অতিরিক্ত ভর্তুকির চাপে নাকাল বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত
অতিরিক্ত ভর্তুকির চাপে নাকাল বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত
editor
প্রকাশিত এপ্রিল ১২, ২০২৬, ০৯:৪২ পূর্বাহ্ণ
Manual8 Ad Code
Manual2 Ad Code
প্রজন্ম ডেস্ক:
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ দেশের আমদানিনির্ভর জ্বালানি খাতকে নতুন করে সংকটের মধ্যে ফেলেছে। বৈশ্বিক সংকটের কথা মাথায় রেখেই চাহিদার সঙ্গে সরবরাহ ঠিক রাখতে বাড়তি দামে জ্বালানি কিনতে হচ্ছে সরকারকে। এদিকে বিপুল পরিমাণ বকেয়ার সঙ্গে জ্বালানির বাড়তি মূল্য দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতকে নতুন করে চাপে ফেলে দিয়েছে। বর্তমান চাপ সামাল দিতে এরই মধ্যে বাড়তি অর্থ বরাদ্দ দেওয়ার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে প্রস্তাব দিয়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যুদ্ধের কারণে জ্বালানি করিডোর হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও জ্বালানি সংকট প্রকট হয়েছে। এর সঙ্গে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় থেকে শুরু হওয়া বকেয়া সমস্যা ক্রমেই জটিল আকার ধারণ করেছে। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কিছু অর্থ পরিশোধ করা হলেও গত বছরের জুলাই থেকে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ আবারও অনিয়মিত হয়ে পড়ে। এরই মধ্যে সরকারের কাছে দেশি-বিদেশি কোম্পানিগুলোর বিদ্যুৎ বিক্রির বকেয়া বিল ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। কোম্পানিভেদে বর্তমানে সর্বনিম্ন ছয় থেকে সর্বোচ্চ ১৪ মাস পর্যন্ত বিল বকেয়া পড়েছে। বর্তমানে এ পরিস্থিতি সামাল দিতে ২০ হাজার কোটি টাকার বেশি বাড়তি ভর্তুকি চেয়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগ। বর্তমানে মাসে আড়াই থেকে তিন হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া হলেও অতিরিক্ত ভর্তুকি অনুমোদিত হলে তা গিয়ে দাঁড়াবে পাঁচ হাজার কোটি টাকা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বর্তমানে প্রতি মাসে প্রায় ৩ হাজার ২৫০ কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া হলেও তা পর্যাপ্ত নয়। তাই এর সঙ্গে আরও প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা করে বাড়তি ভর্তুকি চাওয়া হয়েছে সরকারের কাছে। সম্প্রতি অর্থ বিভাগের কাছে পাঠানো এক প্রস্তাবে বলা হয়েছে, নতুন উৎপাদন ইউনিটগুলোর বকেয়া বিল পরিশোধ এবং প্রাথমিক জ্বালানির ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের চাপ সামাল দিতেই মূলত জরুরি ভিত্তিতে অতিরিক্ত এ অর্থ প্রয়োজন। এ প্রেক্ষাপটে চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত ১০ মাসের জন্য অতিরিক্ত ২০ হাজার ১৩৬ কোটি টাকা ভর্তুকি চেয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ।
বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ও যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। বর্তমানে প্রতি লিটার ডিজেল ১০০ টাকায় বিক্রি হলেও প্রকৃত মূল্য প্রায় ১৫৫ টাকা হওয়া উচিত। এ কারণে সরকারকে প্রতি মাসে প্রায় আড়াই হাজার থেকে ৩ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি বহন করতে হচ্ছে।
বিদ্যুৎ বিভাগ ও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) সূত্রে জানা গেছে, সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র মিলিয়ে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বকেয়া বিলের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। মার্চের বিল জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া এখনও চলমান। সেটি যুক্ত হলে তা আরও বাড়বে।
Manual2 Ad Code
অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে বকেয়াসহ ভর্তুকি বাবদ মোট ব্যয় হয়েছে প্রায় ৫৯ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ৩৭ হাজার কোটি টাকা, যা সংশোধিত বাজেটে কমিয়ে ৩৬ হাজার কোটি টাকা করা হয়। এর মধ্যে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আট মাসে ইতোমধ্যে ২৬ হাজার কোটি টাকা ছাড় করা হয়েছে। এ হিসাবে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৩ হাজার ২৫০ কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী অতিরিক্ত ভর্তুকি অনুমোদিত হলে মাসিক ব্যয় দাঁড়াবে ৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এতে পুরো অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির পরিমাণ ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমান রাজস্ব আহরণের পরিস্থিতিতে এত বড় অঙ্কের ভর্তুকি জোগান দেওয়া কঠিন।
এদিকে বিদ্যুৎ সরবরাহের মূল সংস্থা বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি পিএলসি (পিজিসিবি) সূত্র বলছে, দেশে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৯ হাজার মেগাওয়াট। এবারের গ্রীষ্মে সর্বোচ্চ চাহিদা হতে পারে সাড়ে ১৮ হাজার মেগাওয়াট। এরই মধ্যে ১৫ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছেছে। বিদ্যমান যুদ্ধাবস্থায় চাহিদামতো গ্যাস, কয়লা ও ফার্নেস অয়েল জোগান দেওয়াও কঠিন হবে বলে মনে করছেন তারা। তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করে এক মাসেই ঘাটতি হয়েছে সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে চলতি এপ্রিল ও আগামী মে মাসে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়তেই থাকবে। দুই মাসে লোডশেডিং নিয়ন্ত্রণ করতে হলে বিদ্যুতের চাহিদা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এরই অংশ হিসেবে সরকার সন্ধ্যার পর সর্বোচ্চ চাহিদার সময় দোকান ও বিপণিবিতান বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া নিয়েছে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের (এসি) ব্যবহার নিয়ন্ত্রণেরও আহ্বান জানানো হয়েছে।
Manual4 Ad Code
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান শর্তসাপেক্ষে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার কারণে সাময়িকভাবে স্বস্তি ফিরে এলেও সংকট সমাধানে আরও সময় লাগবে বলে মনে করা হচ্ছে। এই অবস্থায় আরও অন্তত দুই মাস উচ্চ দামে জ্বালানি কিনতে হবে। এরই মধ্যে গত বুধবার যুদ্ধের জন্য সৃষ্ট উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে বাড়তি জ্বালানি চাহিদা মেটাতে দুই লাখ টন ডিজেল আমদানির প্রস্তাব নীতিগতভাবে অনুমোদন করেছে অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। এ ডিজেল কেনা হবে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে অর্থাৎ উন্মুক্ত কোনো দরপত্র ডাকা হবে না।
Manual2 Ad Code
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক বলেন, স্থায়ীভাবে সংঘাত বন্ধ হলেই প্রকৃত স্বস্তি আসবে। তিনি জানান, যুদ্ধের কারণে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী বেশ কয়েকটি এলএনজিবাহী জাহাজ দেশে আসতে পারেনি। সেই ঘাটতি পূরণে খোলাবাজার থেকে উচ্চমূল্যে এলএনজি সংগ্রহ করতে হয়েছে।
এদিকে জ্বালানি নিয়ে দেশের মধ্যে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে তা পুরোপুরি কাটতে হলে আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ বন্ধের ঘোষণা আসতে হবে বলে মনে করেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ম. তামিম। তিনি বলেন, জ্বালানি নিয়ে মানুষের মধ্যে একটা আতঙ্ক কাজ করছে। এই গণআতঙ্ক থেকেই সবাই প্রয়োজনের তুলনায় বেশি তেল নিয়ে মজুদ করার চেষ্টা করছেন। তবে আতঙ্ক দূর হওয়ার জন্য যুদ্ধ বন্ধের বিষয়টি খুব জরুরি। তা না হলে কোনোভাবেই এই আতঙ্ক কাটবে না।