‘আমরা শিক্ষকদের ভয় পেতাম। তবে সেটা ছিল শ্রদ্ধার ভয়। তারা আমাদেরকে মন দিয়ে পড়াতেন। আমাদের গড়ে তুলতেন। আমরা চেষ্টা করেছি তাদের শিক্ষা নিয়ে এ পর্যন্ত আসতে। খুব মিস করি জলঢুপ উচ্চ বিদ্যালয়কে। আমি যতটুকই ক্ষুদ্র বা যাই হতে পেরেছি, মনে করি স্কুলের শিক্ষক, পরিবেশ, ঘাস-মাটি আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে-কথাগুলো বলেন রাজধানীতে কর্মরত সাংবাদিক আজিজুল পারভেজ।
শুধু তিনি নন, ঐতিহ্যবাহী এ স্কুলের প্রতিটি প্রাক্তন ছাত্রেরই একই আবেগ কাজ করে তাদের শৈশবের স্মৃতিবিজড়িত এই বিদ্যালয় ঘিরে। তবে শতাব্দীর ইতিহাস, বহুতল ভবন, মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ, আইসিটি ল্যাব থাকলেও অভিভাবকদের অসচেতনতায় সংকটে ভুগছে ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ জলঢুপ উচ্চ বিদ্যালয়। আরেকটি বড় সংকট এখন তীব্র হয়ে ওঠছে। শিক্ষার্থীরা পাঠগ্রহণে অমনোযোগী। তারা এখন শিখতে চায়না-বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের কন্ঠে এমন হতাশাই ফুঁটে ওঠেছে।
জলঢুপ উচ্চ বিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, এটি মেধা ও মনন বিকাশের এক অনন্য কারখানা। এই স্কুলে পড়াশোনা করেছেন দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য প্রথিতযশা ব্যক্তি। ১৯৩৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয়ের চিরচেনা করিডোর, নির্মল প্রকৃতি, কমলা-আনারসের ঘ্রাণ, বিশাল খেলার মাঠ আর গাছতলার স্মৃতি নিয়ে যুগের পর যুগ ধরে এভাবেই ছড়াতে আছে শিক্ষার আলো। বিদ্যালয়ের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, এটি শুরু থেকেই মেধার দিক থেকে অন্যতম সেরা। জলঢুপ উচ্চ বিদ্যালয়ে বর্তমানে ভবন সংকট নেই। প্রায় সাড়ে ৫শ’ শিক্ষার্থীর জন্য ২০ জন শিক্ষকের প্রয়োজন। তবে সহকারি প্রধান শিক্ষকসহ শূণ্য আছে ৫টি শিক্ষকের পদ। ইংরেজী, শারীরিক শিক্ষা ও বিজ্ঞান শিক্ষক নেই। ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষায় বিদ্যালয়ে ৭১ ভাগ শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়। ২০২৪ সালে পাশের হার আরোও কম ছিল।
জলঢুপ এলাকার কয়েকজন অভিভাবকের সাথে কথা হলে তারা জানান, ভেতরে-ভেতরে তীব্র সংকটে ধুঁকছে ঐতিহ্যবাহী এই বিদ্যাপীঠ। প্রতি বছর পাবলিক পরীক্ষায় কাগজে-কলমে ফলাফল ভালো করলেও শ্রেণিকক্ষে গুণগত পাঠদানের অভাব। বিদ্যালয়ের অতীত ঐতিহ্যের তুলনায় এই পাবলিক পরীক্ষায় ফলাফলের অর্জন সন্তোষজনক নয়।
‘আমাদের সময় শিক্ষকদের সঙ্গে ছাত্রদের আত্মিক সম্পর্ক ছিল। শিক্ষকরা নাম ধরে চিনতেন। এখন ছাত্র-শিক্ষকদের সেই অম্ল-মধুর সম্পর্কটা আর নেই।’- জলঢুপ উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় আগ্রহ কম জানিয়ে আবেগের সুরে কথাগুলো বলেন স্থানীয় ইউপি সদস্য ও প্রাক্তন ছাত্র সাদিকুর রহমান খান।
Manual5 Ad Code
বিদ্যালয়ে আধুনিক আইসিটি ল্যাব ও মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম আছে। স্কুলে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় নয় দশক আগে প্রতিষ্ঠিত জলঢুপ উচ্চ বিদ্যালয়ের মূল ফটক থেকে প্রবেশ করেই প্রথমেই রয়েছে পরিপাটি বেশ কয়েকটি ভবন। আছে সুসজ্জিত শিক্ষক মিলনায়তন, প্রধান শিক্ষকের কক্ষসহ অফিস কক্ষ। রয়েছে প্রতি ফ্লোরেই আলাদা আলাদা ওয়াশরুম। লাইব্রেরীর অবস্থা ভালো নয়।
Manual3 Ad Code
খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও জলঢুপ উচ্চ বিদ্যালয়ের অতীত অর্জন ঈর্ষণীয়। ক্রিকেট ও ফুটবল প্রতিযোগিতায় এই স্কুলের শিক্ষার্থীরা বহু ট্রফি ও গৌরব বয়ে এনেছে। এছাড়া জাতীয় স্কুল বিতর্ক প্রতিযোগিতা এবং বিজ্ঞান মেলাগুলোয় এই স্কুলের দাপট চিরচেনা। তবে বর্তমানে সাংস্কৃতিক চর্চা উদ্বেগজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে।
জলঢুপ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মুছব্বির আলী জানান, আমরা শিক্ষকরা পরিশ্রম করি ঠিকই, কিন্তু ছাত্রদের কাছ থেকে যে আউটপুট আমরা আশা করি সেটা কম পাচ্ছি। এই সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে হয়ে আসছে। শিক্ষার্থীরা এখন পাঠে কম মনোযোগী। এখানকার অভিভবকরাও নিজের সন্তানদের নিয়ে ততটা সচেতন নয়। তিনি বলেন, ‘ক্লাসে শিক্ষকরা যথেষ্ট মানসম্পন্ন পাঠদান করেন এবং তা কড়া নজরদারিতে রাখা হয়।’
Manual3 Ad Code
Manual2 Ad Code
স্কুলের বর্তমান শিক্ষার্থী ও বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মাঝে জলঢুপ উচ্চ বিদ্যালয়ের নাম শুনলেই এক অভূতপূর্ব আবেগ ও উদ্দীপনা কাজ করে। স্থানীয় শিক্ষার প্রসারে আলোকবর্তিকা হয়ে এগিয়ে চলেছে প্রতিষ্ঠানটি। গৌরবোজ্জ্বল অতীত, প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্য আর হাজারো কৃতী শিক্ষার্থীর পদচারণায় মুখরিত এই স্কুলটি যেন মহাকালের এক নীরব সাক্ষী।