প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

১৮ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৩রা আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
৭ই রবিউস সানি, ১৪৪৮ হিজরি

বৃষ্টি প্রকৃতির, দুর্ভোগ পরিকল্পনার

editor
প্রকাশিত জুলাই ১৫, ২০২৬, ১১:৩১ পূর্বাহ্ণ
বৃষ্টি প্রকৃতির, দুর্ভোগ পরিকল্পনার

Manual2 Ad Code

 

প্রজন্ম ডেস্ক:

Manual3 Ad Code

বর্ষায় বৃষ্টি হবে। আষাঢ়ের আকাশ মেঘে ঢেকে যাবে, শ্রাবণে নামবে অবিরাম ধারা— এটাই প্রকৃতির নিয়ম। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে একটি দেশের রাজধানী ডুবে যাবে কিনা, মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা সড়কে আটকে থাকবে কিনা কিংবা, শিক্ষার্থী-কর্মজীবীদের নোংরা পানি মাড়িয়ে কর্মস্থল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পৌঁছাতে হবে কিনা— সেটি প্রকৃতির বিষয় নয়। বৃষ্টি আশীর্বাদ হবে, নাকি জনদুর্ভোগে পরিণত হবে— তা নির্ভর করে নগর পরিকল্পনা, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর প্রস্তুতি ও জবাবদিহির ওপর। এমনটাই মনে করেন নগর বিশ্লেষকরা।

আকাশজুড়ে মেঘ কিংবা অঝোর ধারায় বৃষ্টি। কিন্তু অফিসগামী কর্মীর দেরির অজুহাত শুনবে না কর্মস্থল। দিনমজুর কাজে না গেলে তার ঘরে হাঁড়ি চড়বে না। রিকশাচালক রাস্তায় না নামলে দিনের কিস্তি ও সংসারের খরচ উঠবে না। পোশাকশ্রমিক, দোকানকর্মী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, নিরাপত্তারক্ষী কিংবা হাসপাতালের কর্মচারী— বৃষ্টি তাদের জন্য ছুটির বার্তা নিয়ে আসে না।

Manual6 Ad Code

রবিবার (১২ জুলাই) মধ্যরাত থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত ছয় ঘণ্টায় ঢাকায় ৭৬ মিলিমিটার এবং পরবর্তী ছয় ঘণ্টায় দুপুর ১২টা পর্যন্ত আরও ৮২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে আবহাওয়া অধিদফতর। ১২ ঘণ্টায় রাজধানীতে বৃষ্টি হয়েছে ১৫৮ মিলিমিটার।

অবিরাম বর্ষণে গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, পান্থপথ, শুক্রাবাদ, গ্রিন রোড, তেজতুরী বাজার, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, বনশ্রী, রামপুরা, মনিপুর, শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া ও কালশীসহ রাজধানীর বিস্তীর্ণ সড়ক পানিতে তলিয়ে যায়। অনেক স্থানে ফুটপাতও ডুবে যাওয়ায় পথচারীদের মূল সড়ক ধরে চলতে হয়েছে। হাঁটু পানি ও বিকল যানবাহনে সকাল থেকেই চরম বিড়ম্বনায় পড়েন নগরবাসী।

 

Manual7 Ad Code

জলজটে পথে পথে স্থবিরতা

টানা ভারী বর্ষণে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাকলী র‍্যাম্পের নিচের অংশসহ বনানী, খিলক্ষেত, ঢাকা গেট এবং রাজধানীর বিভিন্ন নিচু এলাকায় ব্যাপক জলজট তৈরি হয়। এর প্রভাবে সংশ্লিষ্ট সড়কগুলোতে যানবাহনের গতি কমে যায় এবং জায়গায় জায়গায় দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়।

সকালে কাকলী মোড়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ে। এক্সপ্রেসওয়ে থেকে নামা গাড়ি ও নিচের সড়কের যানবাহন একই প্রবাহে যুক্ত হওয়ায় চাপ বাড়ে। পানির কারণে চালকেরা গতি কমাতে বাধ্য হন। কোনও গাড়ি বিকল হয়ে পড়লে এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে পেছনের দীর্ঘ সড়কে।

ট্রাফিক পুলিশ অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ এড়িয়ে চলা, জলাবদ্ধ এলাকায় ধীরগতিতে গাড়ি চালানো, নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা এবং সম্ভব হলে বিকল্প সড়ক ব্যবহারের অনুরোধ জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বার্তা দিয়েছে। কাকলীর জলজটের ছবি তুলে ধরে ট্রাফিক সার্জেন্ট আনিসুর রহমান নিজের ফেসবুক পেজে লিখেছেন, “এটা বনানীর কাকলীর চিত্র কিনা, বোঝা যাচ্ছে না।” তিনি সবাইকে সতর্কভাবে চলাচলের আহ্বান জানান।

পানির গভীরতায় বাড়ে বৈষম্য

জলাবদ্ধতা সব নাগরিককে সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে না। যাদের ব্যক্তিগত গাড়ি রয়েছে, তাদের ক্ষতি হয়তো কয়েক ঘণ্টা সময়ের। কিন্তু গণপরিবহনের যাত্রীকে বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে বাসের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। রিকশা ও সিএনজিচালিত অটোরিকশায় দিতে হয় বাড়তি ভাড়া— যাদের সেই সামর্থ্য নেই, তাদের নোংরা পানি মাড়িয়ে হেঁটে যেতে হয়।

একজন অফিসকর্মী ভেজা পোশাকে কর্মস্থলে পৌঁছান। একজন হকারের পণ্য পানিতে নষ্ট হয়। যানজটে আটকে রিকশাচালকের দিনের আয় কমে যায়। কাজ না পেয়ে দিনমজুরকে খালি হাতে বাড়ি ফিরতে হয়। জলাবদ্ধতা তাই শুধু পানি নিষ্কাশন বা যানবাহন চলাচলের সমস্যা নয়— এটি নাগরিকের আয়, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নিরাপত্তা ও মর্যাদারও প্রশ্ন।

দক্ষিণ সিটি বলছে ‘সাময়িক জলজট’

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মোহাম্মদ আবদুস সালাম বলেন, টানা ভারী বর্ষণে রাজধানীজুড়ে সাময়িক জলজট তৈরি হলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ভোর থেকেই সিটি করপোরেশনের কর্মীরা মাঠে রয়েছেন। পানি নিষ্কাশনের প্রতিবন্ধকতা দূর করে জীবন স্বাভাবিক রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে। নাগরিকদের ধৈর্য ধরে পরিস্থিতি মোকাবিলার আহ্বান জানান তিনি।

ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, সড়কের ওপর যে পানি দেখা যাচ্ছে, তা টানা বৃষ্টির ফল। এটিকে স্থায়ী জলাবদ্ধতা না বলে ‘জলজট’ বলা যায়। বৃষ্টি কমে গেলে আধা ঘণ্টার মধ্যে পানি নেমে যাবে। তবে কোনও স্থানে স্থায়ীভাবে পানি জমে থাকলে পরিচ্ছন্নতা দল সেখানে গিয়ে প্রতিবন্ধকতা দূর করবে।

সিটি করপোরেশনের ব্যাখ্যায় পরিস্থিতিকে সাময়িক জলজট হিসেবে দেখা হচ্ছে। কিন্তু নগর পরিকল্পনাবিদদের প্রশ্ন— প্রতিবছর ভারী বৃষ্টিতে যদি একই এলাকা ডুবে যায় এবং একই দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি ঘটে, তাহলে তাকে শুধু সাময়িক জলজট বলা কতটা যুক্তিযুক্ত?

পানি থাকবে কোথায়, যাবে কোন পথে

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সহসভাপতি নগর পরিকল্পনাবিদ শেখ মুহাম্মদ মেহেদী আহসান বলেন, ‘‘রাজধানীর জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ ড্রেনেজ ব্যবস্থার অচলাবস্থা।’’ তার প্রশ্ন, “যেখানে পানি থাকার কথা এবং যে পথ দিয়ে স্বাভাবিকভাবে পানি প্রবাহিত হওয়ার কথা, সেটাই তো নেই। তাহলে জলাবদ্ধতা নিরসন হবে কীভাবে?”

তার মতে, সঠিক পরিকল্পনা ও কার্যকর উদ্যোগ নিলে জলাবদ্ধতা কমানো সম্ভব। দুই সিটি করপোরেশন জলাধার ও পানি নিষ্কাশনের পথ সচল রাখতে পারলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে। রাজধানীতে হাতিরঝিলের মতো আরও কয়েকটি জলাধারের প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।

উন্নত বিশ্বের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণে জলাধার সংরক্ষণ এবং পানি নিষ্কাশনের পথ সচল রাখাই মূলনীতি। যারা এই নিয়ম মানছে, তারা সুফল পাচ্ছে; যারা মানছে না, তারা জলাবদ্ধতার শিকার হচ্ছে। সমস্যা সমাধানে রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতির কথাও তুলে ধরেন তিনি।

‘জলজট’ নাম দিলেই দায় শেষ হয় না

বিশ্লেষকদের মতে, ঢাকার খাল, জলাধার ও নিচু জমির একটি বড় অংশ দখল ও ভরাট হয়েছে। কংক্রিটে ঢাকা পড়েছে শহরের মাটি। ফলে বৃষ্টির পানি শোষণের জায়গা কমেছে, একইসঙ্গে নদী ও খালে পৌঁছানোর স্বাভাবিক পথও সংকুচিত হয়েছে। নালা ও পানি নিষ্কাশনের পথে জমছে প্লাস্টিকসহ কঠিন বর্জ্য। ভারী বৃষ্টি সমস্যার সূচনা করলেও দুর্ভোগের গভীরতা নির্ধারণ করে শহরের পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা।

প্রতিবছর একই সড়ক ডোবে, একই সতর্কবার্তা দেওয়া হয় এবং মানুষ একইভাবে নোংরা পানি মাড়িয়ে কর্মস্থলে যায়। বৃষ্টি থামলে পানি নামে, আলোচনাও থেমে যায়। পরের বর্ষায় পুরোনো দৃশ্য আবার ফিরে আসে। তাই প্রশ্ন হচ্ছে— বছরের পর বছর প্রকল্প ও বরাদ্দের পরও এই শহর কেন বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনের সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি?

অল্প কিছু মানুষ হয়তো জানালার পাশে বসে মাংস দিয়ে গরম খিচুড়ি খেতে খেতে বর্ষার সৌন্দর্য উপভোগ করেন। কিন্তু কোটি মানুষের এই শহরে অধিকাংশের কাছে বৃষ্টি রোমান্স নয়। তাদের কাছে বৃষ্টি মানে কর্মস্থলে পৌঁছানোর যুদ্ধ, বাড়তি ভাড়া, ভেজা পোশাক, নোংরা পানি, নষ্ট হওয়া পণ্য ও অনিশ্চিত আয়।

Manual2 Ad Code

বৃষ্টি প্রকৃতির। কিন্তু সেই বৃষ্টিকে অন্তহীন জনদুর্ভোগে পরিণত করার দায় নগর পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এড়াতে পারে না।

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১৩
১৫১৬১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
৩০  

Manual1 Ad Code
Manual5 Ad Code