বাংলাদেশের সুশীলসমাজকে নিয়ে আমাদের অনেক ভয়। তারা জাতির বিবেক।
কিন্তু সব সময় তাদের বিবেক জাগ্রত হয় না। তাদের ঘুম ভাঙে হঠাৎ, বিশেষ কোনো উদ্দেশ্যে। তারা যখন কথা বলেন, তখনই সাধারণ মানুষ সর্বনাশের গন্ধ পায়। এই যেমন সাম্প্রতিক সময়ে।
বাংলাদেশের সুশীল সমাজের সদস্যরা সম্প্রতি জোটবদ্ধ হয়ে দুটি বিবৃতি দিয়েছেন।
দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক ও পেশিশক্তির প্রভাব খাটিয়ে ভূমি ও বাড়ি দখল, খাসজমি দখল, হামলা ও চাঁদাবাজির ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ জানিয়েছেন ৩৮ জন বিশিষ্ট নাগরিক। গত কিছুদিন এসব ঘটনা বেড়েছে উল্লেখ করে তাঁরা বলেছেন, এতে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির প্রবণতা স্পষ্ট হচ্ছে।
দ্বিতীয় বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন ৩৬ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি। রাজধানীর বাংলাবাজারে প্রকাশনা সংস্থা ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের (ইউপিএল) শোরুমে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বই বিক্রি বন্ধের দাবিতে হামলা ও বিক্রয়কর্মীদের হয়রানির ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের ৩৬ জন বিশিষ্ট নাগরিক। এ ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ও বই বিক্রেতাদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী বিশিষ্ট নাগরিকদের মধ্যে রয়েছেন মানবাধিকারকর্মী হামিদা হোসেন, ‘নিজেরা করি’র সমন্বয়কারী খুশী কবির; আলোকচিত্রী শহিদুল আলম; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তাসনীম সিরাজ মাহবুব, মোশাহিদা সুলতানা, সামিনা লুৎফা, রুশাদ ফরিদী; ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ফিরদৌস আজীম; আদিবাসী অধিকার সুরক্ষাকর্মী রাণী ইয়েন ইয়েন, সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন ও শরীফ ভূঁইয়া; লেখক ও গবেষক রেহনুমা আহমেদ, অর্থনীতিবিদ জিয়া হাসান, আইনজীবী কাজী জাহেদ ইকবাল, মানজুর আল মতিন ও প্রিয়া আহসান চৌধুরী; নারী অধিকারকর্মী মাহীন সুলতান; নারীপক্ষের আন্দোলন সম্পাদক গীতা দাস; ভয়েস ফর রিফর্মের ফাহিম মাশরুর; লেখক ও গবেষক পাভেল পার্থ, সাংবাদিক সায়দিয়া গুলরুখ প্রমুখ।
দেশে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা হলে বাংলাদেশের বিশিষ্ট নাগরিকরা উদ্বিগ্ন হতেই পারেন।
যেকোনো অন্যায় ও অনিয়মের বিরুদ্ধে তারা প্রতিবাদ করবেন, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের সুশীল সমাজ সব অন্যায়ের প্রতিবাদ করেন না। সব অনাচার তাদের বিবেককে জাগ্রত করে না। বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে মাত্র সাত মাস হলো। একটি ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এই সরকারের পক্ষে রাতারাতি সবকিছু ঠিকঠাক করা সম্ভব নয়। ইউনূসের দেড় বছরের শাসনকালে দেশে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি ঘটে। সেখান থেকে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক করা কোনো সরকারের পক্ষেই সম্ভব নয়। তার ওপর একটি মহল আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর জন্য পরিকল্পিতভাবে ষড়যন্ত্র করছে। এরকম একটা অবস্থায় বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটেছে। যা অনাকাঙ্ক্ষিত। তাতেই আমাদের সুশীল সমাজ জেগে উঠেছে। এই বিবৃতি দেখে আমার মনে হয়েছে, এত দিন কোথায় ছিলেন? বিশেষ করে ইউনূসের দেড় বছরের শাসনকালে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির যে ভয়াবহ অবনতি ঘটেছিল তখন আমাদের সুশীল সমাজ নীরব ছিল কেন?
Manual1 Ad Code
ড. ইউনূস বাংলাদেশে মব সন্ত্রাসকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছিলেন। গত দেড় বছরে এটা যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে যে, ক্ষমতার জোরে অন্যের বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দখল করা যায়। ড. ইউনূস বাংলাদেশে একটি শক্তিশালী মব বাহিনী উপহার দিয়েছেন। যারা আইনের ঊর্ধ্বে বিচারের বাইরে, তারা যা বলবে সবাই তা মানতে বাধ্য। এরা যদি বলে পরীক্ষা হবে না, তাহলে পরীক্ষা বন্ধ করতেই হবে। এরা যদি বলে কাউকে গ্রেফতার করতে হবে, তাকে গ্রেফতার না করলে পুলিশের চাকরি যাবে। এরা যদি বলে কাউকে জেল থেকে মুক্তি দিতে হবে, তাহলে আইন-কানুন যাই থাকুক, তাদের ছেড়ে দিতেই হবে, নইলে দেশে তুলকালাম হবে। এদের কথাই আইন। এরাই দেশের মালিক। জনগণ ক্রীতদাস। ইউনূসের আঠারো মাসের শাসনকালে আমরা সুশীল সমাজের কাছ থেকে একটা বিবৃতি পাইনি। সুশীল সমাজ নীরব দেখেছে রাষ্ট্রীয় মদদে লুটপাট, ঘরবাড়ি দখল, কলকারখানায় আগুন। তখন আমাদের দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা কেন প্রতিবাদ করেননি। কেন? মব সন্ত্রাসের ভয়ে নাকি ইউনূস সরকার সুশীলদের প্রতিনিধিত্বকারী জন্য? কোন সন্ত্রাসের ঘটনাই কাম্য নয়, কিন্তু ইউনূস সরকারের আমলে সংঘটিত অপরাধের তুলনায় সাম্প্রতিক ঘটনা গুলো খুবই সামান্য। ইউনূস আমলে যে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির যে অবস্থা হয়েছিল, গত সাত মাসে তার থেকে অনেক উন্নতি হয়েছে। কিন্তু সুশীল সমাজ কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে সামনে এনে যেভাবে উদ্বিগ্ন হয়েছে তা রহস্যজনক।
Manual3 Ad Code
অসমাপ্ত আত্মজীবনী বই বিক্রিতে বাধা দেওয়ার কারণে ৩৬ জন সুশীল হাহাকার করেছেন। অসমাপ্ত আত্মজীবনী তো কেবল একটি বই। কিন্তু ইউনূস আমলে যে উপর্যুপরি তিনবার ধানমন্ডি ৩২ নম্বর ভাঙচুর করা হয়েছিল, সারাদেশে মুক্তিযুদ্ধের সব স্থাপনা ভেঙে চুরমার করে দেওয়া হয়েছিল, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ধ্বংস করার চেষ্টা হয়েছিল, তখন আমাদের সুশীল সমাজ কেন কোনো প্রতিবাদ করেননি। তখন কেন জাতির বিবেকরা ঘুমিয়ে ছিলেন?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজলেই পাওয়া যায় সুশীল সমাজের এখনকার অবস্থানের আসল রহস্য। অতীতে আমরা লক্ষ্য করেছি যখনই একটি নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসে তখনই সুশীল সমাজের কয়েকজন ব্যক্তি সেই সরকারের সমালোচনা করার জন্য মুখিয়ে থাকেন। পান থেকে চুন খসলেই নির্বাচিত সরকারের তীব্র নিন্দা করেন। তারা এমনভাবে একটি জনমত গড়ে তোলার চেষ্টা করেন যে নির্বাচিত সরকার সঠিকভাবে কাজ করছে না। ২০০১ সালেও আমরা দেখেছি সুশীল সমাজ শুরু থেকেই বেগম জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল। বিএনপির বিরুদ্ধে একের পর নানা অভিযোগ এনে জনসমক্ষে সরকারকে হেয় প্রতিপন্ন করাই ছিল সুশীল সমাজের প্রধান কাজ। অবশেষে তারা সেনা সমর্থনে ক্ষমতা দখল করে।
সুশীল সমাজের একটি অংশ ক্ষমতা দখলের পুরোনো খেলা শুরু করেছে কিনা, সেটাই প্রশ্ন। এই সময় যখন দেশে সংকট সমাধানে দরকার ঐক্য এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ঠিক তখনই দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির অপচেষ্টা চলছে। এমনসব বিষয়ে সরকারের সমালোচনা করা হচ্ছে, যেজন্য সরকার মোটেও দায়ী নয়। বরং সরকারের পক্ষ থেকে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে। সেই সময় সুশীল সমাজের পক্ষ থেকে এধরনের বিবৃতি সন্দেহের উদ্রেক করে।
এই লক্ষণগুলো এদেশের জনগণের কাছে পরিচিত।দেশে গণতন্ত্র বাধাগ্রস্ত করতে, বিরাজনীতিকরণের জন্য কৃত্রিমভাবে অস্থিরতা সৃষ্টির অপচেষ্টা অতীতেও হয়েছে। এরকম পরিস্থিতি তৈরি করেই ২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত সুশীল সরকার ক্ষমতায় এসেছিল।
এ রকম একটা পরিস্থিতি হঠাৎ করেই হচ্ছে, নাকি উদ্দেশ্যমূলকভাবে তৈরি করা হচ্ছে? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেতে হলে আমাদের একটু পেছনে ফিরে যেতে হবে। আমরা যদি ২০০৬ সালের বাংলাদেশের চিত্র দেখি, তাহলে সেই চিত্রের সঙ্গে আজকের বাংলাদেশের চিত্রটি অনেকটাই মিলে যায়। ২০০৬ সালের শেষদিকে রাজনৈতিক দলগুলোকে মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়েছিল। রক্তক্ষয়ী সহিংসতায় জড়িয়ে পড়েছিল তারা ক্ষমতার জন্য। দেশজুড়ে রাজপথ, রেলপথ অবরোধ, নানা রকম কর্মসূচির মাধ্যমে ব্যবসাবাণিজ্য অচল করে দেওয়া হয়েছিল। ওই সময় সুশীলরা দুই পক্ষের বিরোধ উসকে দেওয়ার জন্য আদাজল খেয়ে নেমেছিলেন। টেলিভিশনে, সংবাদপত্রে তাঁদের বিভেদজাগানিয়া লেখা এবং কথা জাতিকে বিভ্রান্ত করেছিল। রাজনৈতিক দলগুলোকে সমঝোতার বদলে সংঘাতের পথে প্ররোচিত করেছিল একটি মহল। উদ্দেশ্য ছিল দেশে জটিল পরিস্থিতি সৃষ্টি। আর এ সুযোগেই ড. ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে এক-এগারো সরকার ক্ষমতা দখল করে। এক-এগারো সরকার ক্ষমতা দখল করেই বাংলাদেশকে ধ্বংসের এবং বিরাজনীতিকরণের যে কার্যক্রম শুরু করে, তা থেকেই বোঝা যায় যে ২০০৬ সালের শেষ দিক থেকে যে ঘটনাগুলো বাংলাদেশে ঘটেছিল, সবই ছিল পরিকল্পিত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। একটি নীলনকশার সুনিপুণ বাস্তবায়ন। এবারও কি সে রকম ঘটনাই হচ্ছে? এই জন্যই কি সুশীল সমাজের ঘুম ভেঙেছে?
আমাদের সুশীল সমাজ যদি ইউনূসের ভয়াবহ অপশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করত, তাহলে এখনকার বিবৃতি নিয়ে প্রশ্ন উঠত না। কিন্তু আমাদের সুশীল সমাজের দ্বিমুখী আচরণের কারণেই আমরা উদ্বিগ্ন। দেশের পরিস্থিতি নিয়ে নয়, সুশীল সমাজের সাম্প্রতিক তৎপরতায় দেশের মানুষ সন্দিহান। সুশীল সমাজের একটি অংশ কি আবারও নতুন খেলায় জড়িয়ে পড়েছে?