বিদেশে কর্মসংস্থানে যুদ্ধের ধাক্কা, মার্চে জনশক্তি রপ্তানি নেমেছে অর্ধেকে
বিদেশে কর্মসংস্থানে যুদ্ধের ধাক্কা, মার্চে জনশক্তি রপ্তানি নেমেছে অর্ধেকে
editor
প্রকাশিত এপ্রিল ১৩, ২০২৬, ১০:০১ পূর্বাহ্ণ
Manual3 Ad Code
প্রজন্ম ডেস্ক:
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ধাক্কা লেগেছে বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থানে। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ওই অঞ্চলে যে সংঘাত তৈরি হয়েছে, তার প্রভাবে মার্চ মাসে জনশক্তি রপ্তানি নেমে গেছে অর্ধেকের নিচে।
Manual4 Ad Code
ওই মাসে বাংলাদেশ থেকে বিশ্বের ৭৬টি দেশে জনশক্তি রপ্তানি হয়েছে ৪৪ হাজার ৬৫৮জন। গত বছরের মার্চ মাসে রপ্তানি হয়েছিল এক লাখ ৫ হাজার ২৭ জনশক্তি।
আর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে জনশক্তি রপ্তানি হয়েছিল ৬৫ হাজার ৬৩৪জন। অর্থাৎ গত বছরের মার্চের তুলনায় এ বছরের মার্চে জনশক্তি রপ্তানি প্রায় ৫৭ দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে।
আর আগের মাস ফেব্রুয়ারির তুলনায় মার্চে জনশক্তি রপ্তানি কমেছে প্রায় ৩১ দশমিক ৯ শতাংশ।
Manual6 Ad Code
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা শুরুর পর মধ্যাপ্রাচ্যে বিমান চলাচলে ধাক্কা লাগে।
ইরান প্রতিশোধমূলক হামলা শুরু করলে ওই অঞ্চলের বিমান চলাচলে বিপর্যয় নেমে আসে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, এই পরিস্থিতির কারণে মার্চে বিদেশে লোক পাঠানো ব্যাহত হয়। এ কারণে ভিসা-টিকিট রেডি থাকলেও বিপুল সংখ্যক মানুষ যেতে পারেননি শ্রমবাজারে। যুদ্ধের কারণে বিমান চলাচল বন্ধ থাকার কারণে অনেকে টিকিটও কাটেননি। আবার অনেক জনশক্তি আমদানিকারক টিকিট ও ভিসা গ্রহণ থেকে বিরত থাকে। ফলে জনশক্তি রপ্তানি আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে।
দেশের জনশক্তি রপ্তানির প্রধান বাজার সৌদি আরব। দেশটিতে যুদ্ধ চলাকালে চলতি বছরের মার্চ মাসে জনশক্তি রপ্তানি হয়েছে ২৪ হাজার ৮৬২ জন। এরপর জনশক্তি রপ্তানি হয় সিঙ্গাপুরে ৫ হাজার ৯৪৬ জন, কাতারে ৩ হাজার ৯৭৩ জন, মালদ্বীপে ১ হাজার ৭৫৬ জন, কুয়েতে ১ হাজার ৫৩৯ জন্য এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৯০৪ জন।
Manual1 Ad Code
গত ২০২৫ সালের মার্চ মাসে সৌদি আরবে জনশক্তি রপ্তানি হয়েছিল ৮০ হাজার ৭০২ জন। এরপর কাতারে ৯ হাজার ৬৩ জন, সিঙ্গাপুরে ৫ হাজার ১২৯ জন, কুয়েতে ২ হাজার ৪৩৭ জন এবং জর্ডানে ১ হাজার ১৪০ জনের কর্মসংস্থান হয়।
Manual8 Ad Code
যেই ফেব্রুয়ারি মাসে সংঘাতের শুরু, সে মাসেও বৈদেশিক কর্মসংস্থান হয়েছিল ৬৫ হাজার ৬৩৪। এর মধ্যে সৌদিতে গিয়েছে ৪৪ হাজার ৩৮২ জন, সিঙ্গাপুরে গেছে ৪ হাজার ৫৮১ জন, কাতারে গেছে ৩ হাজার ৮০৪ জন, কুয়েতে গেছে ১ হাজার ৮৫২ জন এবং জর্ডানে গেছে ১ হাজার ২৬৭ জন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যুদ্ধাবস্থার কারণে শ্রমবাজারের নিয়োগদাতারা নতুন করে লোক নেওয়া স্থগিত করে। পাশাপাশি পুরোনো আদেশও বন্ধ রাখে। এই বিপদসংকুল অবস্থায়ও ঝুঁকি নিয়ে সীমিত আকারে লোক যাচ্ছে।
“অনেক কফিল (নিয়োগকর্তা) নিষেধ করছেন, বলছেন ‘এখন এসো না’। আবার অনেকেই বেশি টাকা খরচ করে কোনো রকমে যাচ্ছেন। কিছু কর্মী বলছেন, ভিসা তো লাগানোই আছে, দুই মাস সময় আছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পরে যাব।”
এ বিষয়ে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির (বায়রা) সিনিয়র সহ-সভাপতি মোহাম্মদ আবু জাফর বলেন, এখন তো আসলে কিছু বলার নেই! আমরা লোকজন পাঠাতে পারছি না, ভিসা বন্ধ। আর যাদের ভিসা আছে, তারাও যেতে পারছে না। কারণ, মাত্র ১০ শতাংশ ফ্লাইট চলছে। গত কয়েক মাস ধরেই আমরা লোকসানে আছি। টিকিট করা হচ্ছে, আবার রিফান্ড করতে হচ্ছে। ফ্লাইট দেওয়া হচ্ছে, আবার বাতিল হচ্ছে। এতে অবশ্য এয়ারলাইন্সগুলোরও দোষ নেই। যুদ্ধের মধ্যে তারা কী করবে! এতগুলো যাত্রী নিয়ে উড়াল দেওয়ার পর যদি বোমা মারা হয়, তখন কী হবে? সবাই আতঙ্কিত, এটাই মূল বিষয়।
তিনি আরও বলেন, মার্চ মাসজুড়ে এবং চলতি মাসের ৭-৮ দিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ চলছে। বাংলাদেশের প্রধান শ্রম বাজারের তথ্য বলছে, এ সময়ে স্বাভাবিক যে সংখ্যক লোক যেতেন, এখন সেখানে লোক পাঠাতে সমস্যা হচ্ছে। অনেক কফিল (নিয়োগকর্তা) নিষেধ করছেন, বলছেন ‘এখন এসো না’। আবার অনেকেই বেশি টাকা খরচ করে কোনো রকমে যাচ্ছেন। কিছু কর্মী বলছেন, ভিসা তো লাগানোই আছে, দুই মাস সময় আছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পরে যাব।
বিশ্বের প্রায় শতাধিক দেশের শ্রমবাজারে এক কোটির বেশি বাংলাদেশি কাজ করছেন। ২০২৫ সালের মার্চে চাকরি নিয়ে বিদেশে যারা গেছেন তাদের প্রায় ৯০ শতাংশই গেছেন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে। এর মধ্যে আবার সৌদি আরবে গেছেন ৭৫ শতাংশ।
ফলে সৌদি আরব বা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে সংকট তৈরি হলেই বাংলাদেশের সংকট তৈরি হয়। এবারের ইরান যুদ্ধও সেই চিত্র সামনে আনলো।
গত ৫ এপ্রিল জাতীয় সংসদের ত্রয়োদশ অধিবেশনে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানান, গত ২০২৫ সালে মোট ১১ লাখ ৩২ হাজার ৫১৯ জন বাংলাদেশি কর্মী বিদেশে কর্মসংস্থান পেয়েছেন। এর মধ্যে নারী কর্মীর সংখ্যা ৬২ হাজার ৩৫২ জন।
সংঘাতসহ নানা বাস্তবতায় মধ্যপ্রাচ্যনির্ভরতা থেকে সরে জাপানসহ বিভিন্ন অঞ্চলে শ্রমবাজার সম্প্রসারণে উদ্যোগের কথা বলে আসছে সরকার।
সংসদ অধিবেশনে মন্ত্রী জানান, মালয়েশিয়া, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনের মতো বন্ধ বা সংকুচিত শ্রমবাজারগুলো পুনরায় চালুর লক্ষ্যে নিবিড় কূটনৈতিক আলোচনা চলছে। বর্তমানে সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, রোমানিয়া, সিসেলস, পর্তুগাল ও রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে নিয়মিত কর্মী পাঠানো হচ্ছে। ইতোমধ্যে ১৮টি দেশের সাথে কর্মী প্রেরণের বিষয়ে সমঝোতা স্মারক বা চুক্তি সই হয়েছে।
জাপানের শ্রমবাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী হচ্ছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, ‘আইএম জাপান’-এর আওতায় টেকনিক্যাল ইন্টার্ন হিসেবে বিনা অভিবাসন ব্যয়ে কর্মী পাঠানো হচ্ছে। আগামী ৫ বছরে এক লাখ কর্মী পাঠানোর লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে ‘জাপান সেল’ গঠন করা হয়েছে।