প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

২রা আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৮ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
১৯শে সফর, ১৪৪৮ হিজরি

যত আক্রোশ মুক্তিযুদ্ধে

editor
প্রকাশিত জুন ৭, ২০২৬, ০৯:৩২ পূর্বাহ্ণ
যত আক্রোশ মুক্তিযুদ্ধে

Manual6 Ad Code

 

প্রজন্ম ডেস্ক:

Manual8 Ad Code

 

ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের কেন্দ্রস্থলে দাঁড়িয়ে থাকা বাংলাদেশের স্বাধীনতার অন্যতম স্মারক, ঐতিহাসিক স্বাধীনতা জাদুঘর এখন এক পরিত্যক্ত ধ্বংসস্তূপ। যে ভূগর্ভস্থ জাদুঘরে একসময়ে ৭ মার্চের ভাষণ, মুক্তিযুদ্ধের ২৬ হাজার ঘটনার আলোকচিত্র, পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের রেপ্লিকা, ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা যুদ্ধ পর্যন্ত বাঙালি জাতির সংগ্রামের ইতিহাস সাজানো ছিল–সেই জাদুঘর এখন পোড়া গন্ধ, ভাঙা কাচ আর অন্ধকারে ডুবে থাকা এক নীরব ধ্বংসাবশেষ। জাদুঘরটির পোড়া দেয়াল আর ভাঙা কাচের নিচে চাপা পড়ে আছে একটি জাতির স্মৃতি, ইতিহাস, গর্ব, আভিজাত্য-অহংকার।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নজিরবিহীন হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় এই জাদুঘরের কোনো ছবি, ভাস্কর্য কিংবা নিদর্শন অক্ষত নেই বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। অথচ ঘটনার ৪৭ মাস পেরিয়ে গেলেও জাদুঘরটি সংস্কারের দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই, একটিমাত্র মামলার অগ্রগতিও থমকে আছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি বরাদ্দ ও সিদ্ধান্ত ছাড়া জাদুঘরটি পুনরায় সংস্কার ও চালু করা সম্ভব নয়। ফলে বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাস ধারণ করা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ এই স্থাপনার ভবিষ্যৎ এখন নির্ভর করছে–এই স্মৃতিস্মারক রক্ষায় বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সিদ্ধান্তের ওপর।

Manual2 Ad Code

রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের যে স্থানটিতে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ জাতির উদ্দেশে ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং ১৬ ডিসেম্বর যেখানে পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করেছিল, ঠিক সেই ইতিহাসের কেন্দ্রস্থলেই নির্মিত হয়েছিল স্বাধীনতা জাদুঘর।

২০১৫ সালের ২৫ মার্চ উদ্বোধন হওয়া এই জাদুঘর ছিল দেশের প্রথম ভূগর্ভস্থ জাদুঘর। প্রায় ৬৭ একর এলাকাজুড়ে নির্মিত পুরো প্রকল্পের ব্যয় ছিল প্রায় ১৭৫ কোটি টাকা। জাদুঘরটিকে অনেকেই বলতেন বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাস জানার ‘ওয়ান স্টপ সেন্টার’। কারণ এখানে মুঘল আমল থেকে ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, ৭ মার্চের ভাষণ, গণহত্যা, শরণার্থী জীবন, সেক্টর কমান্ডারদের যুদ্ধ, আত্মসমর্পণ–সবকিছুর ধারাবাহিক উপস্থাপন করা ছিল।

এই জাদুঘরে ছিল ‘স্বাধীনতা স্তম্ভ’, ‘শিখা চিরন্তন’, জলাধার, ম্যুরাল, মিলনায়তন এবং মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রদর্শনী গ্যালারি। এসব গ্যালারিতে একাত্তরের ২৫ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের প্রায় ২৬ হাজার ঘটনার আলোকচিত্র প্রদর্শিত ছিল। এর মধ্যে ১৪৪টি কাচের প্যানেলে ছিল তিন শতাধিক ঐতিহাসিক আলোকচিত্র। আরও ছিল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিদেশি সংবাদপত্রের কাটিং, পোস্টার, টেরাকোটা ম্যুরাল, যুদ্ধের নিদর্শন এবং আত্মসমর্পণের টেবিলের প্রতিকৃতি। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সেই গ্যালারিগুলো অন্ধকারাচ্ছন্ন, জাদুঘরটির পরতে পরতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে ৫ আগস্টের ধ্বংসযজ্ঞের ভাঙা পোড়া স্মৃতিচিহ্ন।

জাদুঘর কর্তৃপক্ষ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের দিন বিকেলে স্বাধীনতা জাদুঘরে সংঘবদ্ধভাবে পরিকল্পিত হামলা চালানো হয়। গেট ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে ব্যাপক ভাঙচুর চালানো হয়।

এ বিষয়ে স্বাধীনতা জাদুঘরের পরিচালক মো. গোলাম কাউছার বলেন, ‘এখানকার গ্যালারিগুলোতে থাকা কোনো নিদর্শনই অক্ষত নেই। প্রদর্শিত আলোকচিত্রগুলোর ডিসপ্লে, টিভি মনিটর, সাউন্ড সিস্টেম, চেয়ার, ফ্যান, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, এমনকি পানির পাম্প, বিদ্যুতের তার পর্যন্ত খুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। জাদুঘরের ভেতর একটি নিদর্শনও আগের জায়গায় নেই। জাদুঘরটির বাইরে থাকা প্রাচীরে স্থাপিত ঐতিহাসিক ভাস্কর্যগুলোও ভেঙে ফেলা হয়েছে। এ ছাড়া ভাঙচুর করা অনেক জিনিসে ভেতর ও বাইরে আগুনে দেওয়া হয়।

স্বাধীনতা জাদুঘর এলাকায় গিয়ে কথা হয় সেই দিনের ঘটনার সাক্ষী পিডব্লিউডির এক কার্য সহকারীর (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘হামলাকারীরা শুধু ভাঙচুরই করেনি, বরং জাদুঘরের ভেতরে থাকা বিভিন্ন সামগ্রী টেনে বের করে এনে আগুনে পুড়িয়ে দেয়। সেই আগুন জাদুঘরের বিভিন্ন অংশে টানা দুদিন পর্যন্ত জ্বলেছে। তিনি আরও জানান, হামলার সময় তাকে মারধরের চেষ্টাও করা হয়। পরে নিজেকে স্থানীয় লোক পরিচয় দেওয়ার পর রক্ষা পান। সেই সময়ের ভিডিও ফুটেজ রয়েছে বলেও তিনি দাবি করেছেন।

 

যত আক্রোশ যেন মুক্তিযুদ্ধের ওপর

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের স্বাধীনতা জাদুঘরের বর্তমান ধ্বংসস্তূপের নীরব সাক্ষী মুক্তিযোদ্ধা মনসুর ঘরামি (৭৫)। একাত্তরে ৯ নম্বর সেক্টরের হেমায়েত বাহিনীর এই যোদ্ধার সার্টিফিকেট নেই। তিনি উদ্যান এলাকায় ভাঙারি কুড়িয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে জাদুঘরের বর্তমান অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘৭ মার্চের ভাষণ থেইকা মুক্তিযুদ্ধের ছবি, যা কিছু আছিল সব লুট কইরা নিয়া গেছে। সেই দিনের পর থাইকা এটা বন্ধ। আর খোলে নাই।’ কথা বলতে বলতে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এই মুক্তিযোদ্ধা। তিনি বলেন, ‘আমরা যুদ্ধ করছি দেশ বাঁচাইতে, টাকার জন্য না। এই রকম বাংলাদেশ তো চাই নাই।’

তার মতো অনেকেই মনে করছেন, হামলাটি শুধু একটি স্থাপনার ওপর ছিল না; এটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, ইতিহাস ও প্রতীকগুলোর ওপর আঘাত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মৌটুসী ইসলাম বলেন, ‘এই জাদুঘরে আমি একবার গিয়েছি। এ দেশের স্বাধীনতা ও মুক্তি সংগ্রামের সার্বিক চিত্র এর ভেতরে সাজানো ছিল; যা আমাদের জন্য লেসন। অথচ বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাস-ঐতিহ্যের ওপর সারা দেশে যে আঘাত ২৪-এ আমরা ঘটতে দেখেছি সেটা অপ্রত্যাশিত। জুলাইকে আমিও সমর্থন করেছি। কিন্তু এ ধরনের ধ্বংস মেনে নিতে পারিনি। আমি আশা করি, বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার স্বাধীনতা জাদুঘরসহ ধ্বংসের শিকার জাদুঘরগুলো সংস্কার করে আবার চালু করার উদ্যোগ নেবে।’

স্বাধীনতা জাদুঘর এলাকায় দীর্ঘদিন যাতায়াতকারী বেসরকারি চাকরিজীবী মোবাশ্বের আলম (৫৬) বলেন, ‘বিগত দিনে কত আন্দোলন-সংগ্রাম দেখেছি। সরকার বদল হতেও দেখেছি। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে এ দেশের জন্মের ইতিহাস-ঐতিহ্যের ওপর যে ধরনের আঘাত ও ধ্বংসলীলা চালানো হয়েছে; সে ধরনের ঘটনা আগে আমরা দেখিনি। মনে হয়েছে হামলাকারীদের যত রাগ মুক্তিযুদ্ধের ওপর! এ ধরনের সন্ত্রাসী সব কর্মকাণ্ড দমনে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ মনে করছি। বর্তমান সরকারের কাছে আমার আবেদন, অনেক রক্তের বিনিময়ে জয় করা এ দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্যের ওপর আর কোনো আঘাত যেন না আসে।’

সংস্কার ও মামলার অগ্রগতি নেই

স্বাধীনতা জাদুঘরের পরিচালক গোলাম কাউছার বলেন, ‘এটি কোনো ব্যক্তির জাদুঘর নয়, এটি বাংলাদেশের স্বাধীনতার জাদুঘর। তাই নতুন করে গবেষণা ও পরিকল্পনার মাধ্যমে আবার দাঁড় করাতে হবে। ফলে এটি শুধু সংস্কারের বিষয় নয়; পুরো উপস্থাপনাই নতুনভাবে ভাবতে হবে। কারণ আগের ডিসপ্লেগুলো ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় নতুন করে আলোকচিত্র, দলিল, কিউরেশন এবং প্রদর্শনী পরিকল্পনা করতে হবে।’ তিনি জানান, এতে সময় ও বড় অঙ্কের অর্থ লাগবে। সরাসরি ক্ষতির পরিমাণ ৫ থেকে ১০ কোটি টাকা হলেও পূর্ণাঙ্গ পুনর্নির্মাণে ২০ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হতে পারে।

মামলা প্রসঙ্গে গোলাম কাউছার জানান, স্বাধীনতা জাদুঘরের চারটি মুক্তিযুদ্ধকালীন অস্ত্রও লুট হয়ে যায়। পরে লুট হওয়া অস্ত্র ও ভাঙচুরের ঘটনায় শাহবাগ থানায় মামলা করা হয়। বিভিন্ন স্থানে অস্ত্র উদ্ধারের খবর পাওয়া গেলেও সেগুলোর সঙ্গে জাদুঘরের অস্ত্রের মিল পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন তিনি। এদিকে সংশ্লিষ্ট থানায় খোঁজ নিয়ে মামলার কোনো অগ্রগতি জানা যায়নি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ঘটনার পর একটি মামলা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো উল্লেখযোগ্য তদন্ত অগ্রগতি, চার্জশিট বা গ্রেপ্তারের তথ্য প্রকাশ হয়নি। এ নিয়ে সমালোচনা রয়েছে সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন– বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসবাহী একটি রাষ্ট্রীয় স্থাপনায় এমন হামলার পরও কেন তদন্তে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই?

 

৪৭ মাসেও নেই সংস্কারের উদ্যোগ

ঘটনার পর ৪৭ মাস পেরিয়ে গেলেও জাদুঘরটি এখনো বন্ধ। ভেতরে নেই বিদ্যুৎ সংযোগ। পোড়া দেয়াল, ভাঙা কাচ, ক্ষতিগ্রস্ত ম্যুরাল, গ্যালারিগুলোসহ জাদুঘরের গোটা এলাকা অন্ধকারাচ্ছন্ন।

Manual4 Ad Code

জাদুঘরটি নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানতে চাইলে জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক তানজিম ওয়াহাব বলেন, ‘জাদুঘরের ভেতরে আর কিছু অবশিষ্ট নেই। সব ভাঙা হয়েছে। তবে ১৯৭১-কে বাদ দিয়ে আমরা কিছুই করতে পারব না। খুবই যত্ন করে নতুন আঙ্গিকে স্বাধীনতা জাদুঘর আবার তুলে ধরা হবে। নতুনভাবে ডিসপ্লে, কিউরেশন এবং দর্শনার্থীদের জন্য উপযোগী পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। আগামী অর্থবছরে বরাদ্দ পাওয়া গেলে সংস্কারকাজ শুরু করা সম্ভব হতে পারে।’

Manual3 Ad Code

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জাদুঘরটি সংস্কারের কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই। পিডব্লিউডির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা জাদুঘর কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তারা এখনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা পাননি।

স্বাধীনতা জাদুঘরের বর্তমান ভগ্নদশা শুধু একটি রাষ্ট্রীয় স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতি নয়; এটি রাষ্ট্রের স্মৃতি সংরক্ষণ, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার রক্ষার প্রশ্নও সামনে এনেছে। প্রশ্ন উঠেছে–দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য রক্ষার দায় কি এড়াতে পারে রাষ্ট্র? এ প্রসঙ্গে লেখক ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষক সালেক খোকন বলেছেন, ‘ইতিহাস কখনো মুছে ফেলা যায় না। পরবর্তী প্রজন্ম প্রকৃত ইতিহাস খুঁজে বের করবেই। কারণ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ রাষ্ট্রের একটি মীমাংসিত সত্য। সেটিতে কারও হাত দেওয়া উচিত নয়।’

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১৩১৫১৬
১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭৩০
৩১  

Manual1 Ad Code
Manual8 Ad Code