প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

২রা আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৮ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
১৯শে সফর, ১৪৪৮ হিজরি

তারেক রহমানকে কেন ‘ডাবল প্রায়োরিটি’ দিচ্ছে চীন?

editor
প্রকাশিত জুন ১৫, ২০২৬, ১২:৩৬ অপরাহ্ণ
তারেক রহমানকে কেন ‘ডাবল প্রায়োরিটি’ দিচ্ছে চীন?

Manual2 Ad Code

 

প্রজন্ম ডেস্ক:

Manual4 Ad Code

গত ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই চীনের সঙ্গে রাজনৈতিক ও সরকারি পর্যায়ে যোগাযোগ বেশ বেড়েছে। বাংলাদেশ থেকে দুই পর্যায়েই একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ সফর হচ্ছে বেইজিংয়ে। এরই ধারাবাহিকতায় চলতি মাসের শেষ সপ্তাহে চীন সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

 

সফরকালে বাংলাদেশের সরকারপ্রধান চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং— উভয়ের সঙ্গেই পৃথক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসার সুযোগ পাচ্ছেন।

Manual1 Ad Code

রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিবেচনায় এই সফরকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, দুই দেশের বিদ্যমান সম্পর্ককে নতুন মাত্রায় নিয়ে যেতে সরকারপ্রধানের এই সফর যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে।

 

চীনের দুই শীর্ষ নেতার সঙ্গে পৃথক বৈঠকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ঢাকা–বেইজিং সম্পর্ক আগামী দিনগুলোতে কীভাবে সামনে এগোবে, তারই একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা নিয়ে আলোচনা করবেন।

 

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন সরকারের প্রধান হিসেবে প্রথম বিদেশ সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়া যাচ্ছেন। তিনি আগামী ২১ থেকে ২২ জুন কুয়ালালামপুর সফর করবেন। এরপর ২৩ থেকে ২৬ জুন চীন সফর করবেন। সরকারপ্রধান কুয়ালালামপুর থেকে সরাসরি বেইজিংয়ে পৌঁছাবেন বলে কথা রয়েছে।

 

প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে গত সপ্তাহে বেইজিং সফর করেছেন পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম। তিনি চীনের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী হুয়া চুনইংয়ের সঙ্গে তারেক রহমানের চীন সফরের নানা কর্মসূচি, আলোচ্যসূচি, সম্ভাব্য চুক্তি ও সমঝোতা স্মারকসহ সার্বিক বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।

ঢাকা-বেইজিংয়ের কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে একাধিক সমঝোতা স্মারকসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি সইয়ের প্রস্তুতি চলছে। উভয় পক্ষের সম্মতিতে সফরের ঠিক আগমুহূর্তে এসব চুক্তি ও সমঝোতার বিষয়টি চূড়ান্ত হবে।

সরকারের একজন কূটনীতিবিদ বলেন, চীনের সঙ্গে নতুন সরকারের যোগাযোগ অনেক নিবিড় হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে চীনের প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট— দুজনের সঙ্গেই দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হবে। দুই শীর্ষ নেতার সঙ্গে বড় পরিসরে প্রতিনিধিদল নিয়ে আলাদা বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। সাধারণত কোনো দেশের সরকারপ্রধান সফরে গেলে যেকোনো একজনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয় এবং অন্যজনের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ হয়। কিন্তু এবার দুজনের সঙ্গেই প্রধানমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হবে।

এই কূটনীতিক আরও বলেন, সরকারপ্রধানের দুই শীর্ষ নেতার সঙ্গেই দ্বিপক্ষীয় বৈঠক পাওয়াটা একটি বড় ‘প্রায়োরিটি’ বা বিশেষ অগ্রাধিকার। এটি প্রমাণ করে যে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক একটি নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে যাচ্ছে। এই সরকারের আমলে চীনের সঙ্গে আগামী দিনগুলোতে কীভাবে অংশীদারত্ব বাড়বে, তারই একটি রূপরেখা এই সফরের মধ্য দিয়ে প্রণয়ন হবে।

 

উল্লেখ্য, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের চীন সফরের সময় তিনি বেইজিংয়ে শুধুমাত্র চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করার সুযোগ পেয়েছিলেন। সেই তুলনায় নির্বাচিত সরকারপ্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে চীন বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠকের সময়কাল হতে পারে প্রায় আধা ঘণ্টা। অন্যদিকে, চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপক্ষীয় বৈঠকটি ৪০ মিনিট থেকে এক ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।

Manual4 Ad Code

এজেন্ডায় তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও বাণিজ্য জোট

Manual7 Ad Code

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, প্রধানমন্ত্রীর সফরে রাজনৈতিক সম্পর্ক জোরদার, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং অবকাঠামো উন্নয়নের মতো বিষয়গুলো আলোচনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানো, জ্বালানি সহযোগিতা, চীনা শিল্প বাংলাদেশে স্থানান্তর, অর্থনৈতিক অঞ্চল চালু করা, তিস্তা মহাপরিকল্পনা, মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন এবং গুয়াংজু-চট্টগ্রাম ও সাংহাই-চট্টগ্রাম সরাসরি বিমান ফ্লাইট চালু করার প্রস্তাব দেওয়া হবে।

পাশাপাশি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মুক্ত বাণিজ্য জোট রিজিওনাল কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ (আরসিইপি), ব্রিকস এবং অর্থনৈতিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সংস্থা সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (এসসিও)-তে বাংলাদেশের যুক্ত হওয়ার বিষয়ে চীনের সমর্থন চাওয়া হবে। এছাড়া, চীনের অর্থায়ন ও সহায়তায় বাংলাদেশে যেসব বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্প চালু রয়েছে, সেগুলোর অগ্রগতি নিয়েও আলোচনা হবে।

 

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের চারটি বৈশ্বিক উদ্যোগ রয়েছে— গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (জিডিআই), গ্লোবাল সিকিউরিটি ইনিশিয়েটিভ (জিএসআই), গ্লোবাল সিভিলাইজেশন ইনিশিয়েটিভ (ইনিশিয়েটিভ–জিসিআই) এবং গ্লোবাল গভর্নেন্স ইনিশিয়েটিভ (জিজিআই)। এই চার বৈশ্বিক উদ্যোগের মধ্যে অন্তত দুটি উদ্যোগে বাংলাদেশ কীভাবে যুক্ত হতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। ধারণা করা হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন সফরে যেকোনো একটি উদ্যোগে যুক্ত হওয়ার আনুষ্ঠানিক বার্তা বেইজিংকে দিতে পারে ঢাকা।

পাশাপাশি বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে চীনের তৈরি ২০টি যুদ্ধবিমান কেনার যে উদ্যোগ বাংলাদেশ নিয়েছিল, সেটিও এবার আলোচনার টেবিলে থাকতে পারে।

সরকারের এক দায়িত্বশীল কূটনীতিক বলেন, “প্রধানমন্ত্রীর সফরে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’— নতুন সরকারের এই স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতিকে স্বাগত জানাবে চীন। আমরা ‘এক চীন নীতি’ এবং তাইওয়ান ইস্যুতে আমাদের চিরন্তন অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করব। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি সংকট ও তিস্তা বহুমুখী প্রকল্পের মতো বিষয়গুলোতেই আমরা বেশি জোর দিচ্ছি।”

ভূরাজনীতি ও বিশেষজ্ঞদের মত

সাবেক রাষ্ট্রদূত মাশফি বিনতে শামস বলেন, ‘বর্তমানে চীনে বৈশ্বিক নেতাদের আনাগোনা বেড়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও কিছুদিন আগে চীন ঘুরে এলেন। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার উত্তেজনাকর পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে বৈশ্বিক রাজনীতিতে চীনের ভূমিকা এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেদিক থেকে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর এই চীন সফর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আমাদের অর্থনীতির জন্য চীনের বিনিয়োগ, চীনের বিশাল বাজার এবং চীন থেকে আমদানির সাপ্লাই চেইন বজায় রাখা জরুরি। চীনের প্রেসিডেন্টের চার বৈশ্বিক উদ্যোগের মধ্যে আমরা কোনটিতে যোগ দেব এবং তা থেকে আমাদের লাভ কী হবে, তা বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’

 

প্রধানমন্ত্রীর এই চীন সফরের দিকে ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো বন্ধু রাষ্ট্রগুলোও নজর রাখবে। এ প্রসঙ্গে মাশফি বিনতে শামস বলেন, ‘বৈশ্বিক রাজনীতিতে নানা সমীকরণ থাকবেই, তবে আমাদের সবার আগে নিজেদের জাতীয় স্বার্থ দেখতে হবে। এখন সবাই যার যার স্বার্থ দেখছে। ভারত বা যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজন হলে তারাও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক শক্তিশালী করে। কাজেই কে কী ভাবল, তা বিচার করা আমাদের উচিত নয়। আমরা আমাদের মতো স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেব। ইতোমধ্যে আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বাণিজ্য চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছি, যেখানে এমন কিছু শর্ত রয়েছে যা থেকে আমরা কতটুকু অর্থনৈতিক সুবিধা বা স্বাধীনতা পাব, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তবে, সবকিছুর ঊর্ধ্বে দেশের স্বার্থ রক্ষায় চীনের সঙ্গে সম্পর্ক শক্তিশালী করার প্রয়োজন হলে আমাদের তা অবশ্যই করতে হবে।’

গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বিদেশ সফর নিয়ে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে নানা আলোচনা চলছিল। আঞ্চলিক ভূরাজনীতি এবং ভারত-চীন প্রতিযোগিতার বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফরের গন্তব্য নির্ধারণে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করেছে সরকার। ভারসাম্য বজায় রাখতে প্রথম গন্তব্য হিসেবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ মালয়েশিয়াকে বেছে নিয়েছেন তারেক রহমান, যার পরপরই তিনি যাচ্ছেন চীনে।

এর আগে ৬ মে বেইজিংয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-এর একটি ফলপ্রসূ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকের আলোচনায় বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই আসন্ন চীন সফর, যার সফল বাস্তবায়ন হতে যাচ্ছে জুনের শেষ সপ্তাহে।

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১৩১৫১৬
১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭৩০
৩১  

Manual1 Ad Code
Manual3 Ad Code