মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি সংকটে নাজেহাল দেশের মানুষ। বৈশাখ শুরু হতেই আবহাওয়া আরও উত্তাপ ছড়াচ্ছে। সেই সঙ্গে রাজধানীসহ সারা দেশে বেড়েছে লোডশেডিং। এতে ভোগান্তিতে থাকা মানুষের দুর্দশা আরও বেড়েছে। এ যেন বোঝার ওপর শাকের আঁটি।
তবে গ্রামের তুলনায় শহরে লোডশেডিং কম হচ্ছে। শহরে লোডশেডিং হচ্ছে সারা দিনে ১ থেকে ২ ঘণ্টা। তবে গ্রামে ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। ঘণ্টায় লোডশেডিং কখনো ২ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত হচ্ছে।
বরিশাল, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, কেরানীগঞ্জ, রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, রাজশাহী বিভাগের বগুড়া, নাটোর, সিরাজগঞ্জ ও নওগাঁ বিশেষ করে লালপুর, রানীনগর, সিংড়া ও উল্লাপাড়ায় লোডশেডিং অসহনীয় হয়ে উঠেছে। এ ছাড়া সিলেট বিভাগ, চট্টগ্রাম বিভাগের কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তীব্র লোডশেডিংয়ের খবর পাওয়া গেছে।
খুলনা বিভাগের খুলনা, যশোর ও বাগেরহাট অঞ্চলের পরিস্থিতির তুলনায় সাতক্ষীরা, কুষ্টিয়া ও মাগুরা অঞ্চলে বেশি লোডশেডিং করা হচ্ছে, ময়মনসিংহ জেলায় বিভিন্ন সময়ে ৫০ থেকে ১০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে, জামালপুর জেলা এবং তারাকান্দা, ফুলপুর, ধোবাউড়া, ফুলবাড়িয়া ও মুক্তাগাছা উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিং পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ।
Manual8 Ad Code
একদিকে গরম বেড়ে যাওয়া, অন্যদিকে লোডশেডিংয়ের কারণে গ্রামে ভোগান্তি বেড়েছে। বিশেষ করে বয়স্ক, শিশু ও অসুস্থদের ভোগান্তির যেন শেষ নেই। এর বিরূপ প্রভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে ক্ষুদ্র শিল্প-বাণিজ্য।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকা বিভাগের সর্বত্রই লোডশেডিং পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে উঠেছে। অনেক জেলা-উপজেলায় চাহিদার অর্ধেকেরও কম বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। অন্যদিকে রাজবাড়ী, মুন্সীগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জ জেলা শহরে লোডশেডিং পরিস্থিতি কিছুটা সহনীয়।
পিডিবি বলছে, বিদ্যুতের ৩টি ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং কয়লা সংকটে লোডশেডিং বেড়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে গ্যাস ও তেল সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া এবং গরমে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাওয়া। তবে বন্ধ থাকা ইউনিটগুলো উৎপাদনে ফিরেছে। শুক্রবার থেকে মাতারবাড়ি কেন্দ্র থেকে উৎপাদন বাড়বে। বিশেষ করে কয়লা সাপ্লাই বেড়ে গেলে পরিস্থিতির অনেক উন্নতি হবে।
পিজিসিবির তথ্যমতে, লোডশেডিং দুই হাজার মেগাওয়াট ছুঁয়েছে। সকাল ৭টা থেকে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে। প্রচণ্ড গরমের কারণে এই চাহিদা ১৪ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে।
বৃহস্পতিবার সকাল ৭টায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৩ হাজার মেগাওয়াট, এই সময় উৎপাদিত হয়েছে ১১ হাজার ৯১৮ মেগাওয়াট।লোডশেডিং করতে হয়েছে ১ হাজার ৩৩ মেগাওয়াট। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়েছে। দুপুর ১২টায় এই চাহিদা ১৪ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায়। এই সময় চাহিদা ১৪ হাজার ২৫০ মেগাওয়াটের বিপরীতে উৎপাদিত হয় ১২ হাজার ৪১৭ মেগাওয়াট। দুপুর ১টায় সর্বোচ্চ ১ হাজার ৯৩৫ মেগাওয়াট লোডশেডিংয়ের তথ্য দেওয়া হয়েছে। বাস্তবে লোডশেডিংয়ের চিত্র আরও বেশি।
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গ্যাস ও জ্বালানি তেলের চলমান সংকটের সঙ্গে যোগ হয়েছে কয়লার স্বল্পতা। এতে বড় কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে দিনে প্রায় ১ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম আসছে। এ ছাড়া নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আসা বন্ধ রয়েছে। ফলে উৎপাদন সক্ষমতা চাহিদার দ্বিগুণ হলেও ঘাটতি মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। লোড ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হচ্ছে।
এই লোড সমভাবে বণ্টন হচ্ছে না। রাজধানীসহ জেলা শহরগুলোতে অগ্রাধিকার দিয়ে নামমাত্র লোডশেডিং করে পল্লী অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।
Manual4 Ad Code
উৎপাদন ও ঘাটতি : চলতি মাসে গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে লোডশেডিং। মাসের শুরুতে এক হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং হলেও এখন তা দুই হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে। তেল-গ্যাস স্বল্পতায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে পাঁচ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন এমনিতেই কম হচ্ছে।
Manual1 Ad Code
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) চলতি মাসের জন্য ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস চাইলেও দেওয়া হচ্ছে ৯২-৯৩ কোটি ঘনফুট। ব্যয়বহুল বলে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো কম চালানো হচ্ছে; এর সঙ্গে রয়েছে বকেয়া বিল। প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা পাওনা থাকায় উদ্যোক্তারা তেল আমদানির ঋণপত্র খুলতে পারছেন না।
গত রোববার সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ১০৩ মেগাওয়াট। সেদিন সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৯৫০ মেগাওয়াট। গত সোমবার সর্বোচ্চ বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল ১ হাজার ১০০ মেগাওয়াট।
মঙ্গলবার পহেলা বৈশাখের ছুটি থাকায় বিদ্যুতের চাহিদা কম ছিল। তারপরও ১ হাজার মেগাওয়াটের ওপর লোডশেডিং করতে হয়। গত বুধবার বিকাল ৪টায় সাড়ে ১৪ হাজার মেগাওয়াট চাহিদার সময় প্রায় ১ হাজার ৯০০ মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হয়। রাতে এই ঘাটতি আরও বাড়বে। কারণ সন্ধ্যার পর বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) পরিচালক (উৎপাদন) জহুরুল ইসলাম বলেন, সম্প্রতি তিনটি বড় বিদ্যুৎ উৎপাদন ইউনিট হঠাৎ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়। এর মধ্যে ভারতের আদানি পাওয়ারের একটি ইউনিট এবং রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি ইউনিট পরপর বন্ধ হয়ে যাওয়া একটি বড় কারণ ছিল।
যদিও এই ইউনিটগুলো একে একে আবার উৎপাদনে ফিরে আসতে শুরু করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কয়লার সরবরাহ ব্যবস্থায় কিছুটা বিঘ্ন ঘটেছে, যা বর্তমানে লোডশেডিং বাড়ার অন্যতম প্রধান কারণ। এ ছাড়া গ্যাস ও ফার্নেস অয়েলেরও কিছুটা স্বল্পতা রয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) তেল সরবরাহের ক্ষেত্রে কিছুটা রক্ষণশীল অবস্থান গ্রহণ করেছে। অন্যদিকে তীব্র গরমের কারণে বিদ্যুতের চাহিদাও আগের চেয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে।
তিনি বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন সচল রাখতে সরকার বর্তমানে সার কারখানাগুলোতে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রেখে তা বিদ্যুৎকেন্দ্রে দেওয়ার চেষ্টা করছে। এর ফলে বর্তমানে গ্যাস দিয়ে ৫ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা আশা প্রকাশ করেছেন যে, মাতারবাড়ি বিদ্যুৎকেন্দ্র আজ শুক্রবার থেকে তাদের উৎপাদন ক্ষমতা বাড়াবে। পাশাপাশি এসএস পাওয়ারের কয়লা আসারও কথা রয়েছে। কয়লা সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক হলে এবং রক্ষণাবেক্ষণ শেষে সবগুলো ইউনিট পুরোপুরি চালু হলে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে। ২ থেকে ৩ দিনের মধ্যে পরিস্থিতির সন্তোষজনক উন্নতির সম্ভাবনা রয়েছে।