প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

৪ঠা অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৯শে আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২৩শে রবিউস সানি, ১৪৪৮ হিজরি

নিরাময়কেন্দ্রই যখন নির্যাতনকেন্দ্র

editor
প্রকাশিত আগস্ট ২০, ২০২৬, ০৫:১৭ পূর্বাহ্ণ
নিরাময়কেন্দ্রই যখন নির্যাতনকেন্দ্র

Manual6 Ad Code

সম্পাদকীয় :
মাদকাসক্তি একটি গুরুতর সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত সমস্যা। প্রায় প্রতিটি দেশকেই কমবেশি এই সমস্যা মোকাবিলা করিতে হয়। একজন মানুষ যখন মাদকের আসক্তিতে জড়াইয়া পড়েন, তখন তাহাকে শাস্তি না দিয়া বরং চিকিৎসা এবং যথাযথ পুনর্বাসনের আওতায় আনাই সভ্য সমাজের নৈতিক দায়িত্ব। অবশ্য সকল সমাজেই এই কাজটি করিবার জন্য বিশেষ প্রতিষ্ঠান থাকে, যেমন— আমাদের রহিয়াছে মাদক নিরাময়কেন্দ্র বা সংক্ষেপে ‘রিহ্যাব’। আক্রান্ত ব্যক্তি এবং ভুক্তভোগী পরিবারকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়াই এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান কাজ। তবে দুঃখজনক হইল, দেশের মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্রগুলির অভ্যন্তরীণ কর্মকাণ্ডের এক নির্মম এবং ভয়াবহ চিত্র সামনে আসিয়াছে, যাহা কেবল উদ্বেগজনকই নহে, বরং আমাদের বিবেককেও প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করাইয়া দিতেছে।

Manual2 Ad Code

জানা গিয়াছে, দেশের পাঁচ শতাধিক মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্রর অনেকগুলিই ন্যূনতম চিকিৎসাসেবা না দিয়াই রোগীকে দিনের পর দিন আটকাইয়া রাখা, মারধরসহ নানা ধরনের নির্যাতন করিয়া থাকে । কোথাও কোথাও নিরাময়ের পরিবর্তে কেন্দ্রের অভ্যন্তরেই মাদক সরবরাহ করা হইয়া থাকে—কী সাংঘাতিক কথা! রোগী ভর্তির পর নানা অজুহাতে অর্থ আদায়, অধিক অর্থের জন্য চিকিৎসার মেয়াদ বাড়াইয়া দেওয়া—এমন অভিযোগও কম নহে। অর্থাৎ, যেই সকল প্রতিষ্ঠানের কাজ মানুষকে অন্ধকার হইতে আলোর পথে ফিরাইয়া আনা, তাহাদের কোনো কোনোটি যেন সেই অন্ধকারকেই পরিণত করিয়াছে অর্থ উপার্জনের হাতিয়ার। আরো ভয়াবহ বিষয় হইল, ব্যক্তিগত বিরোধ, পারিবারিক কলহ কিংবা সম্পত্তির দ্বন্দ্বের জেরে সুস্থ মানুষকে পর্যন্ত মাদকাসক্ত সাজাইয়া নিরাময়কেন্দ্রে আটক রাখা হয়! হাড় হিম করা আরো অভিযোগ হইল, বীর মুক্তিযোদ্ধা, শিল্পপতিরা পর্যন্ত এই জালে আটকাইয়া পড়েন অনেক সময়, যেইখানে এমনও ঘটে— মাদক দূরের কথা, জীবনে কোনো দিন তিনি একটি সিগারেটেও টান দেন নাই। অথচ সম্পত্তির লোভে নিজের সন্তানের স্বার্থের বলি হইয়া তিনি বন্দি হইয়া গিয়াছেন অন্ধকার প্রকোষ্ঠের মধ্যে— শত চেষ্টা করিয়াও মুক্তি মিলিতেছে না। কথিত ‘ক্যাচিং পার্টি’র মাধ্যমে কাউকে ধরিয়া আনিয়া এইভাবে ‘বন্দি’ করিবার অভিযোগ যদি সত্যি হইয়া থাকে, তাহা হইলে তাহা আর নিছক অনিয়ম থাকে না, বরং হইয়া উঠে নাগরিক স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন-অপরাধ । সেইরূপ ক্ষেত্রে সকল নিরাময়কেন্দ্রকে চিকিৎসালয় না বলিয়া ‘গোপন কারাগার’ বলাই অধিক সমুচিত।

Manual7 Ad Code

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তরের আহ্বান হইল, মাদকাসক্তির চিকিৎসা হইতে হইবে বৈজ্ঞানিক প্রমাণভিত্তিক, মানবিক ও অধিকারসম্মত। রোগীর মর্যাদা, গোপনীয়তা ও সম্মতি রক্ষা করাও সর্বদা চিকিৎসার মৌলিক শর্ত । সুতরাং, চিকিৎসার স্থানগুলিতে নির্যাতন বা অমানবিক আচরণ কখনোই চিকিৎসার অংশ হইতে পারে না । উন্নত দেশসমূহে দেখা যায়, সেইখানে সকল মাদকাসক্তি চিকিৎসাকেন্দ্রে চিকিৎসক, মনোবিজ্ঞানী, নার্স, সমাজকর্মীসহ প্রশিক্ষিত পেশাজীবীদের সমন্বিত চিকিৎসাব্যবস্থার উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। অথচ আমাদের দেশের নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানগুলি যেন মাদক সেন্টার হইয়া উঠিয়াছে । ইহা সমাজের জন্য নিঃসন্দেহে ভীতি-জাগানিয়া খবর।

এই যখন অবস্থা, তখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কেবল ‘লাইসেন্স প্রদান’ করিয়া দায়িত্ব শেষ করিলেই চলিবে না; প্রতিটি কেন্দ্রে নিয়মিত ও আকস্মিক পরিদর্শন, প্রশিক্ষিত চিকিৎসক ও জনবলের উপস্থিতি, রোগীর নিরাপত্তা ও চিকিৎসা-নথির কঠোর যাচাই এবং অভিযোগ জানানোর স্বাধীন ব্যবস্থাও নিশ্চিত করিতে হইবে । অবৈধ কেন্দ্র বন্ধের পাশাপাশি নির্যাতন, জবরদস্তি আটক কিংবা মাদক ব্যবসার সহিত জড়িতদের বিরুদ্ধে লইতে হইবে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা । ইহার পাশাপাশি চিকিৎসার মানদণ্ড নির্ধারণ করিয়া দেওয়া এবং তাহা অমান্যকারী প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন বাতিল করিবার ন্যায় শক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করিতে হইবে। ভুলিয়া যাওয়া চলিবে না, মাদকাসক্ত ব্যক্তি সঠিক চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ পাইলে সুস্থ হইয়া মূলধারার জনস্রোতে অনায়াসে যুক্ত হইতে পারেন। অতএব, এখনই জবাবদিহি নিশ্চিত করিতে হইবে, নচেৎ ‘নিরাময়কেন্দ্র’ নামটি মানুষের কাছে ক্রমশ আতঙ্কের প্রতিশব্দ হইয়া দাঁড়াইবে।

Manual6 Ad Code

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 ১২৩৪
৫৭৮৯১০১১
১১৩৪১৫১৬১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৯৩০৩১  

Manual1 Ad Code
Manual6 Ad Code