কৌশলগত ভূ-রাজনীতিতে গুরুত্ব পাচ্ছে চীনের প্রস্তাবিত করিডর
কৌশলগত ভূ-রাজনীতিতে গুরুত্ব পাচ্ছে চীনের প্রস্তাবিত করিডর
editor
প্রকাশিত জুলাই ২০, ২০২৬, ০৩:৪১ অপরাহ্ণ
Manual1 Ad Code
প্রজন্ম ডেস্ক:
Manual7 Ad Code
কৌশলগত ভূ-রাজনীতিতে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে চীনের প্রস্তাবিত ত্রিদেশীয় অর্থনৈতিক করিডর। চীন-মায়ানমার-বাংলাদেশকে নিয়ে এই অর্থনৈতিক করিডর যেমন সংশ্লিষ্ট এ দেশগুলোর অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করেছে, তেমনি করিডরের প্রবেশদ্বার হিসেবে বঙ্গোপসাগরে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজির কারণে প্রতিবন্ধকতার আশঙ্কাও রয়েছে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি ইতিহাসের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দেখা দিয়েছে। ‘হরমুজের’ শিক্ষা চীনকে মালাক্কা প্রণালি নিয়ে বেশি করে চিন্তার খোরাক জুগিয়েছে। মালাক্কা প্রণালিতে তাইওয়ান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবন্ধকতার বিষয়টি নতুন করে ভাবাচ্ছে চীনকে। এ জন্যই তেল-গ্যাসহ চীনা পণ্যের সরবরাহ চ্যানেল নির্বিঘ্ন করতে নতুন ও বিকল্প এই করিডরের চিন্তা করছে চীন।
এদিকে চীনের প্রস্তাবিত এই করিডরের মাধ্যমে দেশটি যেমন নতুন, বিকল্প ও নির্বিঘ্ন সরবরাহ চ্যানেল পেতে যাচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশ কীভাবে লাভবান হবে তা নিয়েও বিভিন্ন মহলে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। এই করিডরের সঙ্গে যুক্ত হবে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দর এবং প্রয়োজনে মোংলাসহ অন্য বন্দর। এই বন্দরের প্রবেশদ্বার আবার বঙ্গোপসাগর, সেখানে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজির স্বার্থ জড়িত। কাজেই করিডর ও চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে চীনের প্রবেশাধিকার ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে দেখবে, সেটাও চিন্তার বিষয়। সংশ্লিষ্ট কূটনীতিক ও বিশ্লেষকদের দাবি, চীনের প্রস্তাবিত এ করিডর শুধু অর্থনৈতিক করিডর। এই করিডর বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ, মায়ানমার ও চীন সবাই লাভবান হবে।
প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম শামস জানান, চীনের প্রস্তাবিত এই করিডর খুবই ভালো উদ্যোগ। এতে বাংলাদেশের বন্দর ব্যবহার করে চীন তাদের ইউনান প্রদেশে পণ্য পরিবহন করতে পারবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বন্দর ব্যবহারের ফি আদায় করে লাভবান হতে পারবে। বন্দর ব্যবহারের সুযোগ শুধু চীনের জন্য নয়; ভারত, মায়ানমারসহ আগ্রহী দেশগুলোর জন্যও উন্মুক্ত রাখতে হবে। এ জন্য ভারসাম্য রক্ষার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। জাতীয় স্বার্থে বিশেষ কোনো একটি দেশের জন্য নয়, সব দেশের জন্য বন্দর ব্যবহারের সুযোগ রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে জাতীয় ঐক্য প্রয়োজন। তবে অর্থনৈতিক এই করিডরটি যত তাড়াতাড়ি বাস্তবায়িত হবে, বাংলাদেশও তত দ্রুত ফল পাবে।
Manual1 Ad Code
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফরে করিডরের এই প্রস্তাবটি সামনে আনেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। বাংলাদেশের সঙ্গে আরও যোগাযোগ ও অর্থনীতির পরিধি বাড়াতে বাংলাদেশ থেকে মায়ানমার হয়ে চীন পর্যন্ত এই অর্থনৈতিক করিডর করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এখানে কীভাবে ত্রিদেশীয় একটি ইকোনমিক করিডর তৈরি করা যায়, যার মূল উদ্দেশ্য হবে বাংলাদেশের অর্থনীতির পরিধি বাড়ানো এবং বহুমুখী পরিবহনব্যবস্থাকে আরও উন্নত ও কার্যকর করা। এটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের মোংলা বন্দর, চট্টগ্রাম বন্দর, বে-টার্মিনাল, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর এবং সম্ভাব্য অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো আঞ্চলিক সরবরাহব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এমন যে এটি দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে একটি স্বাভাবিক সেতুবন্ধ হিসেবেও কাজ করতে পারে।
Manual7 Ad Code
বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেন, উন্নয়ন, বাণিজ্য, যোগাযোগ ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা দিতে চীন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ-চীন-মায়ানমার অর্থনৈতিক করিডর নিয়ে কাজ এগিয়ে যাচ্ছে।
চীনে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমেদ জানান, চীন-মায়ানমার-বাংলাদেশ করিডর হচ্ছে মূলত ইকোনমিক কানেকটিভিটি। কানেকটিভিটির এই উদ্যোগটি যথেষ্ট ভালো বাংলাদেশের জন্য। বাংলাদেশের বন্দরগুলোকে আরও বেশি ব্যবহারের মাধ্যমে দেশ উন্নত হতে পারে। তবে একে কাজে লাগানোর উপায় নিয়ে আগে থেকে ভাবতে হবে। এর সঙ্গে মায়ানমারের রাখাইনের অর্থনৈতিক উন্নয়নও জড়িত। এটি হলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনও সহজ হতে পারে, কারণ সেখানে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুযোগ থাকবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম ভিত্তি হলো ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা। চীন বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন অংশীদার, আবার ভারত বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশী এবং নিরাপত্তা ও অর্থনীতির ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গেও বাংলাদেশের সম্পর্ক আরও গভীর হচ্ছে। তাই কোনো একক শক্তির কৌশলগত প্রতিযোগিতার অংশ না হয়ে নিজের জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়াই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে যৌক্তিক পথ।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক শাহাব এনাম খান এ বিষয়ে বলেন, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের কারণে চীনের জ্বালানি আমদানিতে হরমুজ প্রণালিতে যে ধরনের প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হচ্ছে, তা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ। কেননা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাব্যবস্থা হরমুজ প্রণালির নিশ্চয়তা দিতে পারছে না। তাইওয়ান-যুক্তরাষ্ট্রের কারণে মালাক্কা প্রণালিতেও যদি এ ধরনের প্রতিবন্ধকতা ভবিষ্যতে তৈরি হয়, তা চীনের অর্থনীতির জন্য বড় ধাক্কা হয়ে দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এসব বিবেচনায় বিকল্প রুট নিয়ে ভাবতে হচ্ছে চীনকে। চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ ইউনান যেহেতু ‘ল্যান্ডলকড’, তাই বিকল্প কয়েকটি সামুদ্রিক রুট প্রস্তুত রাখা নিয়ে দেশটি ভাবছে। যদিও যেকোনো সমুদ্রবন্দরের ভূ-কৌশলগত গুরুত্ব আছে, বঙ্গোপসাগরও তার ব্যতিক্রম নয়। তিনি বলেন, এই অঞ্চলের ৯০ শতাংশ বাণিজ্য হয় বঙ্গোপসাগর দিয়ে। এখানে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা হলে বড় সমস্যা হবে। তাই জাতীয় নিরাপত্তা এবং দেশের স্বার্থে সিদ্ধান্ত যথেষ্ট হিসাব-নিকাশ করে নিতে হবে। তবে ত্রিদেশীয় এই করিডর দেশের জন্য বড় সুযোগ, যদি দক্ষতা ও দ্রুততার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
Manual5 Ad Code
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেন, চীন-মায়ানমার-বাংলাদেশ ইকোনমিক করিডরের ধারণা খুবই ভালো। এই করিডর চীনের ইউনান প্রদেশের রাজধানী কুনমিং থেকে শুরু হয়ে মায়ানমারের মান্দালয় পৌঁছাবে। সেখান থেকে একটি অংশ মায়ানমারের ইয়াঙ্গুন এবং অন্য একটি অংশ রাখাইন রাজ্যের কিয়াউকপিউ গভীর সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। মায়ানমারের সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করে চীনের ইউনানে নানা পণ্য আমদানি-রপ্তানি হয়। সেখান থেকে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দরের সংযোগ হলে পণ্য আমদানি-রপ্তানি ব্যয় ও সময় কমবে। এ ছাড়া প্রয়োজন হলে মায়ানমারের রাখাইন হয়ে ত্রিদেশীয় একাধিক রুট তৈরি করেও বাণিজ্য সুবিধা বাড়ানোর সুযোগ আছে।