আলোচিত না হলেই ধর্ষণ ও শিশুহত্যার মতো বর্বরোচিত ঘটনাগুলোর তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া যেন থমকে যায়। বিশেষ করে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ধরনের যেসব ঘটনা ব্যাপক আলোচিত বা ‘ভাইরাল’ হয়, সেসব ঘটনায় করা মামলার ক্ষেত্রে তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া তুলনামূলক অনেক বেশি গুরুত্ব পায়। কিন্তু যেসব ঘটনা তেমন আলোচনায় নেই সেগুলোর মামলার ক্ষেত্রে তেমন একটা গুরুত্ব দেওয়া হয় না বলে নানা পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে।
রবিবার (৭ জুন) আলোচিত শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও বীভৎসভাবে হত্যার মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ড ঘটার মাত্র ১৯ দিনের মাথায় গতকাল আদালত অভিযুক্ত সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন। এর মধ্য দিয়ে দ্রুত বিচারের একটি অনন্য নজির স্থাপন করা গেল।
কিন্তু বিশ্লেষকরা মনে করেন, এ ধরনের প্রতিটি ঘটনা ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর কাছে সমান কষ্টের ও বেদনার। ফলে সবার ক্ষেত্রেই দ্রুততম সময়ে বিচার সম্পন্ন হোক–সেটাই কাম্য। অথচ গণমাধ্যম বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি না হলে একই ধরনের অপরাধ বা হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে সে তুলনায় গুরুত্ব দেওয়া হয় না। শুধু আলোচিত বা চাঞ্চল্যের ওপর ভিত্তি করে একই ধরনের জঘন্য অপরাধমূলক ঘটনার মামলার তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ায় বৈষম্যের শিকার হচ্ছে অনেক ভুক্তভোগী পরিবার। ফলে ব্যক্তি, স্থান বা প্রচারের মাত্রায় নয়, অপরাধের গুরুত্বের ভিত্তিতেই সব মামলায় সমান অগ্রাধিকার নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে মাগুরায় ঘটা আলোচিত শিশু আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলার চার্জশিট (অভিযোগপত্র) জমা দেওয়া হয়েছিল এক মাসের মধ্যেই। অভিযোগ গঠনের পর মাত্র ২৪ দিনের মাথায় সংশ্লিষ্ট আদালত এই ঘটনায় ঐতিহাসিক রায় দেন। যদিও বর্তমানে রায়-পরবর্তী আপিলের ধাপটি হাইকোর্টে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। অন্যদিকে গত ২১ মে চট্টগ্রাম নগরীর বাকলিয়া থানা এলাকায় গুদাম কক্ষে চার বছরের শিশুকে ধর্ষণের ঘটনায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয় এবং মাত্র ১৩ দিনের মাথায় (গত ৪ জুন) একমাত্র আসামি মনির হোসেনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। এ ছাড়া সর্বশেষ গত ১৯ মে পল্লবীতে ঘটা শিশু স্কুলছাত্রী রামিসা ধর্ষণ-হত্যার ওই মামলায় চার্জশিট জমা দেওয়ার পর মাত্র পাঁচ কর্মদিবসে শুনানি শেষ হয় এবং ষষ্ঠ কর্মদিবসে গতকাল রায় ঘোষণা করেন বিচারক। এর আগে সরকারপ্রধান তথা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেও আলোচিত এই হত্যা মামলার রায় মাত্র এক মাসের মধ্যেই ঘোষণা করা হবে বলে এক অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে বলেছিলেন।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, শিশু আছিয়া বা রামিসা হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার এবং জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিত করার পক্ষে প্রায় সবাই। কিন্তু এমন অসংখ্য আছিয়া-রামিসা, যারা সমাজের মানুষরূপী হায়নাদের বর্বরতার শিকার হয়ে নির্মমভাবে প্রাণ হারিয়েছে, তাদের ক্ষেত্রেও তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া কতটা দ্রুত হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারগুলো তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ায় গুরুত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন কি না, তা সংশ্লিষ্টদের খতিয়ে দেখা দরকার বলে মত দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যমতে, গত পাঁচ বছরে (২০২১ থেকে ২০২৫) সারা দেশে বিভিন্নভাবে ২ হাজার ৫৮১ শিশু হত্যার শিকার হয়েছে, যাদের মধ্যে ১৬৭ জনকে ধর্ষণের পর খুন করা হয়। এর মধ্যে ২০২৫ সালে খুন হয় ৪১০ শিশু, যাদের মধ্যে ধর্ষণসহ হত্যার শিকার হয় ৩২ জন। তার আগে ২০২৪ সালে ৫৭৪ শিশু, ২০২৩ সালে ৪৮৫ জন, ২০২২ সালে ৫১৬ জন এবং ২০২১ সালে ৫৯৬ শিশু খুন হয়েছে।
Manual3 Ad Code
অন্যদিকে বিভিন্ন সূত্রমতে, চলতি বছরের মে মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত অন্তত ১২০ শিশু খুন হয়েছে, যাদের মধ্যে প্রায় অর্ধশত শিশু ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যার শিকার হয়। ফলে যে হারে দেশের বিভিন্ন স্থানে শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা ঘটেছে, সে অনুসারে সমান গুরুত্ব দিয়ে এসব ঘটনার দ্রুত তদন্ত বা বিচার প্রক্রিয়া শেষ করার কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই কারও কাছেই।
Manual3 Ad Code
এ প্রসঙ্গে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) জ্যেষ্ঠ সমন্বয়ক ও মানবাধিকারকর্মী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির বলেন, আইনের শাসন ও মানবাধিকারের মৌলিক নীতি হলো, সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং প্রতিটি ভুক্তভোগী সমান গুরুত্ব পাওয়ার অধিকার রাখে। কোনো ঘটনা বেশি আলোচিত হওয়ায় দ্রুত বিচার হবে, আর একই ধরনের ঘটনায় দুর্বলের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা থাকবে– এটি ন্যায়বিচারের চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কাজেই আমাদের এমন ব্যবস্থা প্রণয়ন করতে হবে যেন দ্রুততম সময়ে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা যায়।
আবু আহমেদ ফয়জুল কবির আরও বলেন, ‘যেকোনো আলোচিত ঘটনার পাশাপাশি প্রত্যন্ত অঞ্চল বা কম আলোচিত এলাকায় সংঘটিত শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যা মামলাগুলোর ক্ষেত্রেও সমান গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত ও বিচার করতে হবে। ব্যক্তি, স্থান বা প্রচারের মাত্রায় নয়, অপরাধের গুরুত্বের ভিত্তিতেই সব মামলায় সমান অগ্রাধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। আমরা রামিসাসহ সব সহিংসতার শিকার শিশুর জন্য ন্যায়বিচার দেখতে চাই।’
বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ না করার ক্ষেত্রে বিচারকের স্বল্পতাসহ বেশ কিছু কারণকে চিহ্নিত করেছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক। তিনি বলেন, ‘মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতার কারণ হচ্ছে দক্ষ জনবলের অভাব। লাখ লাখ মামলার মধ্যে কয়টা আর মিডিয়াতে আসে। জনবহুল এই দেশে বিচারক আছেন মাত্র ১৮০০ থেকে ১৯০০ জন। বিচার বিভাগের জন্য জাতীয় বাজেটে বরাদ্দ হয় এক শতাংশেরও কম। তা ছাড়া মামলা নিষ্পত্তি করা তো শুধু আদালতের বিষয় না। মামলার তদন্ত করে পুলিশ। এসব সমস্যা সেখানেও আছে।’
একই প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘বাংলাদেশে আইনের শাসনের এটি একটি দুর্বলতা। যেই মামলার বিষয়ে মিডিয়াতে খুব হইচই পড়ে যায়, দেশের প্রধানমন্ত্রী হস্তক্ষেপ করেন, তখন সেটি ফার্স্ট ট্র্যাকে কয়েক দিনের মধ্যে বিচার হয়ে যায়। আর এমন অনেক অসহায় বা অন উল্লেখ্য লোক আছেন, যাদের তেমন কোনো লোকজন নেই, তখন মিডিয়াতে তেমন হইচই পড়ে না, প্রধানমন্ত্রী হস্তক্ষেপ করেন না–তাদের মামলার নিষ্পত্তি কবে হবে কেউ বলতে পারেন না। এটা এক ধরনের বৈষম্য। বিচারব্যবস্থায় এমন বৈষম্য থাকলে একে সুষ্ঠু বিচারব্যবস্থা বলে না। আইনের শাসন সুনিশ্চিত করতে গেলে অবশ্যই সব মামলা নিষ্পত্তির ধারাবাহিকতা একই হতে হবে। তাই সরকারের উচিত, সব মামলাই যেন দ্রুত নিষ্পত্তি করা যায়, সুবিচার নিশ্চিত করা যায়, সে জন্য মহাপরিকল্পনা নেওয়া।’
গতকাল শিশু স্কুলছাত্রী রামিসা হত্যার রায় ঘোষণা করার পর সচিবালয়ে সাংবাদিকদের কাছে প্রতিক্রিয়া জানান আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘মাত্র পাঁচ কার্যদিবসে এই মামলার বিচারকাজ সম্পন্ন করে রায় দেওয়া হয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দ্রুততম সময়ে রায় ঘোষণার রেকর্ড।’
তবে অতীতের আলোচিত বা এই ধরনের অন্য মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে মন্ত্রী বলেন, ‘বিচারব্যবস্থার একটি সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তিনি বলেন, অন্য মামলাগুলো যাতে দ্রুত নিষ্পত্তি করা যায়, সে জন্য ইতোমধ্যেই প্রয়োজনীয় আলোচনা শুরু হয়েছে।’
Manual2 Ad Code
এ বিষয়ে সামাজিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘বর্তমান সমাজে বিভিন্ন ক্ষেত্রে মিডিয়া বা গণমাধ্যমের এক ধরনের প্রভাব লক্ষ করা যাচ্ছে, যা শিশুহত্যার মতো ঘটনার তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রেও এক ধরনের ভূমিকা রাখছে। মিডিয়া ক্ষেত্রবিশেষে কোনো কোনো ঘটনাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকে বা দিতেই পারে, কিন্তু রাষ্ট্রের দায়িত্ব সব নাগরিককে সমানভাবে দেখা, সমান গুরুত্ব দিয়ে আইনি সুরক্ষা ও সেবা দেওয়া। কিন্তু বাস্তবতায় আমরা তেমনটা দেখতে পাই না। প্রতিটি ভুক্তভোগী পরিবারের কাছেই তাদের সন্তান ছিল অত্যন্ত প্রিয়। ফলে কোনো হত্যার বিচার কয়েক দিনেই হবে। আবার কোনো হত্যার বিচার বছরের পর বছর ঝুলে থাকবে–সেটা হলে নাগরিকের মধ্যে হতাশার সৃষ্টি হবে। এখান থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি।’
এ প্রসঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তরের গণমাধ্যম শাখার সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, ‘শিশুহত্যা মামলার তদন্ত প্রক্রিয়ায় গাফিলতির কোনো সুযোগ নেই। এ ধরনের মামলায় পুলিশ অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে তদন্ত করে থাকে। তবে সব মামলায় সমানভাবে চার্জশিট জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে সময় নির্ধারণ করা যায় না। অনেক সময় সাক্ষ্য, প্রমাণ, আলামতের রিপোর্টসহ নানা কারণে কিছুটা বিলম্ব হয়ে থাকে। তবে শিশুহত্যা মামলার মতো স্পর্শকাতর তদন্তগুলোর আইনি বাধ্যবাধকতা অনুসারে পুলিশ যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করে থাকে। এ জন্য ঊর্ধ্বতনরা নিয়মিত তদারকি করে থাকেন।’