প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

১৩ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২৯শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
৩০শে সফর, ১৪৪৮ হিজরি

বিচারকদের কথা ভাবার কেউ নেই

editor
প্রকাশিত আগস্ট ১৩, ২০২৬, ০৭:৩৮ পূর্বাহ্ণ
বিচারকদের কথা ভাবার কেউ নেই

Manual5 Ad Code

 

প্রজন্ম ডেস্ক:

 

Manual2 Ad Code

ন্যায়বিচারের আশায় আদালত প্রাঙ্গণে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রোদে পুড়ছেন বিচারপ্রার্থীরা। বারান্দায় তিল ধারণের ঠাঁই নেই; বসার জায়গা না পেয়ে কেউ দাঁড়িয়ে, কেউ সিঁড়িতে, আবার কেউ খোলা মাঠে অপেক্ষার প্রহর গুনছেন। তবে কেবল বিচারপ্রার্থীরাই নন, চরম দুরবস্থার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে খোদ বিচারকদেরও। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, পৃথক এজলাস কক্ষ ও তীব্র জনবল সংকটে দেশের জেলা ও দায়রা জজ আদালতগুলোর এখন করুণ দশা। কোথাও একাধিক বিচারককে একটি এজলাস ভাগাভাগি করে কাজ চালাতে হচ্ছে, কোথাও পরিত্যক্ত ভবনের ফুটো ছাদ দিয়ে পড়ছে বৃষ্টির পানি। আবার কোথাও স্টেনোগ্রাফার না থাকায় দাপ্তরিক কাজ বিচারককে নিজেকেই করতে হচ্ছে। মামলার পাহাড় আর এজলাস সংকটের এই অবস্থায় সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন উঠেছেÑ ন্যায়বিচার নিশ্চিতের গুরুদায়িত্ব যাদের কাঁধে, সেই বিচারকদের কথা ভাববে কে?

 

অবকাঠামোগত সংকট, বিচারকের শূন্যপদ এবং জনবল সংকটÑ এই তিন চাপে কার্যত হোঁচট খাচ্ছে জেলা পর্যায়ের বিচারব্যবস্থা। স্থানীয়দের মতে, এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিচারপ্রার্থী সাধারণ মানুষের ওপর। বছরের পর বছর মামলা চললেও অনেকেই পাচ্ছেন না কাঙ্ক্ষিত নিষ্পত্তি। প্রায় ২০ কোটি জনসংখ্যা অধ্যুষিত বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশে জনসংখ্যার অনুপাতে যে পরিমাণ বিচারক থাকার কথা, তা একেবারেই অপ্রতুল। দেশের অনেক অধস্তন আদালতে পর্যাপ্ত এজলাস নেই। একদিকে মামলার পাহাড়, অন্যদিকে এজলাস সংকট। সংকটের কারণে বিচারকদের পালা করে এজলাসে বসে বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়। অনেক জেলা আদালতে বিচারকদের জন্য পর্যাপ্ত খাসকামরা, এজলাস ও বসার ব্যবস্থা পর্যন্ত নেই।

 

খুলনায় ফুটো ছাদ দিয়ে পড়ে পানি

খুলনায় মামলার পাহাড়, তার ওপর এজলাস সংকট। পর্যাপ্ত এজলাস না থাকায় বিচারকদের ভাগাভাগি করে বসতে হচ্ছে। পুরনো ও জরাজীর্ণ আদালত ভবনের কারণে বর্ষায় ১০ থেকে ১২টি এজলাসে পানি পড়ে। এতে ব্যাহত হচ্ছে বিচারকাজ। আদালতসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, খুলনায় ৫৪টি আদালতের বিপরীতে বিচারক রয়েছেন ৫৩ জন। জেলা আদালতে এজলাসের ঘাটতি রয়েছে ১৩টির। আর খুলনার আদালতগুলোতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা প্রায় ৭৫ হাজার। তীব্র এজলাস সংকটে একটি আদালতে পাঁচ-ছয়জন বিচারককে দুটি এজলাস ভাগ করে বসতে হচ্ছে।

সাতক্ষীরায় ২০ শতাংশ পদই শূন্য

সাতক্ষীরা জেলা জজকোর্টে সম্প্রতি কয়েকটি নতুন আদালত সৃষ্টি করা হলেও সেগুলোতে এখনও বিচারকদের পূর্ণাঙ্গ পদায়ন হয়নি। বর্তমানে বিদ্যমান আদালত ভবনে নতুন বিচারকদের জন্য পর্যাপ্ত খাসকামরা, এজলাস ও বসার ব্যবস্থা নেই। এ ছাড়া ভবনটির ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণেরও সুযোগ নেই। অন্যদিকে আদালতে প্রায় ১২০টি কর্মকর্তা-কর্মচারীর পদ শূন্য রয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে ৪ হাজার মামলা বিচারাধীন; চলতি বছরের জানুয়ারি মাস থেকে ওই আদালতে বিচারক নেই। সাব-জজ ওয়ান ও টুতে বর্তমানে মোট আটটি আদালতের দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র দুজন বিচারক।

রংপুরে পরিত্যক্ত ভবনে ঝুঁকি নিয়ে বিচারকাজ

রংপুরের জেলা ও দায়রা জজ আদালতের অবস্থা বেশ করুণ। এখানে দুটি আদালতের এজলাস নেই। নিজস্ব ভবন না থাকায় মহানগর দায়রা জজ আদালতের ৯টি আদালত ও ৬টি ট্রাইব্যুনাল পরিচালিত হচ্ছে চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের ভবনে। এ ছাড়া পরিত্যক্ত ভবনে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ১১টি আদালতের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এসব কারণে গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় থাকেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। ভবন ও এজলাস সংকটের কারণে বিঘ্নিত হচ্ছে বিচারের পরিবেশ। নিজস্ব এজলাস না থাকায় ভবন ভাড়া করে আদালতপাড়ার বাইরে শ্রম আদালতের কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে। পরিত্যক্ত ভবনে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের তিনটি আদালত, ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনাল আদালত, স্পেশাল জজ আদালত এবং সিনিয়র সহকারী জজ আদালতের ৬টির বিচারিক কার্যক্রম চলছে।

জয়পুরহাটে অন্য আদালতে গিয়ে বিচারকাজ

জয়পুরহাট জেলা ও দায়রা জজ আদালতে পর্যাপ্ত এজলাসকক্ষ না থাকায় নতুন বিচারকরা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে গিয়ে বিচারকাজ পরিচালনা করছেন। আদালত সূত্র জানায়, জেলা ও দায়রা জজ এবং চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পদের বিপরীতে যথেষ্ট বিচারক নেই। এর মধ্যে সম্প্রতি নতুন তিনটি বিশেষ আদালত ও ট্রাইব্যুনালে বিচারক পদায়ন করলেও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, পৃথক এজলাসকক্ষ কিংবা সহায়ক জনবল বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। ফলে নতুন আদালতগুলো আপাতত চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবনের পঞ্চম তলার এজলাস ব্যবহার করে বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। প্রতিদিনের বাংলাদেশকে এসব বিষয়ের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন জেলা ও দায়রা জজ আদালতের প্রশাসনিক কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম।

 

Manual6 Ad Code

লালমনিরহাটে নেই স্বতন্ত্র ভবন, শূন্য বিচারকের পদ

লালমনিরহাট আদালত সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের জুন মাস পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন আদালতে ৩১ হাজার ৬৪৯টি মামলা বিচারাধীন। চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারকের ৯টি পদের মধ্যে ৬টিই শূন্য। জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের তিনটি পদ দীর্ঘদিন ধরে ফাঁকা।

লালমনিরহাট জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য অ্যাডভোকেট হাফিজুর রহমান বলেন, চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের জন্য স্বতন্ত্র ভবন নেই, ছোট ছোট কক্ষে আদালতের কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এজলাসগুলোতে পর্যাপ্ত জায়গার অভাবে আইনজীবীদের দাঁড়িয়ে কাজ করতে হয়। ভিন্ন ভিন্ন মামলার আসামিদের একসঙ্গে এজলাসে রাখা হয়, সংখ্যা বেশি হলে আসামিদের আদালতকক্ষের বাইরে রেখেই হাজিরা নেওয়া হয়। এ ছাড়া নারী বিচারপ্রার্থীদের জন্য নিরাপদ বসার ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত শৌচাগার, নামাজের স্থান ও ব্রেস্ট ফিডিং কর্নারের মতো মৌলিক সুবিধাও নেই।

 

বরগুনায় একই কক্ষ ব্যবহার করেন দুই বিচারক

বরগুনা জেলায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নতুন হওয়া শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল, পারিবারিক আপিল ট্রাইব্যুনাল, ল্যান্ড সার্ভে আপিল ট্রাইব্যুনাল, ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনাল ও পারিবারিক আদালতের জন্য পৃথক এজলাস ও বিচারকদের খাসকামরার ব্যবস্থা নেই। ফলে একাধিক আদালতকে একই এজলাস ভাগাভাগি করে বিচারকার্য পরিচালনা করতে হচ্ছে। একই আদালতকক্ষ দুজন বিচারক পালাক্রমে ব্যবহার করায় শুনানির সময়সূচি সমন্বয় করতে তৈরি হচ্ছে জটিলতা। চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতেও রয়েছে তীব্র স্থান ও জনবল সংকট।

বরগুনা জেলা ও দায়রা জজ আদালত ভবনগুলোতে বর্তমানে মোট ১৬টি এজলাস রয়েছে। এর মধ্যে ৫টি অস্থায়ী সেমিপাকা ভবনে। বিচারকদের ১৭টি খাসকামরার মধ্যে ৫টিই অস্থায়ী স্থাপনায়। জনবল সংকট মোকাবিলায় নিরাপত্তাপ্রহরী ও পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে বিচারিক কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে। মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতার কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ বিচারপ্রার্থীরা। জমিজমা নিয়ে করা ২০০৭ সালের মামলা ১৮ বছর পার হলেও নিষ্পত্তি হয়নি। বরগুনা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট নুরুল আমিন বলেন, চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি স্বতন্ত্র ভবনের অভাবে বিচারক, আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীÑ সবাইকে প্রতিদিন ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

 

Manual4 Ad Code

যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা

এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল হাবীবুর রহমান বলেন, জেলা পর্যায়ের অধস্তন আদালতের নানামুখী সংকটের বিষয়ে তারা ওয়াকিবহাল। এবারের বাজেটে সরকার গত বছরের তুলনায় ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ বাড়িয়েছে। তিনি বলেন, প্রত্যাশিত মাত্রায় কাজ করতে না পেরে একদিকে যেমন বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি হচ্ছে, অন্যদিকে বিচারকদের আমলনামা (এসিআর) নেতিবাচক হচ্ছে, যা তাদের চাকরিজীবনে প্রভাব ফেলবে। এ ছাড়া এজলাস ভাগাভাগি করার কারণে দ্বিতীয়ার্ধে বিচারকার্যে পর্যাপ্ত উপস্থিতি থাকে না, যা সঠিক বিচারের অন্তরায়।

রেজিস্ট্রার জেনারেল আরও জানান, অনেক জেলায় সিভিল জজদের স্টেনোগ্রাফার নেই, ফলে দাপ্তরিক লেখালেখির কাজ বিচারককে নিজেকেই করতে হয়। এই মুহূর্তে ন্যূনতম সাড়ে তিন হাজার বিচারক প্রয়োজন। এসব সংকটের বিষয় সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে এবং ধীরে ধীরে এর সমাধান হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

Manual5 Ad Code

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সাঈদ আহমেদ রাজা বলেন, ‘দেশের বিচারব্যবস্থার অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিশ্চিত করা রাজনৈতিক সরকারের অন্যতম প্রধান কাজ। শুধু বিচারক নিয়োগ করলেই হবে না, বিচারকদের কাজের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে বিপুল জন-অধ্যুষিত দেশের বিচারব্যবস্থা পিছিয়ে পড়বে।’

দ্রুত এসব অবকাঠামোগত ও জনবল সংকটের সমাধান করা না হলে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা আরও বাড়বে। দীর্ঘ হবে বিচারপ্রক্রিয়া। আর বছরের পর বছর আদালতের দ্বারে ঘুরতে থাকা বিচারপ্রার্থীদের অপেক্ষাও দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হবে।

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১৩১৫১৬
১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭৩০
৩১  

Manual1 Ad Code
Manual5 Ad Code