দেশের শিল্প-কারখানা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে রুফটপ সোলারের (ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ) ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। গ্রিডের বিদ্যুতের তুলনায় কম খরচ, জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা, শিল্প-কারখানায় গ্যাসের সংকট এবং ডিজেলচালিত জেনারেটরের উচ্চ ব্যয়ের কারণে রুফটপ সোলার এখন শিল্প খাতে আকর্ষণীয় বিকল্প হয়ে উঠেছে।
বিশেষ করে দিনে শিল্প-কারখানার বিদ্যুতের চাহিদার একটি বড় অংশ ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে পূরণ করা সম্ভব হওয়ায় এ খাতে বিনিয়োগ বাড়ছে।
Manual5 Ad Code
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে শিল্প-কারখানায় গ্রিড থেকে সরবরাহ করা বিদ্যুতের সর্বোচ্চ ব্যয় প্রতি ইউনিট ১১ টাকা ৫৬ পয়সা। এর বিপরীতে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের ক্যাপেক্স মডেলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের খরচ পড়ছে মাত্র চার থেকে সাড়ে চার টাকা। আর অপেক্স মডেলে প্রতি ইউনিটের খরচ সাত থেকে আট টাকার মধ্যে।
ফলে গ্রিড বিদ্যুতের তুলনায় ক্যাপেক্স মডেলে প্রতি ইউনিটে ৭ টাকারও বেশি এবং অপেক্স মডেলে প্রায় তিন থেকে সাড়ে চার টাকা পর্যন্ত সাশ্রয় করা সম্ভব হচ্ছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভবিষ্যতে গ্রিড বিদ্যুতের দাম আরো বাড়লে শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের আর্থিক উপযোগিতা আরো বাড়বে। প্রচলিত বিদ্যুতের তুলনায় সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে প্রতি ইউনিটে সাশ্রয়ের পরিমাণ বাড়বে। একই সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন প্রযুক্তির উন্নতি এবং সোলার প্যানেলের দাম কমে আসায় এ খাতে বিনিয়োগের সুযোগও বাড়ছে।
তবে শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে সাম্প্রতিক সময়ে করের বোঝা বেড়েছে। আগে ক্যাপিটাল মেশিনারির আওতায় মাত্র ১ শতাংশ কর দিয়ে এসব সরঞ্জাম আমদানি করা যেত। বর্তমানে এসব সরঞ্জামের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও ২ শতাংশ অগ্রিম কর আরোপ করা হয়েছে। এতে রুফটপ সোলার প্রকল্পের কার্যকর করের হার ১ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৭ শতাংশ হয়েছে। ফলে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে প্রাথমিক বিনিয়োগ ব্যয় বেড়েছে।
সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, করের এই বাড়তি বোঝা নতুন বিনিয়োগের গতি কিছুটা কমিয়ে দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, দেশে বর্তমানে ২৩৯টি শিল্প-কারখানাসহ বিভিন্ন ধরনের স্থাপনা ও ভবনে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। এসব স্থাপনার মধ্যে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বিভিন্ন গ্রুপ অব কম্পানির ভবনও রয়েছে। এতে ৬৬৭ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। তবে ক্ষুদ্রাকার স্থাপনাগুলো হিসাবে নিলে দেশে রুফটপ সোলারের মোট সক্ষমতা এক হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত হতে পারে।
টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) গত ১৭ আগস্ট পর্যন্ত হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের মোট সক্ষমতা ১৮২৫.০৮ মেগাওয়াট। এর মধ্যে গ্রিডভিত্তিক সক্ষমতা ১৪৪৬.৫২ মেগাওয়াট এবং গ্রিডের সঙ্গে সংযুক্ত নয় (অফ গ্রিড)—এমন বিদ্যুতের সক্ষমতা ৩৭৮.৫৬ মেগাওয়াট।
স্রেডার তথ্য বলছে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির মোট সক্ষমতার মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ ১৫৩১.৯৯ মেগাওয়াট, বায়ু থেকে ৬২ মেগাওয়াট, হাইড্রো বা পানির শক্তি ব্যবহার করে ২৩০ মেগাওয়াট, বায়োগ্যাস থেকে ০.৬৯ মেগাওয়াট ও বায়োম্যাস থেকে ০.৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি হয়েছে।
এ বিষয়ে ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যানশিয়াল অ্যানালিসিসের (আইইইএফএ) প্রধান বিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেন, ‘জ্বালানি সরবরাহের সংকট ও গ্রিডের বিদ্যুতের উচ্চমূল্যের কারণে দেশের শিল্প খাতে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের প্রতি আগ্রহ ক্রমে বাড়ছে। বিশেষ করে গ্রিডের বিদ্যুতের তুলনায় সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে প্রতি ইউনিটে সাত টাকারও বেশি সাশ্রয় করতে পারছে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে ব্যয় কমানোর পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগ করছে।’
তিনি বলেন, ‘শিল্পে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ার পেছনে শুধু বিদ্যুত্ব্যয় কমানোই নয়, আরো কয়েকটি কারণ রয়েছে। বিশেষ করে রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে পরিবেশ ও সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের পক্ষ থেকে পরিবেশবান্ধব উৎপাদনব্যবস্থা ও কার্বন নিঃসরণ কমানোর বিষয়ে বিভিন্ন ধরনের শর্ত বা চাহিদা রয়েছে। এসব শর্ত পূরণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্যও অনেক রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠান ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগ করছে।’
Manual5 Ad Code
শফিকুল আলম বলেন, ‘গ্যাসসংকটের কারণে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর ক্যাপটিভ বিদ্যুৎকেন্দ্রও আগের মতো কার্যকরভাবে চালানো যাচ্ছে না। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানকে প্রয়োজনের সময় ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় আরো বেড়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের তুলনায় গ্রিডের বিদ্যুৎ এবং বিশেষ করে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ অনেক বেশি সাশ্রয়ী।’
এ বিষয়ে বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউঅ্যাবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসআরইএ) সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ বলেন, ‘তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে শিল্প-কারখানায় থাকা নিজস্ব ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্টগুলোতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় অনেক কারখানা বন্ধ হচ্ছে। শিল্প-কারখানাগুলোকে এই সংকট থেকে রক্ষা করতে সৌরবিদ্যুৎ ও ব্যাটারি সহজলভ্য করতে হবে। এ জন্য সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা ও ব্যাটারি সম্পূর্ণ করমুক্তভাবে আমদানির সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন। তাহলে শিল্প মালিকরা নিজেদের অর্থায়নে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করে দিন-রাত তা ব্যবহার করতে পারবেন।’
তিনি বলেন, ‘শুধু করমুক্ত সুবিধা নয়, শিল্প মালিকদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পসুদের ঋণের ব্যবস্থাও করতে হবে। ২০ বছরমেয়াদি সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার বিপরীতে ১০ থেকে ১২ বছর মেয়াদে ২ থেকে ৩ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়া হলে শিল্পগুলো দ্রুত সৌরবিদ্যুতে যেতে পারবে।’
Manual6 Ad Code
মোস্তফা আল মাহমুদ বলেন, ‘এর মাধ্যমে শিল্প উৎপাদনে নির্ভরযোগ্যতা বাড়বে, রপ্তানিকার্যক্রম স্বাভাবিক থাকবে এবং কর্মসংস্থানও ধরে রাখা সম্ভব হবে।’
রুফটপ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে ৫৫০০ মেগাওয়াটের লক্ষ্য : সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ১০ হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য জ্বালানি সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এর অর্ধেকেরও বেশি, অর্থাৎ পাঁচ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে রুফটপ সোলার থেকে। ফলে সরকারের নির্ধারিত নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনেও শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, ‘সরকার রুফটপ সোলারে আগ্রাসীভাবে এগোচ্ছে। বিনিয়োগবান্ধব নীতি করা হয়েছে এবং পাঁচ বছরের কর অবকাশসহ বিভিন্ন সুবিধা দেওয়া হয়েছে। আমাদের লক্ষ্য ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন। আমি মনে করি, এই লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব।’
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, ‘আগামী সাড়ে চার বছরে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে প্রায় ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এর ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ রুফটপ সোলার এবং বাকি অংশ ল্যান্ডবেজড প্রকল্প থেকে আসতে পারে।’
সম্প্রতি আইইইএফএর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, গ্রিড বিদ্যুতের ক্রমাগত দাম বৃদ্ধি ব্যবসায়ীদের সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগে উৎসাহিত করছে। দীর্ঘমেয়াদে এটি বিদ্যুতের একটি সাশ্রয়ী উৎস হিসেবে প্রমাণিত হচ্ছে। ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার সৌরবিদ্যুৎ পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিকেন্দ্রীভূত পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ব্যবস্থা আমদানিনির্ভর ব্যয়বহুল জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনতে পারে।
প্রতিবেদনে ‘ডিস্ট্রিবিউটেড এনার্জি রিসোর্সেস’-এর গুরুত্ব তুলে ধরে বলা হয়েছে, বিশাল বিদ্যুৎকেন্দ্র বা দীর্ঘ সঞ্চালন লাইনের ওপর নির্ভর না করে বিদ্যুৎ ব্যবহারের উৎসর কাছেই ছোট ছোট সৌর প্যানেল বা সেচ পাম্পের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা দেশগুলোর জন্য লাভজনক হচ্ছে। এতে একদিকে বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণে ব্যয় কমে, অন্যদিকে বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার চাপও কমানো সম্ভব হয়।
বাংলাদেশে কৃষিকাজে বর্তমানে ডিজেলচালিত সেচ পাম্পের ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। আইইইএফএর মতে, যদি মাত্র এক-তৃতীয়াংশ ডিজেল পাম্পকে সৌরবিদ্যুত্চালিত ব্যবস্থায় রূপান্তর করা যায়, তাহলে বছরে ডিজেল আমদানিতে ব্যয় হওয়া প্রায় ২৪৪ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব। ফলে শুধু শিল্প খাত নয়, কৃষি খাতেও সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর বড় সুযোগ রয়েছে।
Manual8 Ad Code
পাকিস্তানে মোট বিদ্যুতের ৪১% জীবাশ্ম জ্বালানির বাইরে : গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, পাকিস্তানে সৌর বিপ্লব চলছে, যা এখন বিশ্বজুড়ে আলোচিত হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকারও জীবাশ্ম জ্বালানির বাইরে গিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ শুরু করেছে। এটি ইতিবাচক উদ্যোগ।
তিনি বলেন, পাকিস্তানে অল্প সময়ের মধ্যে রুফটপ সোলারের ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। বর্তমানে পাকিস্তানের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৪১ শতাংশই আসে জীবাশ্ম জ্বালানির বাইরে থাকা উৎস থেকে। এর মধ্যে জলবিদ্যুৎ থেকে ২৫ শতাংশ, পারমাণবিক বিদ্যুৎ থেকে ৯ শতাংশ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে ৭ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে।