প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

১৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৪ঠা আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
৮ই রবিউস সানি, ১৪৪৮ হিজরি

শতকোটি ডলার আয় থেকে বঞ্চিত দেশ

editor
প্রকাশিত জুন ৩, ২০২৬, ১২:১৯ অপরাহ্ণ
শতকোটি ডলার আয় থেকে বঞ্চিত দেশ

Manual8 Ad Code

 

প্রজন্ম ডেস্ক:

বিশ্বের মোট কাঁচা চামড়া ও পশুর চামড়া সম্পদের প্রায় চার শতাংশের জোগান দেয় বাংলাদেশ। বিপুল এই কাঁচামাল থাকা সত্ত্বেও সঠিক পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করতে না পারা এবং অবহেলিত অবকাঠামোর কারণে প্রতি বছর শতকোটি ডলার রপ্তানি আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে দেশ।

আন্তর্জাতিক বাজার মূল্যের একটি সামান্য অংশ মাত্র বাংলাদেশ অর্জন করতে পারছে, যার মূল কারণ সাভার চামড়া শিল্পনগরীর পরিবেশগত ও অবকাঠামোগত ত্রুটি। খাত সংশ্লিষ্ট ও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশের ভেতরের এই সীমাবদ্ধতার কারণেই বাংলাদেশ উচ্চমূল্যের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করতে পারছে না। আটকে রয়েছে কম মূল্যের রপ্তানি বাজারের বৃত্তে।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. মিজানুর রহমান এই খাতের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে জানান, বাংলাদেশ প্রতিবছর প্রায় ৩৫০ থেকে ৪০০ মিলিয়ন বর্গফুট কাঁচা চামড়া ও পশুর চামড়া উৎপাদন করে। বর্তমানে এই কাঁচামাল রপ্তানি করে প্রায় ১০ থেকে ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করা সম্ভব, যদি এই খাতের পূর্ণ সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো যায়। একটি বিশাল সম্পদের ওপর বসে আছে দেশ, কিন্তু এর সঠিক ও উপযুক্ত ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না।

 

Manual2 Ad Code

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই খাতের অন্যতম বড় একটি দুর্বলতা হলো অপচয়। সঠিক উপায়ে সংরক্ষণ না করা, প্রক্রিয়াজাতকরণের অপর্যাপ্ত সক্ষমতা ও ট্যানারির উপজাত বা বাই-প্রোডাক্টের সঠিক ব্যবহার না হওয়ায় দেশের মোট চামড়ার প্রায় ৩০ শতাংশই নষ্ট হয়ে যায়। অথচ দেশের উৎপাদনমুখী শিল্পগুলোর মধ্যে চামড়া খাতে সবচেয়ে বেশি মূল্য সংযোজন বা ভ্যালু অ্যাডিশনের সুযোগ রয়েছে। যেহেতু চামড়া শিল্পের প্রধান কাঁচামাল স্থানীয় উৎস থেকে আসে, তাই এই খাতে প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত মূল্য সংযোজন করা সম্ভব।

চামড়া খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সঠিক প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বৈশ্বিক সনদের অভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের চামড়া অত্যন্ত কম মূল্যে বিক্রি হচ্ছে। বিদেশি ক্রেতারা, বিশেষ করে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশ থেকে প্রতি বর্গফুট চামড়া মাত্র ৪০ থেকে ৫০ সেন্টে কিনে নিচ্ছে। পরবর্তীতে তারা এই চামড়া উন্নত উপায়ে প্রক্রিয়াজাত করে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি বর্গফুট প্রায় ২ ডলারে বিক্রি করছে। এর ফলে বাংলাদেশের চামড়া থেকে অর্জিত মুনাফার সিংহভাগই চলে যাচ্ছে বিদেশে, আর দেশের স্থানীয় ব্যবসায়ী ও উৎপাদকরা কাঁচা চামড়ার উপযুক্ত মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

চামড়া খাতের বিপুল সম্ভাবনার আরেকটি বড় অংশ লুকিয়ে আছে এর উপজাত বা বাই-প্রোডাক্টের মধ্যে, যা বর্তমানে সম্পূর্ণ অব্যবহৃত পড়ে থাকে। ট্যানারির বর্জ্য ও চামড়ার ফেলে দেওয়া অংশ প্রক্রিয়াজাত করে কোলাজেন, জেলাটিন, সার ও পশুখাদ্য তৈরি করা সম্ভব। এই খাতগুলোকে যদি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া যায়, তবে কাঁচা চামড়ার নতুন চাহিদা তৈরি হবে এবং এর বাজারমূল্যও বেড়ে যাবে। চামড়ার কোনো অংশই ফেলে দেওয়ার মতো নয় এবং এর প্রতিটি অংশেরই আলাদা অর্থনৈতিক মূল্য রয়েছে।

চামড়া খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশের চামড়া শিল্পের জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জÑ এর সরবরাহের সময়কাল। বছরের মোট কাঁচা চামড়ার প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ বাজারে আসে পবিত্র ঈদুল আজহার তিন দিনের মধ্যে। এত অল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ চামড়ার এই জোগান ট্যানারিগুলোর প্রক্রিয়াজাতকরণ ক্ষমতার ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে। ফলে এই সময়ে চামড়ার সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও দ্রুত প্রক্রিয়াজাতকরণ নিশ্চিত করা না গেলে চামড়ার উপযুক্ত মূল্য বজায় থাকে না। সাভার চামড়া শিল্পনগরীতে আন্তর্জাতিক মানের পরিবেশগত অবকাঠামোর অভাব এই খাতের মূল্য শৃঙ্খলে বা ভ্যালু চেইনে এগিয়ে যাওয়ার পথকে বেশি বাধাগ্রস্ত করছে।

বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএলএলএফইএ) চেয়ারম্যান মো. টিপু সুলতান জানান, বিশ্বস্বীকৃত কমপ্লায়েন্সের মানদণ্ড পূরণ করতে না পারার কারণেই আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের চামড়া শিল্প কাঙ্ক্ষিত মূল্য পাচ্ছে না। এই সমস্যার দ্রুত সমাধান করা গেলে চামড়া খাতে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব। বর্তমানে মাত্র হাতেগোনা কয়েকটি কারখানার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বা সনদ রয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের ক্রেতাদের পণ্য কেনার প্রধান শর্ত।

উদ্যোক্তারা জানান, খাতটিকে এগিয়ে নিতে হলে সামগ্রিক কমপ্লায়েন্সের উন্নয়ন প্রয়োজন। শুধুমাত্র একটি বা দুটি কারখানা আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন হলে পুরো খাতের চিত্র বদলাবে না। সাভারের প্রায় ১৫০টি কারখানার মধ্যে যদি অন্তত ৫০টি কারখানাও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অর্জন করতে পারে, তবে বিশ্ববাজারের বড় বড় প্রতিষ্ঠান ও কমপ্লায়েন্স সচেতন ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য কিনতে আগ্রহী হবেন। এই অগ্রগতির ধারা বজায় থাকলে আগামী ঈদুল আজহা মৌসুমের আগেই চামড়া খাতের চলমান অনেক সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা সম্ভব হবে।

তবে মাঠপর্যায়ে বা কারখানা পর্যায়ে ট্যানারি মালিকদের ক্ষোভ ও হতাশা আরও গভীর। হাজারীবাগ থেকে সাভারে ট্যানারি স্থানান্তরের প্রক্রিয়াটিকেই বর্তমান সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন অনেকে। সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের অবকাঠামোগত সুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে হাজারীবাগ থেকে সাভারে ট্যানারি স্থানান্তর করা হয়েছিল। কিন্তু অনেক কারখানা স্থানান্তরিত হয়েছিল মূল অবকাঠামো সম্পূর্ণ প্রস্তুত হওয়ার আগে।

স্থানান্তরের বহু বছর পেরিয়ে গেলেও সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে এখনও গ্যাসসহ অন্যান্য ইউটিলিটি সেবার তীব্র সংকট রয়েছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার বা সিইটিপি এখনও প্রত্যাশিত মান অনুযায়ী কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। এই ত্রুটিগুলোর কারণে দেশের চামড়া কারখানাগুলো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ’ বা এলডব্লিউজি সনদ পাচ্ছে না, যা বিশ্বের বড় বড় ব্র্যান্ডগুলোর কাছে পণ্য সরবরাহের জন্য একটি আবশ্যকীয় শর্ত।

আন্তর্জাতিক সনদের এই ঘাটতির কারণে ইউরোপের বড় ক্রেতারা বাংলাদেশে আসছেন না। ফলে দেশের চামড়া খাত সম্পূর্ণভাবে চীনা ক্রেতাদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে এবং তারাই মূলত চামড়ার বাজারমূল্য নির্ধারণ বা নিয়ন্ত্রণ করছে। এই একক ক্রেতা-নির্ভরতার কারণে বাজারে চামড়ার দাম অনেক কমেছে। বর্তমানে প্রক্রিয়াজাত চামড়া প্রতি বর্গফুট মাত্র ০.৫০ থেকে ০.৫৫ ডলারে বিক্রি হচ্ছে, যা উৎপাদন খরচ তোলার জন্যও যৎসামান্য।

Manual8 Ad Code

অন্যদিকে, চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের প্রয়োজনীয় কেমিক্যালের প্রায় পুরোটাই আমদানি করতে হয়। ডলারের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় আমদানিকৃত কেমিক্যালের খরচ এখন আকাশচুম্বী। ফলে কাঁচা চামড়া কম দামে কিনলেও কেমিক্যাল ও ডলারের বাড়তি খরচের কারণে ট্যানারিগুলো মুনাফা করতে পারছে না।

Manual1 Ad Code

এ খাতের উদ্যোক্তারা জানান, ক্রেতার এই একমুখী নির্ভরতা চামড়া শিল্পের দরকষাকষির ক্ষমতাকে পুরোপুরি দুর্বল করে দিয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে কাঁচা চামড়ার বাজারে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায় হলো পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করা ও এলডব্লিউজি সনদ অর্জন করা। পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে ইউরোপসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক বাজারের বড় ক্রেতা আবার বাংলাদেশে ফিরবেন। তখন আন্তর্জাতিক বাজারে যেমন চামড়া ভালো মূল্যে বিক্রি করা যাবে, তেমনি দেশের ভেতরের বাজারেও প্রান্তিক পর্যায়ে কাঁচা চামড়ার জন্য অনেক উচ্চমূল্য দেওয়া সম্ভব হবে।

Manual4 Ad Code

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১৩
১৫১৬১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
৩০  

Manual1 Ad Code
Manual7 Ad Code