ক্যামেরায় ধরা পড়ে খুন, অধরাই থেকে যায় ‘মাস্টারমাইন্ড’
ক্যামেরায় ধরা পড়ে খুন, অধরাই থেকে যায় ‘মাস্টারমাইন্ড’
editor
প্রকাশিত আগস্ট ১৩, ২০২৬, ০৭:৫০ পূর্বাহ্ণ
Manual2 Ad Code
প্রজন্ম ডেস্ক:
রাজধানীতে একের পর এক চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের দৃশ্য ধরা পড়ছে সিসিটিভি ক্যামেরায়। কোথাও অস্ত্র হাতে দেখা যাচ্ছে হামলাকারীকে, কোথাও মোটরসাইকেলে এসে গুলি করে পালানোর দৃশ্যও স্পষ্ট। অনেক ঘটনায় হামলাকারীদের চেহারা, গতিবিধি ও পালানোর পথ শনাক্ত করার তথ্যও জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তারপরও ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে বেশ কিছু হত্যাকাণ্ডের শুটার ও নেপথ্যের পরিকল্পনাকারীরা।
সাম্প্রতিক কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের তদন্তে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা পুরোনো আন্ডারওয়ার্ল্ডের দ্বন্দ্ব, চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তার, অবৈধ অস্ত্র এবং বিদেশে অবস্থানরত ব্যক্তিদের নির্দেশের মতো বিষয় সামনে আসার কথা বলছেন। কোথাও আবার ভাড়াটে শুটার ব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে সরিয়ে দেওয়ার তথ্যও পাওয়া যাচ্ছে বলে দাবি তদন্ত সংশ্লিষ্টদের।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য, এসব ঘটনায় জড়িত সন্দেহভাজনদের কেউ দীর্ঘদিন কারাগারে ছিলেন। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তাদের কয়েকজন জামিনে মুক্তি পান। কেউ দেশে আত্মগোপনে রয়েছেন, আবার কেউ অবস্থান করছেন বিদেশে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, অবস্থান বদলালেও তাদের কেউ কেউ পুরোনো অপরাধ নেটওয়ার্কের সঙ্গে যোগাযোগ ধরে রেখেছেন।
চাঁদাবাজি, এলাকা দখল, হাট-বাজারের নিয়ন্ত্রণ, অস্ত্রের কারবার কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হলে এসব নেটওয়ার্ক আবার সক্রিয় হয়ে উঠছে বলে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। আর প্রতিপক্ষকে সরাতে ব্যবহার করা হচ্ছে ভাড়াটে শুটারদের।
সাম্প্রতিক কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের তদন্তে এমন প্রবণতাই উঠে এসেছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।
পুরান ঢাকার খুন, নির্দেশ দুবাই থেকে
গত বছরের ১০ নভেম্বর পুরান ঢাকার ন্যাশনাল মেডিক্যাল ইনস্টিটিউট হাসপাতালের সামনে গুলিতে নিহত হন ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ মামুন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এ হত্যাকাণ্ডের নির্দেশ এসেছিল দুবাই থেকে। তদন্তে নির্দেশদাতা হিসেবে ক্যাপ্টেন ইমন নামে পরিচিত আরেক ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’র নাম এসেছে বলেও জানায় সূত্র।
তদন্ত সংশ্লিষ্টদের মতে, বিদেশে অবস্থান করে স্থানীয় অনুসারীদের মাধ্যমে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগের একটি উদাহরণ এই হত্যাকাণ্ড।
মুছাব্বির হত্যা: নির্দেশ মালয়েশিয়া থেকে
এ বছরের ৭ জানুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম তেজতুরী বাজার এলাকায় স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা আজিজুর রহমান মুছাব্বিরকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশ সূত্রের দাবি, এ হত্যাকাণ্ডের নির্দেশও এসেছিল বিদেশ থেকে, মালয়েশিয়া থেকে। নির্দেশদাতা হিসেবে দীলিপ ওরফে ‘দাদা বিনাশ’-এর নাম তদন্তে এসেছে বলে জানিয়েছে সূত্র।
মিরপুর, মহাখালী, কাওরানবাজার ও মগবাজারকেন্দ্রিক অপরাধ নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে হত্যাকাণ্ডটি ঘটানো হয়েছে কিনা, তা তদন্তে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। নেপথ্যে ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ শেখ মোহাম্মদ আসলাম ওরফে সুইডেন আসলামের কোনও ভূমিকা ছিল কিনা, সেটিও তদন্তকারীরা দেখছেন বলে জানা গেছে।
টিটন হত্যা: হাটের ইজারা, অস্ত্র ও আধিপত্য
গত ২৮ এপ্রিল নিউ মার্কেট এলাকায় গুলি করে হত্যা করা হয় ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনকে। ২০০৪ সাল থেকে কারাগারে থাকা টিটন ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট জামিনে মুক্তি পেয়েছিলেন।
হত্যার ঘটনায় তার বড় ভাইয়ের করা মামলায় সন্দেহভাজন হিসেবে পিচ্চি হেলাল, বাদল ওরফে কিলার বাদল, শাহজাহান ও রনি ওরফে ভাঙারি রনির নাম উল্লেখ করা হয়। এজাহারে বছিলার কোরবানির পশুর হাটের ইজারা নিয়ে টিটনের সঙ্গে পিচ্চি হেলালের বিরোধের কথাও বলা হয়েছে।
টিটন ছিলেন আরেক ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ ইমনের শ্যালক। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রের দাবি, অস্ত্রের কারবার ও প্রভাব বিস্তার নিয়েও তাদের মধ্যে বিরোধ ছিল। ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের এক কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, টিটন হত্যায় ইমনের কোনও সম্পৃক্ততা ছিল কিনা, সেটিও গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।
কাইল্যা পলাশ: গুলির নির্দেশ দুবাই থেকে
গত ১২ জুন রামপুরায় নামাজ শেষে বাসায় ফেরার পথে গুলিবিদ্ধ হন তালিকাভুক্ত ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ ইয়াসিন খান ওরফে কাইল্যা পলাশ। আট দিন পর ২০ জুন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এর মাত্র এক মাসের কিছু আগে, ৭ মে তিনি কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পেয়েছিলেন।
তদন্ত সংশ্লিষ্টদের দাবি, পলাশকে হত্যার নির্দেশ এসেছিল দুবাই থেকে। নির্দেশদাতা হিসেবে পলাতক ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ জিসান আহমেদ মন্টির নাম তদন্তে এসেছে বলে জানিয়েছে সূত্র। জিসান দীর্ঘদিন ধরে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন বলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
লক্ষ্য ‘ডিশ বাবু’, প্রাণ গেলো পারভেজের
গত ২৪ জুলাই মিরপুরের ১৩ নম্বর সেকশনে গুলি করে হত্যা করা হয় যুবদল কর্মী মো. ইউসুফ আলী পারভেজকে। তদন্তে পুলিশ জানতে পারে, হামলার মূল লক্ষ্য ছিলেন কাফরুল থানা যুবদলের সদস্যসচিব হাফিজুল ইসলাম বাবু ওরফে ডিশ বাবু।
পুলিশের দাবি, তাকে হত্যার জন্য ২৫ লাখ টাকার চুক্তি হয়েছিল। মাগুরা ও ঝিনাইদহ থেকে চার পেশাদার শুটার—চঞ্চল, জিহাদ মোল্লা, জিয়ারুল মোল্লা ও হাসানকে আনা হয়েছিল।
তদন্তকারীদের ভাষ্য, কাফরুল থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক হাফিজুর রহমান হাফিজ ওরফে সিএনজি হাফিজ শুটারদের ভাড়া করেছিলেন। তবে লক্ষ্যভ্রষ্ট গুলিতে নিহত হন পারভেজ। এ ঘটনায় চার শুটারসহ আটজনকে গ্রেফতারের পর এসব তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
Manual7 Ad Code
তদন্তে ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ কিলার আব্বাসের নামও এসেছে। তদন্তকারীরা ঘটনাটিকে সাম্প্রতিক ‘কন্ট্রাক্ট কিলিং’-এর একটি উদাহরণ হিসেবে দেখছেন।
জামিনে বেরিয়ে পুরোনো নেটওয়ার্কে?
২০২৪ সালের আগস্ট থেকে বিভিন্ন সময়ে ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের কয়েকজন আলোচিত সন্ত্রাসী জামিনে মুক্তি পান। ১২ আগস্ট কিলার আব্বাস, ১৩ আগস্ট ফ্রিডম রাসু, ১৪ আগস্ট ইমন এবং ১৫ আগস্ট পিচ্চি হেলাল মুক্তি পান। ৩ সেপ্টেম্বর মুক্তি পান সুইডেন আসলাম। ১৯ ডিসেম্বর মুক্তি পান ফ্রিডম সোহেল।
তাদের কেউ দুই দশকের বেশি সময় কারাগারে ছিলেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, মুক্তির পর তাদের কয়েকজন পুরোনো অনুসারীদের সঙ্গে যোগাযোগ পুনঃস্থাপন করেছেন। কেউ সরাসরি মাঠে না থাকলেও অনুসারীদের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন বলে তাদের ধারণা।
আধিপত্যের লড়াইয়ে খুন
তদন্তকারীরা বলছেন, সব হত্যাকাণ্ডের পেছনে একই কারণ নেই। তবে কয়েকটি বিষয় বারবার সামনে আসছে—এলাকার নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজির ভাগ, হাটবাজার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে আধিপত্য, অবৈধ অস্ত্রের কারবার, রাজনৈতিক প্রভাব এবং পুরোনো শত্রুতা।
অপরাধের ধরনও বদলেছে বলে মনে করছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। তাদের ভাষ্য, নির্দেশদাতা এক জায়গায়, মধ্যস্থতাকারী অন্য জায়গায়; অস্ত্র সরবরাহ করছে আরেকজন। শেষ পর্যায়ে ট্রিগার টানছে ভাড়াটে শুটার। এই বহুস্তরীয় কাঠামোর কারণে শুধু শুটারকে গ্রেফতার করলেও পুরো নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
অবস্থান বিদেশে, নেটওয়ার্ক দেশে
দুবাই ও মালয়েশিয়া থেকে হত্যার নির্দেশ আসার তথ্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উদ্বেগ বাড়িয়েছে। তদন্ত সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রযুক্তিনির্ভর যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে নির্দেশদাতার ঘটনাস্থলে থাকার প্রয়োজন হচ্ছে না। বিদেশে অবস্থান করেও স্থানীয় সহযোগী, পুরোনো অনুসারী ও ভাড়াটে সন্ত্রাসীদের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ড ঘটানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
Manual6 Ad Code
এক তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, হত্যাকাণ্ড ঘটাতে শুধু একজন শুটারই যথেষ্ট নয়। অর্থ, অস্ত্র, মোটরসাইকেল, লক্ষ্যব্যক্তির অবস্থানের তথ্য, আশ্রয় এবং পালানোর পথ—সবকিছুর জন্য স্থানীয় একটি নেটওয়ার্ক প্রয়োজন।
বাড়ছে আতঙ্ক ও উদ্বেগ
একের পর এক প্রকাশ্য হত্যাকাণ্ডে নগরবাসীর মধ্যেও নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে। ফার্মগেটের ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম বলেন, “যেভাবে প্রকাশ্যে গুলি করে মানুষ মারা হচ্ছে, তাতে ভয় তো লাগেই। যারা আসে তারা পেশাদার। কয়েক মিনিটের মধ্যে কাজ শেষ করে চলে যায়। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়?”
Manual1 Ad Code
নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুবদলের এক নেতা বলেন, “টাকার বিনিময়ে শুটার এনে মানুষ হত্যা করা হলে রাজনীতি করা মানুষের মধ্যেও ভয় তৈরি হয়। আজ একজন টার্গেট হচ্ছে, কাল আরেকজন হতে পারে। এই নেটওয়ার্ক ভাঙতে না পারলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।”
‘শুধু ট্রিগারম্যান ধরলে হবে না’
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম বলেন, পেশাদার ও ভাড়াটে খুনি-শুটারদের তালিকা হালনাগাদ করার কাজ চলমান। কে কার অনুসারী, কোথা থেকে নির্দেশ আসে এবং কারা কতটুকু জড়িত—এসব বিষয়েও পুলিশ কাজ করছে বলে জানান তিনি।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট আরেক কর্মকর্তা বলেন, “শুধু যে ট্রিগার টেনেছে, তাকে ধরলে হবে না। কার নির্দেশে হত্যা, অর্থ কোথা থেকে এসেছে, অস্ত্র কে দিয়েছে এবং পালানোর ব্যবস্থা কে করেছে—পুরো চক্র শনাক্ত করতে হবে।”
Manual6 Ad Code
‘কন্ট্রাক্ট কিলিংয়ের আলামত স্পষ্ট’
অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নাসিরউদ্দীন সম্রাট বলেন, সাম্প্রতিক কয়েকটি হত্যাকাণ্ডে ‘কন্ট্রাক্ট কিলিং’-এর আলামত স্পষ্ট।
তার মতে, মূল পরিকল্পনাকারীরা আড়ালে থেকে অর্থের বিনিময়ে পেশাদার খুনি ব্যবহার করছে। অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের পাশাপাশি হত্যার পর দ্রুত পালানোর পরিকল্পনাও আগে থেকেই করা হচ্ছে। জনাকীর্ণ এলাকায় গুলি করে নির্বিঘ্নে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাকে তিনি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য গুরুতর সতর্কসংকেত হিসেবে দেখছেন।
ঢাকার অপরাধজগতে ‘শীর্ষ সন্ত্রাসীদের’ প্রভাব নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো পুরোনো আন্ডারওয়ার্ল্ডের নতুন কৌশলের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কেউ বিদেশে, কেউ আত্মগোপনে, আবার কেউ জামিনে মুক্ত হয়ে প্রকাশ্যে নেই। তারপরও হত্যা, চাঁদাবাজি ও আধিপত্যের লড়াইয়ে ঘুরেফিরে আসছে তাদের নাম।
আন্ডারওয়ার্ল্ডের পুরোনো মুখগুলো দৃশ্যমান না হলেও রাজধানীর অপরাধজগতে তাদের প্রভাব বা নেটওয়ার্ক কতটা সক্রিয়, সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডগুলোর তদন্তে সেই প্রশ্নই সামনে আসছে।