দেশের প্রশাসনিক কাঠামো দীর্ঘদিনের অকার্যকারিতা, রাজনৈতিক প্রভাব ও জবাবদিহিতার ঘাটতিতে ভুগছিলÑ এমন অভিযোগ নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেই ভঙ্গুর প্রশাসনকে সচল ও জনমুখী করতে সরকারের নানা উদ্যোগে কিছুটা গতি ফিরতে শুরু করেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। বিশেষ করে, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তারের সক্রিয় তৎপরতা প্রশাসনে শৃঙ্খলা ও কার্যকারিতা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে সরকারের বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে।
Manual3 Ad Code
বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার মনে করে, পূর্ববর্তী সময়ে প্রশাসনের একটি বড় অংশ রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে থাকতে পারেনি। অনেক ক্ষেত্রে সরকারি কর্মকর্তারা নিরপেক্ষ ভূমিকার পরিবর্তে দলীয়কর্মীর মতো আচরণ করেছেন, যা প্রশাসনের মূল চরিত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এই প্রেক্ষাপটে নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী প্রশাসনকে মেধাভিত্তিক, দক্ষ ও জবাবদিহিতামূলক কাঠামোয় রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই সরকারি দপ্তরগুলোতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, কাজের গতি বাড়ানো এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন। তার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকে ১৮০ দিনের একটি বিশেষ কর্মপরিকল্পনা অনুমোদন করা হয়।
সরকারের ঘোষিত পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রতিটি মন্ত্রণালয়কে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজের রূপরেখা জমা দিতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষিত ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যের আওতায় ৫১ দফা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজও শুরু হয়েছে। এই পরিকল্পনায় প্রশাসনিক সংস্কার, নতুন পদ সৃষ্টি, শিক্ষা ও ডিজিটাল খাতের সম্প্রসারণ, স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণ এবং ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া সাংবিধানিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতিও রয়েছে, যা ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রশাসনে গতিশীলতা আনতে ইতোমধ্যে সচিব, বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক (ডিসি), উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং সহকারী কমিশনারদের মধ্যে ব্যাপক রদবদল করা হয়েছে। সরকারের দাবি, এসব পদায়ন ও পদোন্নতিতে মেধা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে প্রধান বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
Manual5 Ad Code
এ প্রসঙ্গে এ বি এম আব্দুস সাত্তার বলেন, প্রশাসনকে জনগণের দোরগোড়ায় নিয়ে যেতে হলে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে মেধা, সততা ও দক্ষতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। শূন্যপদে দ্রুত নিয়োগ, প্রশাসনিক সংস্কার কমিশন গঠন, শক্তিশালী পাবলিক সার্ভিস কমিশন প্রতিষ্ঠা এবং বেসরকারি সার্ভিস রুল প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় সরকার বিভাগ ইতোমধ্যে সিটি করপোরেশন প্রশাসক ও অন্যান্য কর্মকর্তাদের নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে সরাসরি জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে। গত ২২ এপ্রিল দেওয়া এক নির্দেশনায় বলা হয়েছে, জনপ্রতিনিধিদের আরও দায়িত্বশীল হয়ে জনগণের সমস্যার কথা শুনতে হবে এবং দৃশ্যমান উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে।
Manual5 Ad Code
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীকেন্দ্রিক প্রশাসনিক কাঠামো স্থানীয় পর্যায়ের সেবা প্রদানে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই বিকেন্দ্রীকরণ এখন সময়ের দাবি।
প্রশাসনিক সংস্কার নিয়ে অতীতেও নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় ধরনের অগ্রগতি দেখা যায়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ এ ক্ষেত্রে প্রধান বাধা।
Manual2 Ad Code
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ড. আব্দুস সবুর বলেন, বিএনপি নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার স্বল্প সময়ে অনেক পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। তবে বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা বড় চ্যালেঞ্জ। পাশপাশি প্রশাসনে থাকা বঞ্চিত কর্মকর্তাদের পুনর্বাসন এবং মেধার ভিত্তিতে পদায়ন নিশ্চিত করা গেলে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।
সূত্র জানায়, সরকার ইতোমধ্যে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে নতুন সচিব ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়োগ দিয়েছে। জনপ্রশাসন, স্বরাষ্ট্র, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ভূমি, শিল্প, শ্রমসহ বিভিন্ন খাতে নতুন নেতৃত্ব দায়িত্ব নিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রশাসন সংস্কার একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। শুধু পদায়ন বা বদলি দিয়ে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সম্ভব নয়; প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং ধারাবাহিক প্রয়াস। বর্তমান উদ্যোগগুলো যদি বাস্তবায়নের ধারায় থাকে, তাহলে প্রশাসনে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। তবে অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, এই পথ সহজ নয়।
সব মিলিয়ে, ভঙ্গুর প্রশাসনকে ঘুরে দাঁড় করাতে সরকারের উদ্যোগ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার মুখে। এই প্রচেষ্টা কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করছে বাস্তবায়নের ওপর।