মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরবে বসবাসরত প্রায় ৬৯ হাজার রোহিঙ্গার হাতে বাংলাদেশি পাসপোর্ট থাকার বিষয়টিকে শুধু ‘প্রশাসনিক ভুল’ অভিধা দিয়ে আর পাশ কাটিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। কারণ বাংলাদেশের সঙ্গে সৌদি আরবের কূটনৈতিক ও শ্রমবাজার সম্পৃক্ত সম্পর্ক, রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি পাসপোর্ট নবায়নের সিদ্ধান্ত এবং এ ক্ষেত্রে সৌদি সরকারের চাপÑ সব মিলিয়ে এটি বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারকে একদিকে কঠিন কূটনৈতিক পরীক্ষায় ফেলেছে, অন্যদিকে রোহিঙ্গা সমস্যা থেকে উত্তরণের ক্ষেত্রেও নতুন ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে। কূটনীতিক ও বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলেছেন, অতীতে ভুল পরিচয়ে বাংলাদেশি পাসপোর্ট পাওয়া ব্যক্তিদের পুরনো নথি নবায়ন করার মাধ্যমে রাষ্ট্র কি প্রকারান্তরে পুরনো ভুলকেই স্থায়িত্ব দিচ্ছে না?
Manual5 Ad Code
Manual8 Ad Code
পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র বলছে, সৌদি কর্তৃপক্ষের হিসাবে দেশটিতে প্রায় ৬৯ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশি পাসপোর্ট ব্যবহার করে অবস্থান করছেন। যাদের একটি বড় অংশ ১৯৭৩-৭৪ সালের দিকে বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানি পাসপোর্টে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় সৌদি আরব চলে যান। উল্লেখ্য, তখনও সৌদি আরব বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়নি এবং উভয় দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক ও শ্রমবাজার সেভাবে গড়ে ওঠেনি। ২০২৪ সালের মে মাসে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁনও তার এক বক্তব্যে জানিয়েছিলেন, সৌদি আরবের পক্ষ থেকে দেওয়া তথ্যমতে, সেখানে ১৯৭৩-৭৪ সালের দিক থেকে ৬৯ হাজার রোহিঙ্গা অবস্থান করছেন। তাদের পাসপোর্টজনিত জটিলতা নিয়ে তখন সৌদি সরকারের সঙ্গে সমঝোতার কথাও আলোচনায় উঠে আসে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, মিয়ানমারের নাগরিক বা রোহিঙ্গা হিসেবে পরিচিত এসব মানুষ কোন প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশি পাসপোর্ট পেলেন? তাদের কোন নথির ভিত্তিতে বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছিল? আর কয়েক দশক পর সেই পাসপোর্ট নবায়ন করা হলে আগের সিদ্ধান্তের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে না কেন?
Manual5 Ad Code
২০২৬ সালের ২৮ জানুয়ারি ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মোহাম্মদ তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘অতীতে বাংলাদেশের নিজেদের ভুল ও দুর্নীতির কারণে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন।’ তার ভাষ্য অনুযায়ী, হাতে লেখা পাসপোর্টের সময় এ ধরনের অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। একই সঙ্গে তিনি জানান, সৌদি কর্তৃপক্ষ এসব পাসপোর্ট নবায়নের জন্য বাংলাদেশকে চাপ দিচ্ছে। বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় প্রায় ৬৯ হাজার ব্যক্তির পাসপোর্ট নবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে তিনি এটিও স্পষ্ট করে বলেন, ‘পাসপোর্ট দেওয়া মানেই তাদের বাংলাদেশি নাগরিকত্ব দেওয়া নয়। বিভিন্ন কারণে অন্য দেশের নাগরিককেও আপনি পাসপোর্ট দিতে পারেন এবং পৃথিবীতে এর অনেক নজির রয়েছে।’ সরকারের এই ব্যাখ্যাই এখন বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। কারণ পাসপোর্ট শুধু বিদেশ ভ্রমণের কাগজ নয়; এতে রাষ্ট্রীয় পরিচয় ও জাতীয়তার প্রশ্নও জড়িয়ে থাকে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. গাজী সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট এবং নাগরিকত্বকে আলাদা করে দেখার সরকারি বক্তব্যটি আইনগতভাবে আরও পরিষ্কার করা প্রয়োজন। একজন ব্যক্তিকে বাংলাদেশি পাসপোর্ট দেওয়ার ক্ষেত্রে তার জাতীয়তার পরিচয় কীভাবে নির্ধারিত হচ্ছে, সেটি আইনের আলোকে ব্যাখ্যা করতে হবে। বিশেষ ভ্রমণ নথি দেওয়ার সুযোগ থাকলে সেটিও বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে।’ তবে সরকারের দায়িত্বশীলরা বলছেন, বিশেষ পরিস্থিতিতে কোনো রাষ্ট্র নাগরিকত্ব না দিয়েও নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে ভ্রমণনথি দিতে পারে এবং এই পাসপোর্ট তাদের বাংলাদেশি নাগরিক বানাচ্ছে না।
১৭ হাজার নয়, আলোচনায় ৬৯ হাজার
Manual6 Ad Code
রোহিঙ্গাদের পাসপোর্টের সংখ্যা নিয়েও বিভ্রান্তি রয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র অনুযায়ী, অতীতে প্রায় ১৭ হাজার রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশি পাসপোর্ট দেওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু সৌদি কর্তৃপক্ষের হিসাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সংখ্যা প্রায় ৬৯ হাজার। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শুরুতে প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়, সৌদি আরবের বিভিন্ন শহরে থাকা ১৭ হাজার ৩৯৪ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশি মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট দেওয়া হয়েছে। একই সময়ে আরও ৫১ হাজার ৬৯৮ জনের আবেদন প্রক্রিয়াধীন ছিল। তাদের মধ্যে ২০ হাজার ৯৯০টি পাসপোর্ট ছাপার পর্যায়ে এবং ২১ হাজার ৬৪৮ জনের বায়োমেট্রিক সম্পন্ন হয়েছিল। অর্থাৎ ১৭ হাজারের সংখ্যা মোট রোহিঙ্গার সংখ্যা নয়; এটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে পাসপোর্ট পাওয়া ব্যক্তিদের সংখ্যা। যা সামগ্রিক হিসাবে প্রায় ৬৯ হাজার।
সিদ্ধান্তের শুরু আগেই
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। ওই বছরের আগস্টেই সৌদি রাষ্ট্রদূত প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে প্রায় ৬৯ হাজার ব্যক্তির পাসপোর্ট নবায়নের বিষয়টি তোলেন। চলতি বছরের গত ১৫ জানুয়ারি সৌদি রাষ্ট্রদূত প্রায় ৬৯ হাজার রোহিঙ্গার পাসপোর্টের অগ্রগতি জানতে তৎকালীন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লে. জে. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর সঙ্গে বৈঠক করেন। এরপর ২৮ জানুয়ারি তৎকালীন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মোহাম্মদ তৌহিদ হোসেন জানান, সৌদি আরব বাংলাদেশের জন্য বড় শ্রমবাজার। বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় পাসপোর্ট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন সূত্রমতে, বর্তমান তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের ওপর এখন এ ব্যাপারে সরাসরি চাপ এসেছে। সৌদি রাষ্ট্রদূত গত ২০ এপ্রিল বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে বৈঠকে এ কাজ দ্রুত করার অনুরোধ জানিয়েছেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলছে, প্রয়োজনীয় নথি ও প্রমাণপত্র যাচাই করে প্রায় ২২ হাজার ব্যক্তিকে পাসপোর্ট দেওয়া হয়েছে। তবে সরকারের বর্তমান অবস্থান হলো, বৈধ বাংলাদেশি নথি থাকা বা নির্ধারিত শর্ত পূরণকারী মিয়ানমারের নাগরিকদেরই দেশের পাসপোর্ট দেওয়া যেতে পারে। এ কারণে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পূর্ণাঙ্গ তালিকা নিয়ে বিষয়টি পুনরায় যাচাইয়ের কথা বলা হয়েছে।
সৌদির আগ্রহ, বাংলাদেশের সংকট
সৌদি আরবের জন্য বিষয়টি মূলত অভিবাসন ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত। বৈধ পাসপোর্ট বা ভ্রমণ নথি ছাড়া দেশটিতে কোনো বিদেশি নাগরিকের দীর্ঘ অবস্থান প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি করে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশের তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, সৌদি পক্ষের সঙ্গে এমন সমঝোতা হয়েছে যে এসব ব্যক্তিকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে না এবং তাদের পাসপোর্ট নবায়ন করা হবে। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য প্রশ্নটি শুধু কূটনৈতিক নয়। প্রশ্ন হলো, কয়েক দশক আগে ভুল কিংবা অবৈধ প্রক্রিয়ায় কেউ বাংলাদেশি পাসপোর্ট পেয়ে থাকলে এখন সেই পাসপোর্ট নবায়নের মাধ্যমে কি পুরনো পরিচয়কে আবার কার্যকর করা হচ্ছে?
নিরাপত্তার প্রশ্নও রয়েছে
পরিচয় যাচাইয়ের দুর্বলতার সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টিও জড়িত। ২০১৯ সালের একটি অনুসন্ধানে সৌদি আরবে বাংলাদেশি পাসপোর্ট ব্যবহারকারী রোহিঙ্গাদের বিষয়টি সামনে আসে। দেশের একটি চক্র তাদের পাসপোর্ট পাইয়ে দিতে কাজ করে বলেও অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছিল। ২০২৬ সালেও বাংলাদেশে রোহিঙ্গার কাছ থেকে বাংলাদেশি জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে। রোহিঙ্গা নারীকে বাংলাদেশি পাসপোর্ট পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগে পাঁচজনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের অভিযোগপত্র দেওয়ার তথ্যও এসেছে।
এ বিষয়ে নিরাপত্তা বিশ্লেষক কর্নেল (অব.) কাজী শরিফ উদ্দীন, ‘অতীতে জাল জন্মনিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র বা স্থানীয় প্রত্যয়ন ব্যবহার করে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি পাসপোর্ট দেওয়া হয়ে থাকলে এবার প্রতিটি ফাইল ফরেনসিকভাবে যাচাই করা উচিত। শুধু সৌদি তালিকা বা পুরনো পাসপোর্টের ওপর নির্ভর করা নিরাপদ নয়।’ তিনি বলেন, ‘এখন নতুন সরকারের সামনে অন্তত তিনটি প্রশ্নÑ সৌদি আরবে থাকা ৬৯ হাজার ব্যক্তির প্রকৃত পরিচয় কী? তাদের কতজন বৈধভাবে বাংলাদেশি পাসপোর্ট পেয়েছিলেন এবং কতজন জালিয়াতি বা দুর্নীতির মাধ্যমে নথি সংগ্রহ করেছিলেন? আর পাসপোর্ট নবায়নের আগে কোন সংস্থা কীভাবে তাদের পরিচয় পুনরায় যাচাই করবে?
শুধু সৌদি কর্তৃপক্ষের তালিকা নিলেই এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে না। জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন, পুরনো পাসপোর্টের রেকর্ড, পুলিশ ও গোয়েন্দা যাচাইসহ নির্ভরযোগ্য তথ্যভান্ডারের সঙ্গে তথ্য মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে সাবেক কূটনীতিক মুন্সি ফয়েজ বলেন, ‘সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের শ্রমবাজার, নিরাপত্তা সহযোগিতা ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। তাই সৌদি পক্ষের অনুরোধ উপেক্ষা করা কঠিন। তবে কূটনৈতিক সম্পর্ক রক্ষার পাশাপাশি নাগরিকত্ব ও রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের নীতিও স্পষ্ট রাখতে হবে।’
কক্সবাজারের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসনের সাবেক কমিশনার মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদের মতে, ‘রোহিঙ্গারা বিশ্বের অন্যতম বড় রাষ্ট্রহীন জনগোষ্ঠী। তাদের মানবিক ও আইনগত সুরক্ষা নিশ্চিত করা দরকার। কিন্তু বাংলাদেশের নাগরিকত্বের পরিচয় অস্পষ্ট করে কোনো সমাধান করা হলে ভবিষ্যতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াও জটিল হতে পারে। শেষ পর্যন্ত বিষয়টি শুধু ৬৯ হাজার পাসপোর্ট নবায়নের নয়। প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্রের নথিতে যে ভুল পরিচয় একবার ঢুকে গেছে, সেটি সংশোধন না করে আবার নবায়ন করা হলে সেই দায় কে নেবে?