রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবন। অষ্টম তলার করিডরে বসে আছেন রঞ্জিত বাবু।
মাথা নিচু করে স্থির দৃষ্টি দিয়ে কী যেন দেখছেন। জামা-কাপড়ের মতো মুখটাও মলিন।
চিন্তার ছাপ তার চোখে-মুখে ফুটে উঠেছে।
কাছে গিয়ে কী জন্য এখানে এসেছেন-জিজ্ঞেস করলে কেবল চোখ তুলে তাকালেন।
কিছু না বলায় ফের জানতে চাওয়ায় উত্তর মেলে-জন্ম নেওয়াই পাপ হইছে। তাই জন্মতারিখ সংশোধনের জন্য ঘুরছি।
নির্বাচন ভবনের পুরো আটতলাতেই সম্পন্ন হয় জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সংশোধনের কাজ। এখানেই এনআইডি অনুবিভাগ। সম্প্রতি বয়স সংশোধনের এখতিয়ার মাঠ কর্মকর্তাদের কাছ থেকে পুরোপুরি ন্যস্ত করা হয়েছে এনআইডি মহাপরিচালকের হাতে। ফলে রঞ্জিত বাবুদের এখন কুষ্টিয়ার দৌলতপুর থেকে রাজধানীতে আসা ছাড়া উপায় কী!
এই ভুক্তভোগী আক্ষেপ করে বলেন, চারবার আইছি ঢাকায়। আমি একজন ঝাড়ুদার। জন্ম সন ১৯৭৯ আছে। সংশোধন করে ১৯৮১ সালে নেওয়া লাগবে। কোনোভাবেই তো হচ্ছে না। এই নিয়ে চারবার ঢাকার এই অফিসে এসেছি। কিন্তু হচ্ছে না।
তিনি বলেন, আমরা গরিব মানুষ। প্রতিবার ঢাকায় আসতে কয়েক হাজার টাকা করে খরচ হইছে। এই কষ্ট কারে কবো। কী করবো।
রঞ্জিতের মতো আরো অনেকের সঙ্গেই দেখা মিলল। তাদের কারো দু’বছর, কারো পাঁচ বছর বয়স সংশোধন। এক্ষেত্রে অনেকের কেবল সন সংশোধনের প্রয়োজন, তারিখ বা মাস ঠিক আছে।
জান্নাত এসেছেন তার মায়ের এনআইডির বয়স সংশোধনে। বাড়ি ময়মনসিংহ। বড় বোন যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন। মাকে নিয়ে যেতে চান। তার জন্ম সন ১৯৫৩ সালের জায়গায় ১৯৫০ করতে হবে।
তিনি বলেন, এই সংশোধনের জন্য ঢাকায় এসে থাকা, খাওয়ার যে ব্যয়; এটা খুব পীড়াদায়ক। তারওপর সংশোধন হবে কি না, তারও তো কোনো ঠিক নেই। এতে ভোগান্তি, অর্থ ব্যয় দুটিই বাড়ছে। তাই নির্বাচন কমিশনের উচিত জেলা পর্যায়েই এই সেবা দেওয়া। এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় প্রমাণপত্র নিয়ে শুনানি ওখানে নিলে মানুষ সেবা পাবে। না হলে ভোগান্তির কোনো শেষ নেই।
Manual6 Ad Code
ইসি কর্মকর্তা বলছেন, মাঠ পর্যায়ে এই সেবা বিকেন্দ্রীকরণ করা হয়েছিল। কিন্তু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনিয়মের কারণ দেখিয়ে এই সিদ্ধান্তে এসেছে কমিশন। তবে এতে মানুষের কষ্ট, দুর্ভোগ বেড়েছে। শারীরিক কষ্টের সঙ্গে আর্থিক বিষয়ও জড়িত রয়েছে। কারণ, ঢাকায় একবার এসে থাকা-খাওয়ায় তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকার খরচ আছে। এনআইডি সংশোধন মাঠেই হওয়া উচিত। কিছু জটিল ক্ষেত্রে এখানে আপিল শুনানি করা যেতে পারে। তাই ঢালাও নয়।
Manual3 Ad Code
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, সারা পৃথিবীতে সেবা বিকেন্দ্রীকরণ করা হয়। দোরগোড়ায় নিয়ে যাওয়া হয়। আর এখানে হচ্ছে উল্টো। দোরগোড়ায় যাবে কী, অনেকের পুরো পরিবারকেই এখানে শুনানিতে আসতে হয়। এটা সেবার নামে অনেকটা অত্যাচার।
কর্মকর্তারা বলছেন, কেবল বয়স সংশোধন নয়, অন্যান্য তথ্য সংশোধনও আগের চেয়ে কঠিন করা হয়েছে। ফলে যে তথ্যগুলো মাঠ পর্যায়ে সংশোধন করা যায়, সেগুলোও নিয়ে ভোগান্তির সৃষ্টি হচ্ছে।
এনআইডি সংশোধনের জন্য সম্প্রতি স্ট্যান্ডার্ড অপারেশন প্রসিডিউর (এসওপি) সংশোধন করে এমন অবস্থার সৃষ্টি করেছে সংস্থাটি। সংশোধিত এসওপি অনুযায়ী সংশোধনের আবেদনের ধরন অনুযায়ী সাতটি ক্যাটাগরি করা হয়। এগুলো হলো-ক, ক-১, খ, খ-১, গ, গ-১ ও ঘ। এক্ষেত্রে আবেদনের জটিলতা অনুযায়ী ক থেকে ঘ পর্যন্ত ক্যাটাগরি নির্ধারিত হয়। আবেদন জমা পড়ার পর নির্দিষ্ট কর্মকর্তারা ক্যাটাগরি নির্ধারণ করে থাকেন।
ক-১ ক্যাটাগরি তথা, করণিক ভুল, স্বাক্ষরের পরিবর্তনের মতো আবেদনগুলোর জন্য সহকারী উপজেলা কর্মকর্তাকে নিষ্পত্তির ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
মূল নাম ঠিক রেখে বানান ঠিক করার মতো আবেদনগুলো ক ক্যাটাগরিতে রাখা হয়, যা সংশোধনের ক্ষমতা উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তাকে দেওয়া হয়েছে।
আবার বানান পরিবর্তনের কারণে নাম পরিবর্তন হয়ে যায় এমন আবেদনগুলো খ ক্যাটাগরিতে রাখা হয়। এসব আবেদন নিষ্পত্তি করেন জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা।
পুরো নাম পরিবর্তনের আবেদনগুলো গ ক্যাটাগরিতে নিষ্পত্তি করেন আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা। ধর্ম পরিবর্তনের কারণে নাম পরিবর্তন বা শিক্ষাগত যোগ্যতা পরিবর্তনের মতো আবেদনগুলো খ-১ ক্যাটাগরিতে নিষ্পত্তি করেন অতিরিক্ত জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা। এদিকে খ ও খ-১ ক্যাটাগরিতে বাতিল আবেদনগুলো নিষ্পত্তি করেন অতিরিক্ত আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা। আর বয়স সংশোধনের আবেদন ঘ ক্যাটাগরিতে নিষ্পত্তির ক্ষমতা কেবল এনআইডি মহাপরিচালকের কাছে ন্যস্ত করা হয়েছে, যা আগে আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তার কাছেও ছিল।
Manual3 Ad Code
ইসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আবেদন বাতিল হলে আপিল করার সুযোগ আছে। এক্ষেত্রে আপিলকারী কর্তৃপক্ষ করা হয়েছে সচিবকে। সচিবের কাছেও চাহিদা অনুযায়ী তথ্য সংশোধন হলে কমিশনের কাছে আবার রিভিশন করার সুযোগ রাখা হয়েছে।
এ বিষয়ে ইসি সচিব আখতার আহমেদ বলেন, এনআইডি সংশোধনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা আনতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অনিয়ম যেমন হয়, তেমনি অসৎ উদ্দেশ্যেও অনেকে সংশোধনের আবেদন করে থাকেন। কাজেই সবদিক বিবেচনায় নিয়ে একটা সিদ্ধান্তে আসতে হয়েছে। এতে সহজেই সেবা মিলছে। কমছে অনৈতিক অর্থ লেনদেনও।