ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের আকাশে অনিশ্চয়তার কালো মেঘ পুরোপুরি কাটেনি। ২০২৪ সালের পর থেকে শুরু হওয়া টানাপড়েন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফরের মধ্য দিয়ে স্বাভাবিক রূপ পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। চলতি মাসেই এ সফর হওয়া নিয়ে জোর আলোচনা চলছে। যদিও দুপক্ষের আলোচনা এখনও দরকষাকষির পর্যায়েই রয়েছে। এদিকে এরই মধ্যে দুপক্ষের আলোচনায় পুরনো ইস্যু নিয়ে নতুন করে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে।
গত রবিবার ঢাকার পক্ষ থেকে অনুকূল পরিবেশ নেইÑ এমন মন্তব্য করে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে দুটি শর্ত দেওয়া হয়েছে। এগুলো হচ্ছেÑ সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি হত্যা মামলার আসামিদের বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করা। এ বিষয়ে দিল্লির জবাবের অপেক্ষায় থাকার কথাও জানানো হয়েছে। এদিকে ওই দিনই বাংলাদেশে ভারতের নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী সফর নিয়ে আশা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর খুব শিগগিরই হওয়া উচিত। শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠক ও আলোচনার মাধ্যমেই যেকোনো সমস্যার সমাধান সম্ভব।’ দুপক্ষের এমন অবস্থানকে কূটনীতিকদের কেউ কেউ দরকষাকষি হিসেবে দেখছেন।
Manual7 Ad Code
ভারতীয় গণমাধ্যমে বাংলাদেশের ‘কঠিন শর্ত’
এদিকে বাংলাদেশ যেসব শর্ত দিয়েছে ভারতীয় গণমাধ্যমগুলো তাদের প্রতিবেদনে সেগুলোকে ‘কঠিন শর্ত’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এ বিষয়ে গতকাল সোমবার ‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’তে শিরোনাম করা হয়েছে যে, ‘বাংলাদেশ সেটস টাফ রাইডারস ফর পিএম তারেক রহমান’স ভিজিট টু ইন্ডিয়া’; পাশাপাশি ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের’ খবরের শিরোনাম দেওয়া হয়েছে ‘সেন্ড শেখ হাসিনা ব্যাক : বাংলাদেশ’স ‘রেড লাইন’ ফর পিএম রহমান’স ভিজিট’ অর্থাৎ ‘শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠাও : প্রধানমন্ত্রী রহমানের সফরের জন্য বাংলাদেশের ‘চূড়ান্ত সীমারেখা’।
টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বাংলাদেশের বিভিন্ন ‘কট্টরপন্থী গোষ্ঠী এবং জামায়াতে ইসলামীর মিত্র জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি)’ উত্তরোত্তর চাপের মধ্যে ঢাকা নয়াদিল্লিকে কঠোর শর্ত দিয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছÑ শেখ হাসিনা ও অন্যান্য পলাতক অপরাধী ব্যক্তিদের প্রত্যর্পণে দ্রুত উদ্যোগ নিতে হবে এবং তারেক রহমানের সফরের ক্ষেত্রে ‘সহায়ক পরিবেশ’ তৈরি করতে হবে।
ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেখানকার কূটনৈতিক মহলের অনেকেই মনে করছে, কার্যত বিরোধী পক্ষগুলোর ‘কঠোর শর্ত’ দেওয়ার দাবির কাছে বাংলাদেশ সরকার ‘আত্মসমর্পণ’ করেছে। শর্তগুলো এমন, যা ভারতের পক্ষে তাৎক্ষণিকভাবে মেনে নেওয়া আপাতদৃষ্টিতে সম্ভব নয়। ‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’র প্রতিবেদনমতে, চলতি সপ্তাহে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সর্বশেষ যে বিবৃতি দিয়েছে, তার ফলে ‘তারেক রহমানের দ্বিপক্ষীয় সফরের সম্ভাবনা কার্যকর অর্থে বাতিল হয়েছে।’
উল্লেখ্য, গত রবিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র একেএম শহীদুল করিম ব্রিফিংয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে দুই দেশের কর্মকর্তারা কয়েক সপ্তাহ ধরে যোগাযোগ করছিলেন। তবে গত ৫ আগস্ট দিল্লিতে শেখ হাসিনা প্রকাশ্যে বক্তব্য দেওয়ার পর সেই পরিবেশ নষ্ট হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা মনে করি, এই সফরের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা দরকার। এজন্য দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনা ও অন্যান্য পলাতক অপরাধীর প্রত্যর্পণের অনুরোধ ত্বরান্বিত করা এবং হাদি হত্যা মামলার আসামিদের দ্রুত হস্তান্তরের অনুরোধ করা হয়েছে ভারতকে। এখন দিল্লির জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে ঢাকা।’ এই বিষয়ে দিল্লির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
Manual3 Ad Code
এরই মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ ক্ষেত্রে সম্পর্কোন্নয়নের প্রত্যাশা নিয়ে গতকাল সোমবার সফরে ঢাকায় এসেছে ভারতের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী সংগঠন ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রির (সিআইআই) একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল।
Manual5 Ad Code
সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে
তবে গতকাল সোমবার ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী রাজধানীর এক অনুষ্ঠানে এ নিয়ে কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, ‘বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর খুব শিগগিরই হওয়া উচিত। শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠক ও আলোচনার মাধ্যমেই যেকোনো সমস্যার সমাধান সম্ভব।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি আরও আশাবাদী। বাংলাদেশ ও ভারতের মানুষের হৃদয়ের সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। বাংলাদেশ ও ভারত শুধু সীমান্ত ভাগাভাগি করে না, তারা একটি অভিন্ন স্বপ্নও ধারণ করে।’
দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, ‘আমাদের মধ্যে মতপার্থক্য আছে, বিতর্ক আছে, যুক্তি-তর্ক আছেÑ এটি স্বাভাবিক। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দুজনই জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত নেতা। তাদের লক্ষ্যও একই। আমি গণমাধ্যমে বহুবার বলেছি, যখন এমন দুই নেতা বৈঠক করেন ও আলোচনা করেন, তখন এমন কোনো সমস্যা নেই, যা আলোচনা করে সমাধান করা সম্ভব নয়।’ তিনি আশা প্রকাশ করেন, ‘দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের যোগাযোগ ও পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে।’
প্রত্যর্পণ ইস্যুতে যা বলছে ভারত
Manual1 Ad Code
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে ভারতে অবস্থান করছেন শেখ হাসিনা। মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আহ্বানের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেছিলেন, ‘আমরা আমাদের প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতি অনুযায়ী বিষয়টি পর্যালোচনা করছি, এ বিষয়ে কোনো আপডেট থাকলে আপনাদের জানাব।’ তবে ভারতের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস গত রবিবার এক প্রতিবেদনে লিখেছে, ‘প্রত্যর্পণের সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক বা কূটনৈতিকভাবে নেওয়া হবে না। আদালতের প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের করা অভিযোগগুলো ভারতের আইনেও অপরাধ হিসেবে বিবেচিত কি না, তা যাচাই করা হবে।
ভারতীয় প্রতিনিধিদল ঢাকায়
ভারতে প্রধানমন্ত্রীর সফর নিয়ে দুই দেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে যখন জটিলতা দেখা দিয়েছে, ঠিক তখনই ভারতের উচ্চপর্যায়ের একটি ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল এসেছে ঢাকা সফরে। গতকাল সোমবার তিন দিনের সফরে ১৪ সদস্যের এই প্রতিনিধিদলটি বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগের অংশ হিসেবে সফর করছে বলে জানা গেছে। এই প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রির (সিআইআই) মহাপরিচালক চন্দ্রজিৎ ব্যানার্জি।
এই প্রতিনিধিদলটি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরসহ সরকারের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে বৈঠক করবেন বলে জানা গেছে। আজ মঙ্গলবার দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের নেতাদের সঙ্গেও বৈঠক হবে। এতে দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ীরা থাকবেন। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) সঙ্গেও দলটির বৈঠকের কথা রয়েছে।
যা বলছেন সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ
এ প্রসঙ্গে সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ বলেন, ‘কিছু লোক চায় না যে, ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক হোক। তারা প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরে বাধা সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে। কিন্তু আমার ধারণা শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী যাবেন এবং সেটাই উচিত, কারণ না গেলে সাময়িকভাবে একটি সমস্যা তৈরি হবে। কোনো সমস্যাই দীর্ঘস্থায়ী হয় না, কারণ শেষ পর্যন্ত দুই দেশেরই একে অপরকে প্রয়োজন আছে। যাওয়াটা জরুরি এবং সফরটি মিস করলে আমাদেরই ক্ষতি হবে। ভারতের ক্ষেত্রেও এটি তাদের ভাবমূর্তির বিষয়। একটি বড় দেশ হয়েও ছোট্ট প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে কেন মিলেমিশে চলতে না পারে, সেই প্রশ্ন উঠবে।’
রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ বলেন, ‘শেখ হাসিনাসহ অন্য দণ্ডিতদের প্রত্যর্পণের মতো যে শর্তগুলোর কথা বলা হচ্ছে, তা মনে হচ্ছে সফরটিকে বাধাগ্রস্ত করার কৌশল। প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সমস্যা থাকবেই। কিন্তু সেই সমস্যার মধ্যেই সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়ে যেতে হয়। ভারত ও চীন বড় বড় সমস্যা থাকার পরও সম্পর্ক এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল এবং তাতে দুপক্ষই লাভবান হয়েছিল। সম্পর্ক ভালো হলে বিদ্যমান সমস্যাগুলো নিয়েও অগ্রগতি সম্ভব।’
যা বলছেন অধ্যাপক আমেনা মহসিন
এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক আমেনা মহসিন প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফরের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে বলেন, ‘ডোমেস্টিক কম্পালশন আছেÑ তার পরও আপনাকে তো কথাবার্তার প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। সেই জায়গা থেকে মনে হয় না, প্রধানমন্ত্রীর সফরের ফলে বাংলাদেশের হারাবার কিছু আছে। বরং এখানে দ্বিপাক্ষিক বা সামিট লেভেলে, যেভাবেই হোক, দেশের জনগণের প্রত্যাশা ওখানে উপস্থাপন করতে পরলে ভালো হবে বলে আমি মনে করি।’
সফরের সম্ভাবনা দেখা দিলেও নতুন করে একধরনের জটিলতা সৃষ্টির ব্যাপারে অধ্যাপক আমেনার অবস্থান জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অপেক্ষা করি। আমরাও একটু দেখি না জিনিসটা কীভাবে সমাধা হয়। কিন্তু আমার মনে হয় যে, সফরে যাওয়াটাই ভালো হবে। কারণ আমাদের প্রত্যাশার জায়গাগুলো ওখানে গিয়ে পরিষ্কার করা দরকার।’
বিশ্লেষকদের কারও কারও মতে, শুধু শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নয়, ভারতের সঙ্গে গঙ্গা ও তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও ঝুলে রয়েছে। এ বিষয়গুলোতেও একধরনের সমাধান আসা দরকার। প্রধানমন্ত্রীর সফর হলে এগুলো গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনার ও সমাধানের সুযোগ রয়েছে।’
প্রসঙ্গত, তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আসা ভারতীয় লোকসভার স্পিকার দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারত সফরের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানান। এ ছাড়া চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে ব্রিকসের সম্মেলনে বিমসটেকের বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।