একই মন্ত্রীর দায়িত্বে একাধিক মন্ত্রণালয় থাকায় সেগুলোর কার্যক্রম নিয়ে ব্যাপক চাপে রয়েছেন অন্তত এক ডজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী। একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের; মন্ত্রণালয়গুলোতেও দেখা দিয়েছে ব্যাপক সমন্বয়হীনতা। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা ধারণা করছেন, এমন পরিস্থিতিতে সরকারের ১৮০ দিনের মাথায় মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমকে গতিশীল করে তুলতে সরকারপ্রধান ‘এক মন্ত্রীর একটি মন্ত্রণালয়’ নীতি গ্রহণ করতে পারেন।
Manual8 Ad Code
প্রসঙ্গত, সরকার গঠনের প্রথম দিনেই বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীদের জন্য ১৮০ দিনের একটি লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মন্ত্রিসভা গঠনের সময় কোনো কোনো মন্ত্রীর কাঁধে তিন-তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও দেওয়া হয়। মাঝে কারও কারও দায়িত্ব কমানো হলেও এখনও মন্ত্রীদের অনেককে একাধিক মন্ত্রণালয় সামলাতে হচ্ছে। অবশ্য কম গুরুত্বপূর্ণ একটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে উপদেষ্টাও রয়েছেন। কোনো কোনো মন্ত্রণালয়ে আবার প্রতিমন্ত্রীদের দৈনিক হাজিরা দেওয়া ছাড়া দৃশ্যমান কোনো কাজ নেই। মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম গতিশীল করতে কয়েক দফায় মন্ত্রিসভার দায়িত্ব পুনর্বণ্টনও করা হয়েছে। তারপরও মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমে জট কাটেনি।
যেমন, টেকনোক্র্যাট কোটায় মন্ত্রীর দায়িত্বপ্রাপ্ত মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ শুরুতেই তিন-তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছিলেন। কৃষি মন্ত্রণালয়ের মতো বড়ো একটি মন্ত্রণালয় ছাড়াও মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং খাদ্য মন্ত্রণালয় পরিচালনা করতে হচ্ছিল তাকে। অবশ্য তাকে সহযোগিতা করার জন্য একজন প্রতিমন্ত্রীও দেওয়া হয়। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই তিনটি মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম সারা দেশে এত বিস্তৃত যে, এগুলো সাধারণত আলাদা আলাদা মন্ত্রীর দায়িত্বেই রাখা হয়। দেশের অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তায় এগুলোর ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে কখনও কোনো মন্ত্রিসভায় একজনের হাতে এ তিনটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। সঙ্গত কারণেই মন্ত্রীকে ব্যাপক কাজের চাপ সামলাতে হচ্ছিল। তবে সম্প্রতি মন্ত্রিসভার দায়িত্ব পুনর্বণ্টনে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থেকে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারীকে। তিনি এখন একই সঙ্গে এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করছেন। যদিও জনপ্রশাসন বিশেজ্ঞরা মনে করছেন, দুটি বড়ো মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব একজন প্রতিমন্ত্রীর হাতে হওয়ায় এসব মন্ত্রণালয়ের কাজে মন্থরতা দেখা দিতে পারে। কারণ জনপ্রশাসনের মতো স্পর্শকাতর মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি খাদ্যের মতো আরেকটি বড়ো মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করা বেশ কঠিনই বটে।
তবে সরকারের এই দায়িত্ব বণ্টনকে স্বাভাবিকই মনে করছেন কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। তার মতে, প্রধানমন্ত্রী কাজের সমন্বয়ের সুবিধার্থে সংশ্লিষ্ট একাধিক মন্ত্রণালয়ে একজন মন্ত্রীকে দায়িত্ব দিয়েছেন। যেমনÑ যোগাযোগ ব্যবস্থা অর্থাৎ নৌ, সড়ক পরিবহন ও রেলপথ মন্ত্রণালয় একটি অন্যটির সঙ্গে সম্পৃক্ত। এই গুচ্ছ মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুবিধার্থেই একজনকে এগুলোর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হবে। একইভাবে কৃষি ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ও একটি অন্যটির সঙ্গে সম্পৃক্ত। দুটি মন্ত্রণালয়ই কৃষি সেক্টরের। ফলে একজনকে একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ার কারণে কাজের সমন্বয়হীনতা নয়, বরং সমন্বয় করা আরও সহজ হবে বলে মনে করেন তিনি। প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে তার দারুণ সমন্বয় ঘটার কারণে কাজে কোনো সমস্যা হচ্ছে না বলে জানান তিনি।
Manual8 Ad Code
প্রথমবার এমপি হয়েই মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েছেন শেখ রবিউল আলম। একাই দায়িত্ব পেয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের মতো বৃহৎ ও গুরুত্বপূর্ণ তিনটি মন্ত্রণালয়ের। অতীতে এই তিন মন্ত্রণালয়ে পৃথকভাবে তিনজন মন্ত্রীকে দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নতুন একজন মন্ত্রীর পক্ষে একসঙ্গে এ তিন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করা কার্যত অসম্ভব। কাজের চাপ কমাতে এই মন্ত্রণালয়গুলোতে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে হাবিবুর রশীদ এবং রাজিব আহসানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। দায়িত্ব পালনের সুবিধার্থে তাদের মধ্যে মন্ত্রণালয় ও বিভাগ ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখনও সুফল মেলেনি। কারণ মাথার ওপরে মন্ত্রী থাকায় তারা এককভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। ফলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে সমন্বয়হীনতা দেখা দিচ্ছে এবং কাজের গতি কমছে। কার্যত প্রতিমন্ত্রীরা কোনো মন্ত্রণালয়েই স্বাধীনভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না।
Manual2 Ad Code
আমিন উর রশীদ, শেখ রবিউল আলম ও আব্দুল বারীর মতো আরও কয়েকজন মন্ত্রী একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করছেন। আব্দুল মুক্তাদির বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়; আরিফুল হক চৌধুরী শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান; আবু জাফর মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন সমাজ কল্যাণ ও মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করছেন। এদের সঙ্গে থাকা প্রতিমন্ত্রীরাও একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতির শিকার হচ্ছিলেন। এ কারণে তাদের মধ্যেও দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হয়।
এ প্রক্রিয়ায় তিনটি মন্ত্রণালয় বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা মো. শরীফুল ইসলামকে শুধু বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা সুলতান সালাউদ্দিন টুকুকে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়; সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদকে রেলপথ এবং সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে; সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের আরেক প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসানকে নৌপরিবহন ও সেতু বিভাগে; অর্থ এবং পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকিকে (জোনায়েদ সাকি) পরিকল্পনাতে; মহিলা ও শিশু এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীনকে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে; শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক নুরকে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে; এবং শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজকে শুধু প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়।
Manual4 Ad Code
সূত্রমতে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ‘গুচ্ছ মন্ত্রণালয়ে’র ধারণা থেকে সহজে কার্যক্রমে সমন্বয় ঘটাতে সংশ্লিষ্ট একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব একজন মন্ত্রীকে দিয়েছিলেন। যেমনÑ খাদ্য, কৃষি ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কাজ একটি অন্যটির সঙ্গে সম্পৃক্ত। একইভাবে সড়ক পরিবহন, নৌপরিবহন ও রেলপথ মন্ত্রণালয় এবং শিল্প, বস্ত্র, পাট ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কযুক্ত। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের কাজের পরিধি এত বড় যে, একজন মন্ত্রীর পক্ষে এমন গুরুত্বপূর্ণ একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করা প্রায় অসম্ভব। মন্ত্রণালয়ের অফিসগুলো এক জায়গায় না হওয়ায় মন্ত্রীকে বারবার এ অফিস থেকে ও অফিসে ছুটতে হচ্ছে। কোনো কোনো মন্ত্রণালয়ের অবস্থান আবার সচিবালয়ের বাইরে। প্রতিমন্ত্রীর জন্য আলাদা অফিস মেনটেইন করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
আবার এর উল্টো চিত্রও রয়েছে মন্ত্রণালয়গুলোতে। ছোট মন্ত্রণালয় হিসেবে পরিচিত সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়সহ আরও কয়েকটি মন্ত্রণালয়ে একাধিক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টা রয়েছে। এলজিআরডি মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, ভূমি মন্ত্রণালয়, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়, বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দুজন করে অর্থাৎ একজন মন্ত্রী ও একজন প্রতিমন্ত্রীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আবার তথ্য ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে উপদেষ্টাকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রসঙ্গত, গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিপুল বিজয় পাওয়ার পর ১৭ ফেব্রুয়ারি অভিজ্ঞ ও নতুনদের সমন্বয়ে ২৫ জন পূর্ণ মন্ত্রী ও ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী নিয়ে গঠিত হয় বিএনপির নতুন সরকার। এ ছাড়া মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় ১০ জনকে উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরেও কয়েকজন উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারী দায়িত্ব পান।