চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ৬ মাসে ১০ হাজারের বেশি অভিযোগ দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) জমা পড়েছে। এর মধ্যে এক হাজারের বেশি অভিযোগকে অনুসন্ধানযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করেছে দুদকের যাচাই-বাছাই কমিটি (যাবাক)।
গত ৩ মার্চ ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেনের নেতৃত্বাধীন কমিশন পদত্যাগ করায় বর্তমানে কমিশন বিহীন দুদকে জমা হওয়া অভিযোগগুলোর বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হচ্ছে না। প্রায় ৯ হাজার অভিযোগ দুদকের তফসিলবহির্ভূত ও অনুসন্ধান অযোগ্য হওয়ায় বাতিল অথবা ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। এ ব্যাপারে দুদকের মুখপাত্র ও উপপরিচালক (জনসংযোগ) আকতারুল ইসলাম জানান, আইন অনুযায়ী কমিশনের সিদ্ধান্ত ছাড়া নতুন কোনো অভিযোগের অনুসন্ধান শুরু করার সুযোগ নেই। তাই অনুসন্ধান শুরু, মামলা দায়ের ও চার্জশিট দেওয়ার ক্ষেত্রে নতুন কমিশনের অপেক্ষায় আছেন দুদক কর্মকর্তারা।
Manual8 Ad Code
দুদক সূত্র জানায়, সারা দেশে দুদকের বিভিন্ন জেলা এবং রাজধানীর সেগুনবাগিচায় সংস্থাটির প্রধান কার্যালয়ে প্রতিদিনই অভিযোগ জমা পড়ছে। কিছু অভিযোগ দুদকের চেয়ারম্যান বা কমিশনার বরাবর এসেছে। কমিশন না থাকায় সেই অভিযোগগুলো এখনো খুলে দেখা হয়নি। গত ৬ মাসে বিভিন্ন মহাপরিচালকের বরাবর এবং জেলা ও বিভাগীয় কার্যালয়গুলো থেকে আসা অভিযোগগুলো পর্যায়ক্রমে যাচাই-বাছাই কমিটিতে পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে বাছাই করে দুদকের তফসিলভুক্ত এক হাজারের বেশি অভিযোগ অনুসন্ধানযোগ্য হিসেবে সুপারিশ করেছে যাচাই-বাছাই কমিটি (যাবাক)। জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত তৎকালীন কমিশন কয়েকটি অভিযোগের অনুসন্ধান শুরুর সিদ্ধান্ত দিলেও বাকিগুলো এখনো পড়ে আছে সিদ্ধান্তহীনতায়।
দুদকের পরিসংখ্যান অনুসারে, গত বছর (২০২৫) দুদকে মোট ১৩ হাজার ৮৭৭টি অভিযোগ জমা পড়ে। এর মধ্যে অনুসন্ধানের জন্য গ্রহণ করা হয় মাত্র ২ হাজার ৫৩৬ অভিযোগ। বাকি ১১ হাজার ৩৭৭টি অভিযোগ অনুসন্ধানযোগ্য না হওয়ায় বাতিল অথবা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।
Manual2 Ad Code
এর আগে ২০২৪ সালে দুদকে মোট অভিযোগ আসে ১৫ হাজার ৮৪২টি। এর মধ্যে ১ হাজার ৮৯৪টির অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত হয়। ২০২৩ সালের মোট অভিযোগ জমা হয়েছিল ১৫ হাজার ৪৩৭টি। এর মধ্যে মাত্র ৮৪৫টি অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য গ্রহণ করা হয়। ২০২২ সালে মোট অভিযোগ এসেছিল ১৯ হাজার ৩৩৮টি। এর মধ্যে ৯০১টি অভিযোগের অনুসন্ধান শুরু করা হয়। ২০২১ সালে ১৪ হাজার ৭৮৯টি অভিযোগ আসে। এর মধ্যে ৫৩৩টির অনুসন্ধান শুরু করা হয়। ২০২০ সালে ১৮ হাজার ৪৮৯টি অভিযোগ জমা হয়। অনুসন্ধান শুরু হয় ৮২২টি।
Manual1 Ad Code
যাচাই-বাছাই কমিটি প্রতিটি অভিযোগ গ্রহণের ক্ষেত্রে ১০০ নম্বরের একটি মার্কিং করে থাকে। অভিযোগটি দুর্নীতির অন্তর্ভুক্ত কি না, সেই বিষয়ে বিভিন্ন মানদণ্ড বিবেচনা করে নম্বর দেওয়া হয়। এই পদ্ধতিতে যেগুলোতে ৬০ নম্বর পায় না, সেগুলোকে আমলে নেওয়া হয় না। আর যেগুলোতে ৬০ বা তার বেশি নম্বর আসে, সেগুলো অনুসন্ধানের জন্য নেওয়া হয়। যাচাই-বাছাই কমিটি বেশ কিছু বিষয় বিবেচনা করে থাকে। যেমন, অভিযোগটি দুদকের তফসিলভুক্ত অপরাধ কি না। কার বরাবরে অভিযোগটি পাঠানো হয়েছে, অভিযোগকারীর নাম-পরিচয়-ঠিকানা ও টেলিফোন নম্বর আছে কি না, অভিযোগটির সুনির্দিষ্ট ও অপরাধের উপাদন আছে কি না, শত্রুতাবশত অথবা হয়রানির উদ্দেশ্যে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে কি না, বর্ণিত অপরাধ করার ক্ষমতা ও সুযোগ অভিযোগসংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আছে কিনা এবং অভিযোগটি আমলে নিলে আদালতে প্রমাণ করা যাবে কি না। সব ঠিক থাকলে অভিযোগটি অনুসন্ধানযোগ্য হিসেবে ঘোষণা করে যাচাই-বাছাই কমিটি বা যাবাক। যাবাকের সুপারিশ খতিয়ে দেখে অনুসন্ধান শুরুর সিদ্ধান্ত দিয়ে থাকে কমিশন।
এদিকে, গত মার্চ থেকে জুন মাস পর্যন্ত ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে শতাধিক লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে। ক্ষমতার অপব্যবহার, অর্থ আত্মসাৎ, ঘুষ গ্রহণ, কর ফাঁকি ও অর্থ পাচারসহ তফিসলভুক্ত অপরাধের অভিযোগগুলোর তালিকা প্রস্তুত করেছে দুদকের অভিযোগ যাচাই-বাছাই কমিটি (যাবাক)। নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে। সবচেয়ে বেশি অভিযোগ এসেছে সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, নূরজাহান বেগম, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও মাহফুজ আলমের বিরুদ্ধে। অধিকাংশ অভিযোগকারী তাদের নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়েছেন।
অবশ্য, আইন অনুসারে দুদকও অভিযোগকারীর নাম-পরিচয় কঠোরভাবে গোপন রাখে। দুদক আইন-২০০৪-এর ২৮(খ) ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে, কোনো তথ্য প্রদানকারীর নাম, ঠিকানা বা পরিচয় প্রকাশ করা যাবে না এবং কোনো দেওয়ানি বা ফৌজদারি আদালতে সাক্ষী করা যাবে না।