ছেদের কারণে সব ক্ষমতার অধিকারী রাজনৈতিক দল, জনগণ নয়।’ তবে তাতে দ্বিমত পোষণ করে বেঞ্চের কনিষ্ঠ বিচারপতি মো. আশরাফুল কামাল ষোড়শ সংশোধনীর মামলার পর্যবেক্ষণে ৭০ অনুচ্ছেদের প্রাসঙ্গিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে বলেছিলেন, এ অনুচ্ছেদের অপব্যবহার হয়েছে, এমন নজির নেই। আদালত আইন প্রণয়ন করতে পারে না। আইন প্রণয়নে নির্দেশ দেওয়ারও এখতিয়ার নেই। শুধু সংসদে প্রণীত আইন সংবিধান পরিপন্থী কি না, সেটি বলতে পারে। জনগণের ভোটে নির্বাচিত আইন প্রণেতারা কী উদ্দেশ্যে আইন করছেন তা নিয়েও আদালত প্রশ্ন তুলতে পারে না।’
বিভক্ত আদেশ হওয়ায় মামলাটি পরে প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠানো হয়। প্রধান বিচারপতি নতুন কোনো বেঞ্চ নির্ধারণ করেন। এ রিট মামলাটির সর্বশেষ অবস্থা জানতে চাইলে সম্প্রতি অ্যাডভোকেট ইউনূস আলী আকন্দ বলেন, বিভক্ত আদেশের পর প্রধান বিচারপতি আরেকটি দ্বৈত বেঞ্চে বিষয়টি শুনানির জন্য পাঠান। তবে সেই বেঞ্চ আবেদনটি খারিজ করে দেয়। তিনি জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম দিকে ৭০ অনুচ্ছেদের বিষয়ে একটি রিট মামলা হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চে উপস্থাপন করলেও সেটি কার্যতালিকায় আসেনি। এ আইনজীবী মনে করেন অতীতের সরকারের মতো বিএনপি সরকার এ অনুচ্ছেদের সংস্কার করবে না। কেননা নিজেদের এমপিদের ওপর তারা কর্তৃত্ব ছাড়বে না। বিষয়টি তিনি আবারও হাইকোর্টের নজরে আনবেন।’