সাভারের রুহুল আমিন ২০২৪ সালে ঢাকার চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (সিজেএম) আদালতে চেক প্রত্যাখানের (চেক ডিজঅনার) একটি মামলা করেন। দুই বছরে মামলাটির বিচারপ্রক্রিয়া অনেকদূর এগিয়ে যায়।
সিজেএম আদালত থেকে মামলাটি বদলি হয়ে ঢাকার সপ্তম যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ আদালতে আসে। চলতি বছর জানুয়ারিতে মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ হয়েছে।
দ্রুত অগ্রসরমান মামলাটি থমকে যায় ফেব্রুয়ারিতে। বদলি প্রক্রিয়া শেষে সিজেএম আদালতে মামলার কার্যক্রম শুরু নিয়ে শঙ্কিত মামলার বাদী।
একইভাবে আলেশা মার্টের চেয়ারম্যান মঞ্জুর আলম শিকদারের বিরুদ্ধে ২০২২ সালে দুটি মামলা করেন আব্দুল্লাহ আল মামুন নামে এক ব্যক্তি। মামলাটি ২০২৩ সালে বদলি হয়ে ঢাকার তৃতীয় যুগ্ম মহানগর দায়রা জজ আদালতে যায়।
সেই আদালতে চার্জগঠনের পর প্রায় বছর ধরে থমকে আছে বিচার প্রক্রিয়া। এর মধ্যে তারিখ পড়লেও নতুন আইনের কারণে আর এগোয়নি মামলাটি। বদলি হয়ে মামলাটি সিএমএম আদালতে আসার কথা থাকলেও এখনও তা আসেনি।
নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট অ্যাক্ট বা হস্তান্তরযোগ্য দলিল আইনের (এনআই অ্যাক্ট) ১৩৮ ধারায় চেক প্রত্যাখানের সব মামলার বিচার চলছিল যুগ্ম দায়রা জজ আদালতে। তবে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি এক অধ্যাদেশের মাধ্যমে এই আইনের ১৪১(সি) ধারা পরিবর্তন করে এই বিধানে পরিবর্তন আনা হয়েছে। চেকে উল্লেখিত অঙ্কের পরিমাণ ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত হলে এসব মামলার বিচারে এখতিয়ার প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটকে দেওয়া হয়েছে। বাকি মামলা যথারীতি যুগ্ম দায়রা জেজ আদালতে হবে। অধ্যাদেশটি জাতীয় সংসদে পাসের পর গত ১০ এপ্রিল আইনে পরিণত হয়।
Manual3 Ad Code
নতুন আইনটিকে ইতিবাচক বলছেন আইনজীবীরা। বিশেষ করে ঢাকার যুগ্ম মহানগর দায়রা জজ আদালতে চেকের মামলায় যে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল, তার নিরসন হবে বলেও আশা করছেন তারা। আগে যেখানে মামলায় একবার তারিখ পড়তেই ছয় মাস থেকে এক বছর সময় লাগত, সেখানে এখন এক বছরের মধ্যে মামলা চূড়ান্ত নিষ্পত্তির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
তবে পুরনো আইনে যেসব মামলা যুগ্ম দায়রা জজ আদালতগুলোতে চলমান ছিল, সেগুলোর বদলি নিয়ে পড়তে হচ্ছে ভোগান্তিতে। বিশেষ করে যেসব মামলা বিচারের শেষ দিকে ছিল, সেগুলো পুনরায় বদলি হয়ে সিএমএম বা সিজেএম আদালতে আসায় এই বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে।
বদলির ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কোনো পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়নি। ফলে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি অধ্যাদেশ জারির পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো অনেক মামলা বদলি হয়নি। বিপুল সংখ্যক মামলা বদলি করে পাঠাতে গিয়ে আদালতের স্টাফরাও চাপ সামলাতে পারছেন না। আইনজীবীরা এই আদালত ওই আদালত ঘুরেও মামলার সবশেষ তথ্য পাচ্ছেন না। অনেকে অভিযোগ করছেন, পদ্ধতিগত জটিলতার কারণে মামলা খুঁজে না পেলেও অজান্তেই বদলি হয়ে আসামির অনুপস্থিতিতেই মামলার রায় হয়ে যাচ্ছে বা বাদীর অনুপস্থিতিতে খারিজ হয়ে যাচ্ছে।
সেক্ষেত্রে যেসব মামলা যুগ্ম দায়রা জজ আদালতে বিচার শুরু হয়েছিল সেগুলোর বিচার ওখানেই সমাপ্ত হলে ভোগান্তি কম হতো মনে করেন অনেক আইনজীবী। যেসব মামলা নতুনভাবে দায়ের হচ্ছে বা যেসব মামলার বদলি আদালত চার্জগঠন হয়নি, শুধু সেই মামলাগুলো সিএমএম বা সিজেএম আদালতে বিচারের জন্য পাঠানো যেত।
ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত মামলা করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সেলিম মিয়া। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বর্তমান যে অবস্থা সেটা সামগ্রিক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা। কারণ অনেক ক্ষেত্রেই আইনগুলো করার আগে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়া হয় না। বরং যারা দায়িত্বে থাকেন তারা এক ধরনের এক্সপেরিমেন্ট (পরীক্ষা) করেন। চেকের মামলা একসময় অতিরিক্ত ও যুগ্ম দায়রা আদালত দুই জায়গাতেই বিচার হতো। পরবর্তীতে চেক প্রত্যাখ্যানের সব মামলা বিচারের জন্য যুগ্ম দায়রা আদালতগুলোকে ক্ষমতা দেওয়া হয়।
তিনি আরও বলেন, এখন চলমান পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত চেকের মামলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এটি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত। তবে বার বার নিয়ম বদলের কারণে নতুন করে চরম ভোগান্তি সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা থাকলে শুরুতেই এই পদ্ধতি অনুসরণ করতে পারত।
ঢাকার তৃতীয় যুগ্ম মহানগর দায়রা জজ আদালতের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর সুমন ভূ্ঁইয়া জানিয়েছেন, এই আদালতের পাঁচ লাখ টাকার নিচের চেক প্রত্যাখ্যানের অনেক মামলা এখনও বদলি করে সিএমএম আদালতে পাঠানো হয়নি। বদলির কার্যক্রম চলমান রয়েছে। বিপুল সংখ্যক মামলার চাপের কারণে বদলি প্রক্রিয়া কিছুটা বিলম্বিত হচ্ছে।
Manual3 Ad Code
তবে আইনের পরিবর্তনে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য টাকা আদায়ে নতুন এক দ্বার উন্মোচন হয়েছে বলে মনে করেন বাংলাদেশ ফাইন্যান্সের হেড অব লিগ্যাল অ্যান্ড কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স ব্যারিস্টার মুহাম্মদ ইব্রাহিম খলিল।
তিনি বলেন, আইনটি নিঃসন্দেহে অনেক ভালো। আমি মনে করি ম্যাজিস্ট্রেট আদালতকে বিচারের এখতিয়ার পাঁচ লাখ টাকার জায়গায় আরও বাড়ানো উচিত। তাতে দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি হবে।
চলমান মামলা বদলি প্রসঙ্গে এই আইনজীবী বলেন, এটা সত্য অনেক মামলা বিচার প্রক্রিয়া শেষ দিকে ছিল। কিন্তু ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালতের অধীন যুগ্ম দায়রা আদালতসমূহে মামলার যে জট তৈরি হয়েছিল তাতে ছয় মাসের কম কোনো চেকের মামলার তারিখ পড়তো না। সেক্ষেত্রে একেবারে শেষ পর্যায়ে যেসব মামলা ছিল সেগুলোর ক্ষেত্রে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে। তবে আগে যেখানে এক তারিখ পড়তেই কমপক্ষে ছয় মাস লাগত, সেখানে এখন ছয় মাসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি হয়ে যাচ্ছে। তাই কিছু ক্ষেত্রে অসুবিধা হলেও সামগ্রিকভাবে বেশিরভাগ মামলাই দ্রুত নিষ্পত্তি হবে বলে আমি মনে করি।
Manual2 Ad Code
জানতে চাইলে ঢাকার মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, চেক প্রত্যাখ্যানের মামলায় ঢাকার মহানগর যুগ্ম দায়রা আদালতগুলোতে একধরনের ডেডলক (অচলাবস্থা) তৈরি হয়েছিল। লাখের কাছাকাছি মামলা শুধু ঢাকাতেই বিচারাধীন ছিল। তাই এই বিপুল সংখ্যক মামলার চাপ এই আদালতগুলো আর নিতে পারছিল না। একটা কাজ করতে গেলে সাময়িক কিছু অসুবিধা হয়। কারণ একই আইনে তো আর ভিন্ন মামলার জন্য ভিন্নরকম বিধান হয় না। তাই ভালো কিছুর জন্য সাময়িকভাবে এই অসুবিধাটা মানতে হবে।